দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে চিত্রা হরিণ। কখনো দাঁড়িয়ে, কখনো গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিচ্ছে। রাজধানীর মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানার একাধিক খাঁচায় দেখা মেলে এমন হরিণের। দর্শনার্থীদের কাছে আকর্ষণীয় এই প্রাণী চাইলে বাড়িতেও পালন করতে পারেন। কারণ, জাতীয় চিড়িয়াখানায় উদ্বৃত্ত থাকা হরিণ বিক্রি করা হয়। প্রতিটি হরিণের দাম ৫০ হাজার টাকা। তবে একটি নয়, কিনতে হবে কমপক্ষে এক জোড়া—একটি পুরুষ ও একটি মাদি হরিণ।
জাতীয় চিড়িয়াখানায় চিত্রা, মায়া ও সাম্বার—এই তিন প্রজাতির হরিণ আছে। এর মধ্যে চিত্রা হরিণের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। তাই মূলত এই প্রজাতির হরিণই বিক্রি করে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। ব্যক্তিগত শখে লালন–পালন কিংবা বাণিজ্যিক খামার করার জন্য ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এসব হরিণ কেনেন।
জাতীয় চিড়িয়াখানার পরিচালক মো. শাহিনুর আলম প্রথম আলোকে বলেন, চিড়িয়াখানায় বর্তমানে ৩৫০টির মতো চিত্রা হরিণ আছে। এ প্রজাতির মা হরিণ প্রতিবছর বাচ্চা দেয়। চিড়িয়াখানার অন্য প্রাণীদের তুলনায় চিত্রা হরিণের বাচ্চা জন্মানোর হারও বেশি। ফলে প্রতিবছর এদের সংখ্যা বাড়ছে।
শাহিনুর আলম বলেন, একটি চিড়িয়াখানায় একই প্রজাতির এত প্রাণীর প্রয়োজন হয় না। উদ্বৃত্ত হরিণ বিক্রি করা না হলে সেগুলো রাখার জায়গার সংকট তৈরি হতো।
জাতীয় চিড়িয়াখানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২৪টি, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৩টি এবং চলতি অর্থবছরের এখন পর্যন্ত ১৫টি হরিণ বিক্রি করা হয়েছে।
দেখতে সুন্দর, স্বভাবে দলবদ্ধ
জাতীয় চিড়িয়াখানার মূল ফটক দিয়ে ঢুকলে বাঁ পাশে দেখা মিলবে চিত্রা হরিণের। অনেক দর্শনার্থীর চিড়িয়াখানায় প্রাণী দেখা শুরু হয় এই হরিণ দিয়েই। পরিচালকের কার্যালয় পার হলে রয়েছে আরও একটি বড় খাঁচা। সেখানে কখনো দলবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে, কখনো গাছের ছায়ায় বিশ্রাম নিতে দেখা যায় হরিণগুলোকে। চিড়িয়াখানার উত্তর লেকের কাছেও রয়েছে এদের আরেকটি খাঁচা।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, চিত্রা হরিণ চিত্রল, চিত্র মৃগ ও চিতল নামেও পরিচিত। বাংলাদেশ ও ভারতের সুন্দরবন অঞ্চলে এদের দেখা মেলে। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কা, নেপাল ও ভুটানের বনাঞ্চলেও রয়েছে এই প্রজাতির হরিণ। সারা শরীরে উজ্জ্বল লালচে-বাদামি রঙের ওপর সাদা ফোঁটা চিত্রা হরিণের প্রধান বৈশিষ্ট্য। দেখতে আকর্ষণীয় এই হরিণ পোষ মানে এবং দলবদ্ধভাবে বসবাস করে। দ্রুতগতিতে দৌড়াতেও পারে।
একটি পূর্ণবয়স্ক চিত্রা হরিণের দৈর্ঘ্য ৪২ থেকে ৫৫ ইঞ্চি এবং উচ্চতা ৩০ থেকে ৩৮ ইঞ্চি হয়ে থাকে। ওজন ৭৫ থেকে ১০০ কেজি। প্রাকৃতিক পরিবেশে চিত্রা হরিণ কেওড়া, বাইন, গেওয়া, ওরা, গরান ও কাঁকড়াগাছের পাতা, ছোট চারা এবং কচি ডালপালা খায়। গাছের ছালও এদের খাদ্যতালিকায় আছে। তবে জাতীয় চিড়িয়াখানায় এদের দেওয়া হয় সবুজ ঘাস, শাকসবজি, ছোলা ও মিশ্র দানাদার খাবার।
প্রজনন ঋতুতে একাধিক পুরুষ চিত্রা হরিণের মধ্যে স্ত্রী হরিণকে কেন্দ্র করে লড়াই হয়। এতে অনেক সময় তাদের শিং ভেঙে যায়। শিং ঝরে গেলে আবার নতুন করে গজায়। স্ত্রী চিত্রা হরিণ সাধারণত ১৪ থেকে ১৭ মাস বয়সে প্রজননক্ষম হয়। ২১০ থেকে ২২৫ দিন গর্ভধারণের পর একটি বাচ্চা জন্ম দেয়। প্রাকৃতিক পরিবেশে এরা পাঁচ থেকে ১০ বছর বাঁচে। তবে আবদ্ধ পরিবেশে গড় আয়ু প্রায় ২২ বছর পর্যন্ত হতে পারে।
হরিণ পালনে মানতে হবে যেসব শর্ত
দেশে হরিণ লালন–পালন ও খামার করার সুযোগ আছে। এ জন্য বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় ২০১৭ সালে ‘হরিণ ও হাতি লালন-পালন বিধিমালা’ জারি করে। বিধিমালা অনুযায়ী, জাতীয় চিড়িয়াখানা কিংবা অনুমোদিত বাণিজ্যিক খামার থেকে হরিণ কিনে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান তা পালন করতে পারে।
কোনো ব্যক্তির কাছে অনধিক ১০টি হরিণ থাকলে তাঁকে বিধিমালায় ‘শৌখিন লালন–পালনকারী’ বলা হয়েছে। আর ১০টির বেশি হরিণ থাকলে সেটি খামার হিসেবে বিবেচিত হবে। খামারের মালিককে বলা হয়েছে খামারি। হরিণ পালনের জন্য প্রথম শর্ত হলো উপযুক্ত জায়গা থাকা। নিজস্ব মালিকানাধীন, ভাড়া নেওয়া অথবা সরকারের কাছ থেকে দীর্ঘমেয়াদি ইজারা পাওয়া জমিতে হরিণ পালন করা যাবে।
বিধিমালায় শৌখিন লালন–পালনকারী ও খামারি—উভয়ের জন্য হরিণের ছাউনির (শেড) ন্যূনতম আয়তন ১০০ বর্গফুট এবং উচ্চতা ১০ ফুট নির্ধারণ করা হয়েছে। শেডে দানাদার খাবার, খনিজ লবণ ও সুপেয় পানির জন্য আলাদা পাত্র রাখতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে পর্যাপ্ত পানি ও সুষম খাবারের ব্যবস্থা।
বিধিমালায় আরও বলা হয়েছে, শুধু শেড থাকলেই হবে না, প্রতিটি হরিণের বিচরণের জন্য থাকতে হবে কমপক্ষে ৫০০ বর্গফুট উন্মুক্ত জায়গা। শেড ও বিচরণক্ষেত্রের চারপাশে অন্তত ১০ ফুট উঁচু নিরাপত্তাবেষ্টনী নির্মাণ করতে হবে। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো, যেসব প্রাকৃতিক বনে হরিণ পাওয়া যায়, সেসব বন থেকে কমপক্ষে ৩০ কিলোমিটার দূরে হরিণ পালনের স্থান বা খামার স্থাপন করতে হবে।
হরিণ পালনে লাগবে সনদ
হরিণ ও হাতি লালন-পালন বিধিমালায় বলা হয়েছে, হরিণের খামার করতে হলে বন অধিদপ্তরের অনুমোদন (লাইসেন্স) নিতে হবে। শুধু খামারি নন, শৌখিনভাবে হরিণ পালনকারীকেও প্রতিটি হরিণের জন্য পজেশন সনদ সংগ্রহ করতে হবে। এসব অনুমোদন ও সনদ দেয় বন অধিদপ্তর।
হরিণের মালিকানা বা অবস্থান পরিবর্তনের ক্ষেত্রেও রয়েছে বিধিনিষেধ। বিধিমালা অনুযায়ী, লাইসেন্সিং কর্তৃপক্ষ অর্থাৎ বন অধিদপ্তরের লিখিত অনুমতি ছাড়া কোনো খামারি, শৌখিন লালন–পালনকারী, ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান হরিণ কিনতে, বিক্রি করতে, দান করতে, বিনিময় করতে কিংবা অন্য কোনোভাবে হস্তান্তর করতে পারবেন না।
যে যেখান থেকেই হরিণ কিনুক না কেন, কিংবা যিনিই কিনুক না কেন, হরিণ সব সময়ই রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নজরদারিতে থাকে। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, তারা হরিণ বিক্রির পর তা দেখভাল করে বন অধিদপ্তর। হরিণ মারা গেলে কিংবা নতুন বাচ্চা জন্ম নিলেও বন অধিদপ্তরকে জানাতে হবে এবং তথ্য সংরক্ষণ করতে হবে। হরিণের বেচাকেনা ও স্থানান্তরের তথ্য সংরক্ষণের মাধ্যমে প্রাণীগুলোর অবস্থান সম্পর্কে নজরদারি করে কর্তৃপক্ষ।
বিধিমালায় হরিণ মাংসের জন্য বিক্রি বা খাওয়ার সুযোগ নেই। নিয়ম ভঙ্গ করলে কর্তৃপক্ষ হরিণ জব্দ করতে পারে, এমনকি লাইসেন্সও বাতিল করতে পারে।
চিড়িয়াখানা থেকে যেভাবে কিনবেন
জাতীয় চিড়িয়াখানায় উদ্বৃত্ত হরিণ থাকা সাপেক্ষে সারা বছরই বিক্রি করা হয়। তবে চাইলেই সরাসরি গিয়ে কেনা যায় না। এ জন্য অনুসরণ করতে হয় নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া।
জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটর মো. হাবিবুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দেশের যেকোনো ব্যক্তি তাঁদের কাছ থেকে হরিণ কিনতে পারবেন। আগ্রহী ক্রেতাকে প্রথমে চিড়িয়াখানায় যোগাযোগ করে জানতে হবে, বিক্রির জন্য হরিণ রয়েছে কি না। হরিণ থাকলে তাঁকে বন অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে হবে।
বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা ক্রেতার হরিণ পালনের জায়গা পরিদর্শন করবেন। সেখানে হরিণ পালনের উপযুক্ত পরিবেশ ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা রয়েছে কি না, তা যাচাই করে অনুমতিপত্র দেওয়া হয়। সেই অনুমতিপত্র জাতীয় চিড়িয়াখানায় জমা দিলে হরিণ কেনা যাবে বলে জানিয়েছেন হাবিবুর রহমান।
চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বলছে, প্রতিটি হরিণের দাম ৫০ হাজার টাকা। তবে কমপক্ষে এক জোড়া, অর্থাৎ একটি পুরুষ ও একটি মাদি হরিণ কিনতে হবে। চাইলে এর বেশি সংখ্যায়ও কেনা যাবে। তবে একটি মাত্র হরিণ কেনার সুযোগ নেই। চিড়িয়াখানায় নগদ টাকা কিংবা ব্যাংকের মাধ্যমে হরিণের মূল্য পরিশোধ করা যায়।
গত ১৬ আগস্ট জাতীয় চিড়িয়াখানা থেকে এক জোড়া হরিণ কিনেছেন ফরিদপুরের নগরকান্দার মুহাম্মদ গোলাম কাইয়ুম। শখ করে হরিণ দুটি পালন করছেন তিনি। গোলাম কাইয়ুম প্রথম আলোকে বলেন, হরিণ কেনার জন্য প্রথমে জাতীয় চিড়িয়াখানায় আবেদন করেন তিনি। সেখান থেকে তাঁকে বন অধিদপ্তরের অনুমতি নিতে বলা হয়। আবেদনে হরিণ দুটি কোথায় পালন করবেন, তা উল্লেখ করেন। পরে নির্ধারিত দিনে বন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা তাঁর হরিণ পালনের জায়গা পরিদর্শন করেন। পরিবেশ উপযুক্ত মনে হওয়ায় প্রয়োজনীয় নথিপত্রসহ অনুমতিপত্র দেওয়া হয়। সেটি জমা দিয়ে চিড়িয়াখানা থেকে হরিণ দুটি কেনেন তিনি। এখন হরিণ দুটি ভালো আছে।
খামার থেকেও কেনার সুযোগ
জাতীয় চিড়িয়াখানার পাশাপাশি অনুমোদিত বাণিজ্যিক খামার থেকেও হরিণ কেনার সুযোগ রয়েছে। বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ, আইডি ও ইউটিউব চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিয়ে হরিণ বিক্রির প্রচার চালান খামারিরা। চাইলে সরাসরি খামারে গিয়েও হরিণ কেনা যায়।
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার শামসুদ্দিন ইউটিউব চ্যানেলে বিজ্ঞাপন দিয়ে হরিণ বিক্রি করেন। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, প্রায় দেড় বছর আগে বন অধিদপ্তর থেকে হরিণের খামার করার লাইসেন্স পেয়েছেন। তাঁদের খামারে বর্তমানে ১০ থেকে ১২টি হরিণ রয়েছে।
শামসুদ্দিন বলেন, লাইসেন্স পাওয়ার পর তাঁরা বাণিজ্যিক খামার থেকে হরিণ কিনেছেন। এখন নতুন খামারি কিংবা শৌখিন লালন–পালনকারীদের কাছে হরিণ বিক্রি করেন। প্রতিটি হরিণ বন অধিদপ্তরের অনুমতি নিয়ে বিক্রি করা হয়। তাঁর দাবি, হরিণের খামারের ব্যবসা লাভজনক।
সূত্র : প্রথম আলো