মনিরুল ইসলাম : ধর্মীয় পরিচয় আলাদা হলেও রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশ সবার এবং এ দেশের প্রতিটি নাগরিকের সমান অধিকার ও সমান কর্তব্য রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্ব। তাই পারস্পরিক সম্প্রীতি, সহমর্মিতা ও ঐক্যের মধ্য দিয়ে সবাইকে একসঙ্গে দেশকে সমৃদ্ধির পথে এগিয়ে নিতে হবে।
আজ সোমবার ১৯ অক্টোবর সন্ধ্যায় শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দুর্গোৎসব আনন্দের আয়োজন, সম্প্রীতির উৎসব এবং সবার মিলনমেলা। এ উপলক্ষে তিনি দেশের সব সনাতন ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনকে আন্তরিক শারদীয় শুভেচ্ছা জানান।
তারেক রহমান বলেন, মানুষের সবচেয়ে বড় ও প্রথম পরিচয় হলো—সবাই এ দেশের সন্তান এবং বাংলাদেশি। ধর্মীয় পরিচয় ভিন্ন হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের জায়গায় সবাই সমান। বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মাবলম্বী মানুষের একার নয়; এ দেশ সব নাগরিকের।
মুক্তিযুদ্ধ ও গণ-অভ্যুত্থানে ঐক্যের উদাহরণ
দেশের ইতিহাসে ঐক্য ও পারস্পরিক সহযোগিতার দৃষ্টান্ত তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার জন্য এ দেশের মানুষ অস্ত্র হাতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। তখন কেউ বিবেচনা করেনি কে হিন্দু, কে মুসলমান, কে বৌদ্ধ কিংবা কে খ্রিস্টান। স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় সবাই একসঙ্গে লড়াই করেছে।
তিনি আরও বলেন, ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানেও মানুষের রাজনৈতিক অধিকার ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে লাখ লাখ মানুষ রাজপথে নেমেছিল। সেসব আন্দোলনে মানুষের পরিচয়ের চেয়ে অধিকার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাই বড় হয়ে উঠেছিল।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে আসে, বাংলাদেশের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ অর্জনগুলো সম্ভব হয়েছে মানুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও ঐক্যের মাধ্যমে। সেই ঐক্যের চেতনাকে ধারণ করেই বর্তমান ও ভবিষ্যতের বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।
সবার সমান অধিকার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে
নাগরিক অধিকার ও নিরাপত্তার বিষয়ে স্পষ্ট অবস্থান তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, ‘ধর্ম যার যার হতেই পারে—আমার একটি ধর্ম, আপনার আরেকটি ধর্ম; কিন্তু এই বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটি আমাদের সবার।’
তিনি বলেন, দেশের প্রতি প্রত্যেক নাগরিকের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি রয়েছে দায়িত্ব ও কর্তব্য। রাষ্ট্র হিসেবে একজন নাগরিককে নিরাপত্তা দেওয়া যেমন সাংবিধানিক দায়িত্ব, অন্য নাগরিকের ক্ষেত্রেও একই দায়িত্ব পালন করতে হবে।
ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে যেন কোনো নাগরিক নিজেকে অধিকারবঞ্চিত বা নিরাপত্তাহীন মনে না করেন, সে বিষয়ে রাষ্ট্রের দায়িত্বের গুরুত্বও তাঁর বক্তব্যে প্রতিফলিত হয়। নাগরিকদের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই একটি ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তোলা সম্ভব।
বিপদে একে অপরের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান
প্রধানমন্ত্রী বলেন, একজন মানুষ বিপদে পড়লে অন্যজনের পাশে দাঁড়ানো এবং একে অপরকে রক্ষা করা সবার দায়িত্ব হওয়া উচিত। ধর্মীয় পরিচয় কিংবা সামাজিক বিভেদের কারণে যেন মানুষের প্রতি মানুষের দায়িত্ববোধ কমে না যায়, সে বিষয়ে সবাইকে সচেতন থাকতে হবে।
তিনি ধর্ম-বর্ণের বিভেদ ভুলে প্রত্যেককে মানুষ ও বাংলাদেশি হিসেবে বিবেচনা করার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও সহযোগিতার ভিত্তিতে সমাজে সম্প্রীতির পরিবেশ বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
তারেক রহমানের মতে, দেশের সব নাগরিকের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া টেকসই উন্নয়ন ও সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব নয়। তাই ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের ভিন্নতা বজায় রেখেই জাতীয় স্বার্থে সবাইকে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে।
সম্প্রীতির বাংলাদেশ গড়ার প্রত্যয়
শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দিরে প্রধানমন্ত্রীর এ শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে ধর্মীয় সম্প্রীতি, নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা ও জাতীয় ঐক্যের বিষয়গুলো বিশেষ গুরুত্ব পায়।
বাংলাদেশের বহুধর্মীয় ও বহুত্ববাদী সমাজে পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সহাবস্থান বজায় রাখা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। উৎসবের আনন্দ যেন সব সম্প্রদায়ের মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে এবং কেউ যেন ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে বৈষম্যের শিকার না হন—এমন প্রত্যাশার কথাই প্রতিফলিত হয়েছে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যে।
ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার—এই ধারণাকে সামনে রেখে সব নাগরিকের সমান অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।