এল আর বাদল: বাংলাদেশে ফেরার প্রশ্নে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বক্তব্য নিয়ে প্রতিক্রিয়া পাওয়া যাচ্ছে রাজনৈতিক অঙ্গনে। কোনো কোনো দল তার বিরুদ্ধে বিচারের কথা বলছে, কোনো দল আবার ষড়যন্ত্র দেখছে।
বিশেষ করে দেশটির বর্তমান রাজনীতিতে প্রভাবশালী তিনটি দলের নেতাদের সঙ্গে কথা বললে তারা যে প্রতিক্রিয়া জানান, তাতে তারা মূলত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিচার বা আইন-আদালতের কথা বলেছেন। একইসঙ্গে আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের চেষ্টার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং ষড়যন্ত্রের কথাও এসেছে। -------- বিবিসি বাংলা
শেখ হাসিনার বক্তব্যের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়ায় জুলাই গণ-অভ্যত্থানে হত্যাকাণ্ডের বিচার চলার বিষয়কে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একজন উপদেষ্টা ও বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতা।
আর জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতারা শেখ হাসিনার বক্তব্যের পেছনে অন্তর্নিহিত কোনো রহস্য বা ষড়যন্ত্র দেখছেন। এমনকি তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করছেন, দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতির কারও কারও ষড়যন্ত্র থাকতে পারে।
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ছাত্র নেতৃত্বের একাংশের গঠিত দল জাতীয় নাগরিক পার্টি বা এনসিপি নেতারা কড়া ভাষায় প্রত্রিক্রিয়া দিয়েছেন শেখ হাসিনার বক্তব্যের ব্যাপারে। দলটির নেতারা শেখ হাসিনার মৃত্যুদণ্ডের সাজা কার্যকর করার কথা বলেছেন।
প্রসঙ্গত, ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার দলের পলাতক নেতাকর্মীদের নিয়ে ডিসেম্বরে বাংলাদেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন বলে বার্তা সংস্থা রয়টার্সের কাছে দাবি করেছেন। তারা আত্মসমর্পণের কথা ভাবছেন বলেও রয়টার্সকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন তিনি।
তবে চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের মুখে দেশ ছেড়ে ভারতে যাওয়া শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরা নিয়ে আলোচনা এর আগেও সামনে এসেছে। এখন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম রয়টার্সকে সাক্ষাৎকারে তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফেরার একটা সুনির্দিষ্ট সময়ের কথা বলেছেন। ফলে তা নিয়ে প্রতিক্রিয়া হয়েছে রাজনীতিতে।
বিচার নিশ্চিত করার কথা বলছে বিএনপি
দেশে ফেরার প্রশ্নে শেখ হাসিনার বক্তব্যের ব্যাপারে প্রতিক্রিয়ায় জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাকাণ্ডের বিচার চলার বিষয়কে তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের একজন উপদেষ্টা।
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা ও বিএনপি জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বিবিসি বাংলাকে বলেন, "ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ২০২৪ সালে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে হত্যাযজ্ঞের একটি মামলায় বিচার শেষে ঢাকায় আদালতে ফাঁসির রায় হয়েছে। আরও অনেক হত্যা মামলায় আদালতে তার বিচার চলছে।"
এই বিচারের বিষয় উল্লেখ করে মি. রিজভী বলেন, "হাসিনার অপরাধের ব্যাপারে আদালত সিদ্ধান্ত নেবে।"
একইসঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা মি. রিজভী বলেন, শেখ হাসিনা বা ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের নেতারা দেশে ফিরবেন কি, ফিরবেন না, বা তারা কী করবেন– সেটা তাদের বিষয়, তাদের দলীয় সিদ্ধান্তের বিষয়।
তবে তাদের বিচার নিশ্চিত করার পক্ষে বিএনপি সরকারের অবস্থানের কথা উল্লেখ করেন রুহুল কবির রিজভী।
তিনি বলেন, "জুলাই আন্দোলনে উনি (শেখ হাসিনা) যে হত্যার মহাযজ্ঞ চালিয়েছেন, শিশু-কিশোরদেরও হত্যা করেছেন। সেই হত্যাযজ্ঞের বিচার নিশ্চিত হোক, সেটা জনগণ চায়। আদালতে বিচার চলছে। ফলে অপরাধের ব্যাপারে বিচার হবে এবং আদালত সিদ্ধান্ত নেবে।"
প্রসঙ্গত, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘঠিত হত্যাকাণ্ডসহ বিভিন্ন অপরাধের ক্ষেত্রে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ এনে ঢাকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার করা হচ্ছে।
এই ট্রাইব্যুনালে একটি মামলায় মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে শেখ হাসিনা ও তার সরকারের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খানের মৃত্যুদণ্ডের রায় হয়েছে গত বছরের ১৭ই নভেম্বর। ট্রাইব্যুনালে তার বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগে আরও কয়েকটি মামলার বিচার প্রক্রিয়া চলছে।
শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময়ের ঘটনায় সারা দেশে ৬৬৩টি মামলা রয়েছে। এর মধ্যে হত্যা মামলা রয়েছে ৪৫৩টি।
রয়টার্সকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনা দেশে তার বিরুদ্ধে চলা বিচারের প্রক্রিয়া নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন। তিনি বলেছেন, "আমার মনে হয়, বিচার প্রক্রিয়া শুরু হলেই মানুষের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে এই আদালত কতটা প্রহসনমূলক– আর আমি সেটাই প্রমাণ করতে চাই।"
তার এই বক্তব্যের ব্যাপারে রুহুল কবির রিজভী বলেন, "উনি (শেখ হাসিনা) এ কথা বলছেন। আর উনার সময়ে যুদ্ধাপরাধের বিচার করতে গিয়ে সেই বিচারের একজন বিচারক রায় দেওয়ার আগে বাইরের একজনের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলেন। সেই আলাপ ফাঁস হওয়ার পর ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল। তিনিই এখন ন্যায় বিচারের কথা বলেন।
রিজভী দাবি করেন, "বর্তমানে আদালতে সুচারুভাবে বিচার প্রক্রিয়া চলছে। সেখানে সরকার কোনো হস্তক্ষেপ করছে না। আদালত আইনসম্মতভাবে এবং স্বাধীনভাবে বিচার করছে।
ষড়যন্ত্র দেখছেন জামায়াত নেতারা
শেখ হাসিনা দেশে ফেরার যে কথা বলছেন, এর পেছনে অন্তর্নিহিত কোনো রহস্য বা ষড়যন্ত্র থাকতে পারে বলে মনে করছেন জামায়াতে ইসলামীর নেতারা।
জামায়াত এখন জাতীয় সংসদে প্রধান বিরোধী দল। দলটির সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, "ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার বক্তব্যের পেছনে একটা অন্তর্নিহিত রহস্য এবং ষড়যন্ত্র যেমন থাকতে পারে, সেখানে দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিরও কেউ কেউ এ ষড়যন্ত্রের অংশ হতে পারে।"
অভ্যন্তরীণ রাজনীতির ষড়যন্ত্র বলতে মি. পরওয়ার কী বোঝাতে চাইছেন, এর ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে তিনি বলেন, "বর্তমান সরকারের অভ্যন্তরের কোনো অংশ যে ওই ষড়যন্ত্রের সাথে নেই, এটা আমরা বিশ্বাস করি না।"
জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল এ-ও বলেন, "যদিও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কড়া কথা বলছেন। কিন্তু আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের জন্য সরকারের কোনো অংশ পরিকল্পিতভাবে কাজ করে থাকতে পারে।"
এ ধরনের অভিযোগ তুললেও জামায়াত নেতা মি. পরওয়ার বলেন, দেশে ফেরার বিষয়ে শেখ হাসিনা রয়টার্সকে সাক্ষাৎকারে যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার বিস্তারিত দেখার পরে তারা তাদের দলের রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন।
একইসঙ্গে মিয়া গোলাম পরওয়ারের বক্তব্য হচ্ছে, দেশের কোনো মামলায় অভিযুক্ত বা সাজাপ্রাপ্ত কেউ যদি স্বেচ্ছায় নিজেকে আইনের কাছে সোপর্দ করতে চায়, সেটা সে করতে পারে। আইনগত দিক থেকে বিষয়টাকে এভাবেই দেখেন তারা। তবে সরকারের একটা অংশ আওয়ামী লীগকে পুনর্বাসনের পরিকল্পনার অংশ হতে পারে বলে যে অভিযোগ করেন জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল, এটিকে অসত্য ও ভিত্তিহীন বলছেন বিএনপি সরকারের একজন মন্ত্রী।
নাম প্রকাশ অনিচ্ছুক ওই মন্ত্রী বিবিসি বাংলাকে বলেছেন, তাদের বরং সন্দেহ হয় যে, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সঙ্গে জামায়াতের গোপন কোনো সমঝোতা আছে কি না।
ফাঁসির রায় কার্যকর চায় এনসিপি
শেখ হাসিনা 'কেবলমাত্র' ফাঁসির সাজা পাওয়ার জন্যই দেশে ফিরতে পারেন বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
শুক্রবার ঢাকায় এক অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের তিনি বলেন, "শেখ হাসিনা যদি দেশে ফিরে, কেবলমাত্র ফিরবে ফাঁসির রায় কার্যকর হওয়ার জন্য। ফলে সেটার জন্য আমরাও চাই যে ফাঁসির রায় কার্যকর হোক, শেখ হাসিনাসহ অন্য যাদের বিরুদ্ধেই এই রায় হয়েছে। ফাঁসির রায়ে দণ্ডিত আসামি হওয়ায় শেখ হাসিনা সাক্ষাৎকার দেওয়ার এখতিয়ার রাখেন না বলেও মন্তব্য করেন মি. ইসলাম।
তিনি বলেন, "এটা আমাদের ভারতীয় দূতাবাসকে, দিল্লিকে এটা কঠোরভাবে বাংলাদেশ সরকারের বার্তা দেওয়া উচিত। শেখ হাসিনা দিল্লিতে বসে থাকা অবস্থায় ফাঁসির রায়ে দণ্ডিত একজন আসামি, তিনি কোনো ধরনের ইন্টারভিউ বা কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারে না। এটা দেশে অস্থিতিশীলতা তৈরি করছে, যোগ করেন সংসদে বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ।