মহাকর্ষীয় টানের খেলায় পৃথিবীর চারপাশে অস্থায়ী সঙ্গী হিসেবে যুক্ত হয়েছে নতুন এক ‘মিনি চাঁদ’। আকারে মাত্র ৬ ফুট চওড়া একটি মহাকাশ শিলাকে নিজের মহাকর্ষ জালে আটকে নিয়েছে আমাদের গ্রহ। মহাজাগতিক এই ক্ষুদ্র উপগ্রহটির আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয়েছে ‘২০২৬ কিউকিউ৮’ (2026 QQ8)। আন্তর্জাতিক জ্যোতির্বিজ্ঞান ইউনিয়নের মাইনর প্ল্যানেট সেন্টার সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।
গবেষকদের তথ্যমতে, চলতি বছরের এপ্রিল মাসেই শিলাটি পৃথিবীর কক্ষপথে প্রবেশ করে, যদিও গত আগস্টে টেলিস্কোপে প্রথম এর উপস্থিতি ধরা পড়ে। তবে পৃথিবীর সঙ্গে এই ক্ষুদ্র চাঁদের সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। আগামী ডিসেম্বর অর্থাৎ বড়দিনের উৎসব পর্যন্ত এটি পৃথিবীর চারপাশে ঘুরবে এবং ২০২৭ সালের জানুয়ারি নাগাদ মহাকর্ষীয় টান কাটিয়ে ফের গভীর মহাশূন্যে ছিটকে যাবে।
কম্পিউটার সিমুলেশনের মাধ্যমে শিলাটির গতিপথ পুনর্গঠন করে বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, এটি সূর্যের চারদিকে একবার প্রদক্ষিণ করতে ৩৫০ দিনের কিছু বেশি সময় নেয়—যা প্রায় পৃথিবীর এক বছরের সমান। প্রতি ১০ বছর পর পর এটি পৃথিবীর কাছাকাছি এলেও এবার তুলনামূলক বেশি কাছে চলে আসায় পৃথিবীর মহাকর্ষ এটিকে সাময়িকভাবে আটকে ফেলে।
মাইনর প্ল্যানেট সেন্টার জানিয়েছে, অবস্থানকালে ‘২০২৬ কিউকিউ৮’ পৃথিবীর সবচেয়ে কাছাকাছি দূরত্বে পৌঁছেছিল প্রায় ৩ লাখ ৫৩ হাজার মাইল দূরে, যা পৃথিবী ও মূল চাঁদের গড় দূরত্বের চেয়ে প্রায় ১ লাখ ১০ হাজার মাইল বেশি। বিজ্ঞানীরা আশ্বস্ত করেছেন, শিলাটি পৃথিবীর জন্য বিন্দুমাত্র বিপজ্জনক নয়। সরাসরি পৃথিবীর দিকে ছুটে এলেও মাত্র ২ মিটার বা ৬ ফুট ব্যাসের এই ক্ষুদ্র শিলাটি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের সঙ্গে সঙ্গেই জ্বলে ছাই হয়ে যেত।
মহাকাশ গবেষকদের মতে, পৃথিবীর এমন অস্থায়ী ‘মিনি চাঁদ’ ধরে ফেলার ঘটনা নতুন নয়। সাম্প্রতিক মডেলিং অনুযায়ী, যেকোনো সময়েই পৃথিবীর মহাকর্ষে প্রায় ছয়টি পর্যন্ত ক্ষুদ্র প্রাকৃতিক বা কৃত্রিম বস্তু অস্থায়ী উপগ্রহ হিসেবে অবস্থান করতে পারে, যার অনেকগুলোই হয়তো মূল চাঁদেরই বিচ্ছিন্ন অংশ। সাধারণত এ ধরনের অস্থায়ী স্যাটেলাইটের গড় আকার হয় প্রায় ৭৫ সেন্টিমিটার (৩০ ইঞ্চি) এবং এদের স্থায়িত্বকাল থাকে গড়ে প্রায় ৯ মাস। তবে কোনো শিলা যদি ১০ ফুটের বেশি চওড়া হয়, তবে তা ১০ থেকে ২০ বছর পর্যন্ত পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করতে পারে।
খালি চোখে দৃশ্যমান না হলেও অত্যন্ত শক্তিশালী টেলিস্কোপ ও উন্নত সফটওয়্যারের সহায়তায় এই ধরনের শিলা চিহ্নিত করা হয়। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ‘২০২৬ কিউকিউ৮’-এর মতো কাছাকাছি আসা বস্তুগুলো সৌরজগতের আদি গঠন, গতিপ্রকৃতি এবং গ্রহাণুর আচরণ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণের দারুণ সুযোগ তৈরি করে দেয়। বড়দিনের ছুটির দিনগুলোতে প্রদক্ষিণ শেষ করে নতুন বছরে আবারও মহাশূন্যের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে পৃথিবীর এই স্বল্পমেয়াদি অতিথি।