শিরোনাম
◈ আমিরাতে লটারিতে সাড়ে তিন কোটি টাকা জিতলেন বাংলাদেশি প্রবাসী আলাউদ্দিন ◈ ভারতের সংসদে বাংলাদেশ নিয়ে আলোচনা, যেসব কথা বলা হলো ◈ জামায়াতের সঙ্গে জোট সরকার গঠনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান বিএনপির ◈ ১২ তারিখেই নির্বাচন হবে, হতেই হবে: ইনকিলাব মঞ্চ ◈ বিএনপি ও জামায়াতের নির্বাচনি ইশতেহার: নতুনত্ব কি আছে? ◈ নতুন কর্মসূচির ঘোষণার কথা জানিয়ে শাহবাগ ছাড়ল ওসমান হাদি হত্যার বিচার দাবির আন্দোলনকারীরা ◈ তারেক রহমানকে নির্বাচনী বিতর্কে অংশ নেওয়ার আহ্বান জামায়াত আমিরের ◈ বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দামে বড় উত্থান, দেশের বাজারেও উচ্চমূল্য অব্যাহত ◈ সোহান ঝ‌ড়ে ধুম‌কেতুর বিরু‌দ্ধে দুর্বার একাদ‌শের জয় ◈ ব্রিটেনে বসবাসরত বাংলাদেশি ভোটাররা কি দেশের নির্বাচনে প্রভাব ফেলতে পারেন?

প্রকাশিত : ০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৩:০৩ রাত
আপডেট : ০৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৯:০০ সকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বিএনপি ও জামায়াতের নির্বাচনি ইশতেহার: নতুনত্ব কি আছে?

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোরের প্রতিবেদন।। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে বিজয়ী হয়ে সরকার গঠন করলে দেশ ও দেশের মানুষের জন্য কোন দল কী করবে, তার যে তালিকা জাতির সামনে তুলে ধরেছে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী, সেখানে প্রতিশ্রুতির ফুলঝুরি আছে।

তাদের এই নির্বাচনি ইশতেহারে নিয়ে বিশ্লেষকদের কাছ থেকে তিন ধরনের মত এসেছে, যার সারমর্ম হল–‘খুব একটা’ তফাৎ নেই দুই দলের প্রতিশ্রুতিতে।

বরং যেসব অগ্রাধিকার তাদের ইশতেহারে রয়েছে, সেগুলো কতদিনে বাস্তবায়ন করা হবে এবং তাতে কীভাবে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে, তা স্পষ্ট করা হয়নি বলে মনে করছেন তারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, ভোটের আগে ইশতেহার একটি রেওয়াজ। গত ৫৪ বছর ধরেই নির্বাচনের সময় ইশতেহার দেওয়ার রেওয়াজ চালু রয়েছে। সরকারে যেতে পারলে সেসব প্রতিশ্রুতির কে কতটা পূরণ করল, সেই খতিয়ান দলগুলো দেয় না।

বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান শুক্রবার দলের যে নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেছেন, ‘মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র’ বিনির্মাণের প্রতিশ্রুতিতে ৯টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে তা সাজানো হয়েছে।

অন্যদিকে বুধবার জামায়াতের নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করেন দলের আমির শফিকুর রহমান। ২৬টি বিষয়ে অগ্রাধিকার দিয়ে ৪১ দফা প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরেছে দলটি।

রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক রূপান্তরের লক্ষ্য ধরে অন্তর্বর্তী সরকার অধীনে ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচন ও গণভোট হবে আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি।

২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগের টানা দেড় দশকের শাসনের অবসান ঘটে, তাদের বিরুদ্ধে ‘কর্তৃত্ববাদ প্রতিষ্ঠা, গুম, খুন, নির্যাতন, দুর্নীতি, অর্থ পাচারের’ বিস্তর অভিযোগ তোলা হয়েছে।

ইতোমধ্যে অভ্যুত্থান দমনের চেষ্টায় আওয়ামী লীগ সরকারের মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার চলছে, যা অন্তর্বর্তী সরকারের অগ্রাধিকার ছিল।

রাষ্ট্র সংস্কারের অপর অগ্রাধিকার বাস্তবায়নে এরইমধ্যে জুলাই জাতীয় সনদ প্রণয়ন ও স্বাক্ষর হয়েছে, যা বাস্তায়ন প্রশ্নে গণভোট হচ্ছে।

৪৪ পৃষ্ঠার নির্বাচনি ইশতেহারে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেছেন, “এই ইশতেহার কেবল নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি নয়, এটি একটি নতুন সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চুক্তির ঘোষণা।”

অন্যদিকে জামায়াতের জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান ঘোষণা করেছেন ‘একটি নিরাপদ ও মানবিক বাংলাদেশের’ ইশতেহার।

তার আগে ৩০ জানুয়ারি জামায়াতের জোট শরিক জাতীয় নাগরিক পার্টি-এনসিপি দেশের জন্য একটি ‘বাস্তবসম্মত ও সংস্কারমুখী রূপরেখা’ নির্মাণকে লক্ষ্য ধরে ৩৬ দফা নির্বাচনি ইশতেহার ঘোষণা করে।

এসব ইশতেহারের মধ্যে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে প্রতিশ্রুতির প্রাধান্য রয়েছে বিএনপির ইশতেহারে।

জামায়াতের ইশতেহারে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই অভ্যুত্থান বিষয়ে অল্প কথায় প্রতিশ্রুতি এসেছে।

এনসিপির ইশতেহারে নতুন সংবিধান প্রণয়নের পাশাপাশি বিগত আওয়ামী লীগের শাসন ও এই দলের সঙ্গে জড়িতদের রাজনৈতিক ‘রিকনসিলিয়েশন’ প্রসঙ্গ এসেছে।

তিন দলের নির্বাচনি ইশতেহার নিয়ে নানা মহলে আলোচনা চলছে। অনেকে এই তিনটি দলের ইশতেহারের মধ্যে ‘পার্থক্য’ ও ইতিবাচক দিকগুলো খুঁজছেন।

তবে রাজনৈতিক নেতা ও বিশ্লেষকদের কারও কারও মতে, বিএনপির ইশতেহার জামায়াত ও এনসিপির চেয়ে ‘মাচ বেটার’। কেউ বলেছেন, ইশতেহার ‘লোকে পড়েই না’।

বিএনপি চেয়ারপাসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার প্রাণ সংশয়ের মধ্যে তার বড় ছেলে তারেক রহমান লন্ডনে ১৭ বছরের নির্বাসিত জীবনের সমাপ্তি টেনে গত ২৫ ডিসেম্বর দেশে ফেরেন।

খালেদা জিয়ার মৃত্যুর পর এবার তারেক রহমানই নির্বাচনে বিএনপিকে নেতৃত্ব দিচ্ছেন।

দেশ ফেরার দিন সংবর্ধনার অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘উই হ্যাভ অ্যা প্ল্যান’। তার ওই বক্তব্যের আলোকেই পুরো ইশতেহার সাজিয়েছে বিএনপি।

বিএনপির ইশতেহারে দলীয়ভাবে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড বিতরণসহ স্বাস্থ্য, শিক্ষা, খাল খনন, ডিজিটাল অর্থনীতিসহ নানা প্রতিশ্রুতি রয়েছে। এই বিষয়গুলো নির্বাচনি সভাগুলোতেও তারেক রহমান তুলে ধরেছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমান বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “বিএনপির ইশতেহারের প্রাথমিক পর্যবেক্ষণ হতে পারে যে তারা কর্মসংস্থান, অর্থের সংস্থানের কথা বলেছে, কিন্তু তা কতদিনে বাস্তবায়ন করা হবে, এমন কোনও টাইম ফ্রেম দেননি। এটি একটি ব্যাপার।”

ইশতেহারে তারেক রহমান বলেছেন, ঢাকার সচিবালয় থেকে দেশ শাসন করা হবে না। দেশ চলবে তৃণমূলের জনগণের ইচ্ছায় ও মতামতের ভিত্তিতে। যেখানে সমস্যা সেখানেই সমাধানের ব্যবস্থা করা হবে।

‘স্থানীয় নেতৃত্বেই টেকসই সমাধান সম্ভব’-এ নীতির ভিত্তিতে দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে ক্ষমতায়িত করা হবে। ক্ষমতা ও উন্নয়নের ভরকেন্দ্র হবে গ্রামমুখী।

‘ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষি কার্ডের মত জনগুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি বাস্তবায়নে একটি উপযুক্ত শক্তিশালী স্থানীয় প্রশাসন গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথা বলেছে বিএনপি।


ইশতেহারে বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোর অর্থবহ বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালীকরণ ও জনগণের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করা হবে।

জাহেদ উর রহমান বলেন, “স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার কথা বলেছে বিএনপি। কিন্তু কতদিনে, কীভাবে এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়ন হবে, তা কিন্তু নেই।

“এসব বিষয় আছে, যেগুলো নিয়ে আলোচনা অব্যাহত থাকতে পারে।”

জামায়াত ও বিএনপির ইশতেহারে কী পার্থক্য?

জামায়াতের নির্বাচনি ইশতেহারের শাসনব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার শীর্ষক অংশে বলা হয়েছে, “নারীদের মধ্য থেকে মন্ত্রিসভায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক প্রতিনিধি অন্তর্ভূক্ত করা হবে।”

যদিও ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে একজন নারীকেও মনোনয়ন দেয়নি জামায়াত।

নারী, শিশু ও পরিবারের উন্নয়নে যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছে দলটি সেখানে পরিবার কাউন্সেলিং ও মোটিভেশন সেন্টার চালু করা, নিরাপদ বিদ্যালয় কর্মসূচি ও মানসিক স্বাস্থ্য কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য অনুদান ও সেবার পরিসর বাড়ানোর কথা রয়েছে।

বিএনপি নারীদের জন্য ফ্যামিলি কার্ড, স্নাতকোত্তর ফ্রি পড়াশোনা, নারীর অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিকাশ, নারী সাপোর্ট সেল, উদ্যোক্তাদের সহায়তা, ডে কেয়ার, ভেন্ডিং মেশিন ও ব্রেস্ট ফিডিং কর্ণার স্থাপনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

জামায়াতের ‘রাজনৈতিক আমূল পরিবর্তনের’ প্রতিশ্রুতিতে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য একটি নতুন রাজনৈতিক অর্থনীতি গড়ে তোলার অংশ হিসেবে আগামী সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলগুলোকে (আসন ও ভোটের সংখ্যানুপাতে) রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে বার্ষিক বরাদ্দ দেওয়া হবে।

তবে বিএনপির ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সরকার গঠনে সক্ষম হলে বিগত দিনে আন্দোলনে যুক্ত রাজনৈতিক দলগুলোও সরকারের অংশীজন হবে।

নির্বাচনে জিতলে কার্যকর জাতীয় সংসদ গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছে জামায়াত। দলটি বলছে, তাদের ‘ভিশন’ হবে সংসদকে দেশ গঠন, রাজনৈতিক সমঝোতা এবং জবাবদিহির কেন্দ্রে পরিণত করা।

এক্ষেত্রে জামায়াতের প্রতিশ্রুতি, “সংসদ সদস্যরা যাতে স্বাধীনভাবে মত প্রকাশ করতে পারেন, সে লক্ষ্যে সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে।”

বিএনপির ইশতেহারে সাংবিধানিক সংস্কার দফায় রাষ্ট্র সংস্কার নিয়ে নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন, সংসদের ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন, উচ্চকক্ষ গঠন প্রভৃতি রয়েছে।

এসব বিষয় জুলাই জাতীয় সনদেও রয়েছে।

জামায়াতের দেশ ও সমাজ গঠনে শতাধিক প্রতিশ্রুতির মধ্যে আরও রয়েছে- নির্বাচনে সরকার গঠনে সক্ষম হলে দলটি প্রথম ১০০ দিনে দুর্নীতিগ্রস্ত খাত সংস্কার করবে। প্রশাসনের প্রথম ১০০ দিনের মধ্যে পাসপোর্ট, এনআইডি ও অন্যান্য নাগরিক পরিষেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাপক সংস্কার ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।

জামায়াত জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশে উন্নীত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। আর ২০৪০ সালের মধ্যে দেশের অর্থনীতিকে দুই ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করার কথা বলেছে, যা বাস্তবসম্মত নয় বলে বিশ্লেষকরা বলছেন।

বিশ্লেষক ফরহাদ হোসেন তালুকদার বলছেন, জামায়াতের এই অঙ্কের অর্থনীতি কীভাবে অর্জিত হবে তার ‘ক্যালকুলেশন’ দেয়নি।

তিনি বলেছেন, যদি সাধারণ হিসাব করা হয়, তাহলে প্রথম ৫ বছরে জিডিপি বেড়ে হবে ৬৮০ বিলিয়ন ডলার। পরের ৫ বছরে ৯৯৯ বিলিয়ন বা এক ট্রিলিয়ন ডলার ধরা যায়। শেষ ৫ বছরে হয় ১ হাজার ৫৩৮ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ ২০৪০ সালে গিয়ে বাংলাদেশের অর্থনীতি দুই ট্রিলিয়ন নয় বরং দেড় ট্রিলিয়ন ডলার হতে পারে।

পররাষ্ট্রনীতি নিয়ে জামায়াতের এক নম্বর অগ্রাধিকার-বাংলাদেশের পাসপোর্টের মর্যাদা বাড়ানো। পাশাপাশি ভারত, ভুটান, নেপাল, মিয়ানমারসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান ও ন্যায্যতার ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তোলা।

পররাষ্ট্রনীতি সংক্ষেপে তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, “আমার দেশের স্বার্থ, আমার দেশের মানুষের স্বার্থ রক্ষা করে যাদের বন্ধুত্ব, সহযোগিতা পেলে আমরা আমাদের দেশে নতুন ব্যবসা-বাণিজ্য প্রতিষ্ঠিত করতে পারব, আমার দেশের মানুষের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করতে পারব, আমাদের দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা শক্তিশালী করতে পারব।

“পাশাপাশি অবশ্যই আমার দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব অক্ষুন্ন রাখবে…এইটার ভিত্তিতেই আমরা আমাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত করব।”

জামায়াতের ইশতেহারে ‘সরকারি চাকরির আবেদনের জন্য ফি নেওয়ার রীতি বাতিল করার’ কথা বলা হয়েছে।

কওমি মাদ্রাসার জন্য ইশতেহারে প্রতিশ্রুতি দিয়ে দলটি বলছে, ‘কওমি মাদ্রাসার সিলেবাস পরিমার্জন ও সার্টিফিকেটের মূল্যায়ন করবে’ জামায়াত।

তবে বিএনপির ইশতেহারে সিলেবাস সংশোধন নয়, বরং কওমি সনদের পূর্ণ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে।

জামায়াত বলেছে, অষ্টম শ্রেণির পর মাধ্যমিকে শিক্ষা ব্যবস্থাকে চারটি পৃথক ধারায় বিভক্ত করা হবে (ইসলামিক শিক্ষা, বিজ্ঞান শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা এবং কারিগরি শিক্ষা)।

বিএনপির ইশতেহারে শিক্ষা খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ অর্থ বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে। বাধ্যতামূলক তৃতীয় ভাষা শিক্ষা, সবার জন্য কারিগরি শিক্ষা, ক্রীড়া ও দেশীয় সংস্কৃতি শিক্ষা, সংগীত, নাটক পাঠ্যক্রমে যুক্ত করা, মিড ডে মিল চালু, ফ্রি ওয়াইফাই চালু, বিনামূল্যে স্কুলড্রেস প্রদান এবং শিক্ষা সংস্কার কমিশন গঠনের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।

হাফেজে কুরআনদের স্বীকৃতি, নতুন কুঁড়ি প্রতিযোগিতায় কুরআন তেলাওয়াত অন্তর্ভুক্ত করার আশ্বাস দিয়েছে বিএনপি।

দলটির প্রতিশ্রুতি, তরুণদের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, কারিগরি ও ভাষা দক্ষতা উন্নয়ন, স্টার্টআপ ও উদ্যোক্তা সহায়তা, বৈশ্বিক ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মে যুক্তকরণ এবং মেধাভিত্তিক সরকারি নিয়োগ নিশ্চিত করা হবে।

ইশতেহারের অষ্টম ভাগে মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই বিপ্লব পর্বে প্রতিশ্রুতিতে জামায়াত বলেছে, “মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ ও লক্ষ্য (সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার) রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় জীবনে প্রতিষ্ঠা করার কর্মসূচি গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হবে।

দলটি বলছে, “শিক্ষার্থীদের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরা হবে।”

অন্যদিকে বিএনপি বলেছে, মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের তালিকা প্রণয়ন এবং রাষ্ট্রীয় মর্যাদা ও স্বীকৃতি নিশ্চিত করা হবে। মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরার পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ করা হবে। মুক্তিযোদ্ধা উদ্যোক্তাদের বিনিয়োগে উৎসাহিত করা হবে।

এছাড়া গণঅভ্যুত্থান ও ফ্যাসিবাদবিরোদী আন্দোলনে শহীদদের নামে সরকারি স্থাপনার নামকরণ, শহীদদের সার্বিক সহায়তা করা, শহীদ পরিবার ও যোদ্ধাদের কল্যাণার্থে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে আলাদা বিভাগ প্রতিষ্ঠার কথা বলেছে বিএনপি।

দলটির ইশতেহারে বলা হয়েছে, পরিবেশ রক্ষা ও জলবায়ু সহনশীলতা জোরদারে দেশপ্রেমী জনগণের স্বেচ্ছাশ্রম ও সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে ২০ হাজার কিলোমিটার নদী, খাল খনন ও পুনঃখনন, পাঁচ বছরে ২৫ কোটি বৃক্ষ রোপণ এবং আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা চালু করা হবে।

জামায়াত বলেছে, “২০৩০ সালের মধ্যে তিন শূন্য ভিশন (পরিবশগত অবক্ষয়ের শূন্যতা, বর্জের শূন্যতা এবং বন্যা ঝুঁকির শূন্যতা) বাস্তবায়নের মাধ্যমে সব সবুজ বাংলাদেশ গড়ার লক্ষ্য এগিয়ে নেওয়া হবে।”

যা বলেছেন বিশ্লেষকরা

ইশতেহার নিয়ে বেশি আগ্রহী হওয়ার কিছু দেখেন না লেখক ও রাজনৈতিক গবেষক মহিউদ্দিন আহমদ।

দলগুলোর ইশতেহার নিয়ে জানতে চাইলে তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “এটা (ইশতেহার) তো ওদের একটা প্রথা, নির্বাচনের আগে ইশতেহার ঘোষণা করা। এই ইশতেহার এক পার্সেন্ট লোকও পড়ে কি না সন্দেহ।”

রাজনৈতিক দলগুলোর ইশতেহারে তেমন কোনো নতুনত্ব দেখছেন না রাজনীতি বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন।

তিনি বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইশতেহারে খুব বেশি নতুনত্বের জায়গা দেখিনি আমি। জামায়াতে ইসলামী এবং বিএনপির ইশতেহারও খুব কাছাকাছি। দুটো দলই খুব সতর্ক থেকে ইশতেহার করেছে। যেহেতু জামায়াত ইশতেহার দিয়েছে, বিএনপিও আমার কাছে মনে হচ্ছে, সেটার আদলে নিজেদেরকে একটা সেইফ সাইডে রেখে ইশতেহারগুলো দিয়েছে।”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃ-বিজ্ঞান বিভাগের এই অধ্যাপক বলেন, “ইশতেহারে বিশেষ করে নারীর ক্ষেত্রে আমি তো দুটো জিনিস বাদে কোনো জিনিসই খুব একটা পার্থক্য দেখলাম না। ফ্যামিলি কার্ড এবং স্নাতক পর্যন্ত ফ্রি এডুকেশন ছাড়া। তো এগুলো আসলে খুব অ্যাবস্ট্রাক্ট। খুব কংক্রিট, কৌশলগত, কোনো পজিটিভ পরিবর্তন কীভাবে হবে সেগুলোর কোনো কিন্তু ইঙ্গিত নেই।

“ইশতেহারে যেগুলো আছে কমিটমেন্টের, সেগুলো কিন্তু বেশিরভাগ অলরেডি জারি আছে। সেটা সীমিত পর্যায়ে হোক, সেটা স্বল্পমেয়াদী হোক, কিন্তু সেগুলো অলরেডি আছে বিভিন্ন ফর্মে। চমক সৃষ্টিকারী নতুনত্ব, আশা জাগানিয়া এমনকি পরিবর্তন সূচক কোনো ইশতেহার আসলে আমার কাছে মনে হয়নি।”

রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাহেদ উর রহমানের পর্যবেক্ষণ, “জামায়াতের ইশতেহারের চেয়ে বিএনপির ইশতেহার মাচ বেটার।”

তিনি বলছেন, “বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান দীর্ঘদিন লন্ডনে থাকার একটি প্রভাব পড়েছে ইশতেহারে। তিনি পরিবেশ নিয়ে বিগত দিনের নেতাদের চেয়ে বেশি স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছেন। পানি সমস্যা নিয়ে তারেক রহমান সচেতন।”

বিএনপির ইশতেহারে কী নেই?

ইশতেহারে বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে রাজনৈতিক ও সামাজিক বিভাজনের অবসান ঘটানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বিএনপি।

‘ঐক্যবদ্ধ জাতিগঠন’ উপ-দফায় বলা হয়েছে, “বিএনপি চায় বিভক্ত হয়ে পড়া এ জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে। দেশের মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টান, পাহাড়ের মানুষ, সমতলের মানুষ, ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সকলে মিলে আমরা গড়ে তুলব জাতীয় ঐক্য ও অখণ্ড জাতীয় সত্তা।”

তবে এই পর্বে তারেক রহমানের বক্তব্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে দেওয়া বক্তব্যের একটি অংশ আসেনি।

২০২৫ সালের ৫ অগাস্ট জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছর পূর্তিতে তারেক বলেছিলেন, “তেমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চাই, যেখানে দল-মত ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে, বিশ্বাসী-অবিশ্বাসী, সংশয়বাদী, প্রতিটি সন্তান, প্রতিটি মানুষ নিরাপদে থাকবে।”

ইশতেহারে কী নেই, যা দরকারি ছিল— এমন প্রশ্নের জবাবে বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেছেন, “ইশতেহার অনেক বিস্তারিত, কিন্তু চমকপ্রদ কোনো লাইন নাই। যারা এটা করেছে, তারা বলতে পারবেন।”

এ বিষয়ে কথা বলতে ইশতেহার প্রণয়ন কমিটির একজন সদস্যকে ফোন করা হলেও তিনি ধরেননি।

হোটেল সোনারগাঁওয়ে ইশতেহার ঘোষণার অনুষ্ঠানে এসেছিলেন বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক।

তার মূল্যায়ন হল, “দুর্নীতি, সুশাসন নিয়ে তারেক রহমান যা বলেছেন, এটুকু যদি নিশ্চিত করা যায়, তাহলে এই অবস্থা থেকে বের হতে সক্ষম হব।”

ইশতেহারে তারেক রহমান প্রতিশ্রুতি দেন, বিএনপি নির্বাচনে জয়ী হলে ‘গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামে’ অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়ে ‘জনকল্যাণমূলক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক’ সরকার গঠন করবে। ‘দুর্নীতি, আইনের শাসন ও জবাবদিহিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেবে।

বিএনপির সমর্থন নিয়ে ঢাকা-১২ আসন থেকে নির্বাচনে অংশ নেওয়া সাইফুল হক মনে করেন, “ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, পররাষ্ট্র নীতির বিষয়ে প্রতিশ্রুতিগুলো জনগণকে টানবে। এই ইশতেহার অনেক বিশদ, বাস্তবায়নযোগ্য একটা জায়গা থেকে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।”

ইশতেহার নিয়ে স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতা বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকমকে বলেন, “ইশতেহারে তারেক রহমানের পরিবার নিয়ে বেশি কিছু বলা হয়নি, এটা ভালো দিক।”

গণফোরামের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি সুব্রত চৌধুরীর মতে, ইশতেহারে জিয়াউর রহমানের ২৭ দফা, খালেদা জিয়ার ভিশন ২০৩০, তারেক রহমানের ২৭ দফা ও যুগপৎ আন্দোলনের ৩১ দফাকে সমন্বয় করা হয়েছে।

“আমরা নির্বাচনের পর বিএনপিকে পর্যবেক্ষণে রাখব, তারা তাদের ইশতেহার প্রতিপালন করে কিনা।”

তবে বিএনপি কাভার করা এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিকের মন্তব্য হল, “ইশতেহারে নতুন কিছু নেই।”

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়