শিরোনাম
◈ দুই হাইভোল্টেজ ম্যাচের আগে বার্সেলোনা শিবিরে জোড়া ধাক্কা ◈ সৌদিতে দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড: রায়ের কপি পেলে পরবর্তী পদক্ষেপ, জানালেন শামা ওবায়েদ ◈ কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে দেশের সব উপজেলায় কমিটি গঠনের সিদ্ধান্ত ◈ টাইগার শ্রফকে হত্যাচেষ্টার অভিযোগে গ্রেপ্তার ৩, আরও যে তথ্য সামনে এসেছে ◈ ফ্রান্সে স্কুলের আন্দোলন যেভাবে রাজনৈতিক সংকটে পরিণত হলো ◈ সমস্যাটা তো হলো স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর, গুলি কেন খেলেন ইশরাক ভাই: নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী ◈ বিরোধিতার নামে আওয়ামী লীগকে ফেরানোর চেষ্টা জুলাই শহীদদের সঙ্গে প্রতারণা: তারেক রহমান ◈ কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন, ইশরাকের বিষয়ে আরও যা বললেন আইনমন্ত্রী ◈ আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি আমি সেদিন কোনো ভুল করিনি: মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ◈ জুলাই স্মৃতিস্তম্ভের উদ্বোধনে না আসায় বিরোধী দল শহীদ পরিবারকে অবজ্ঞা করেছে: প্রধানমন্ত্রী

প্রকাশিত : ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:০৯ বিকাল
আপডেট : ১৯ অক্টোবর, ২০২৬, ০৭:০৯ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ঝিনাইদহে বিএনপি নেতা আনোয়ারের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসী,চাঁদাবাজি,দখলবাজিসহ নানা অভিযোগ, প্রতিকার চেয়ে ইউনিয়নবাসীর আবেদন

ফিরোজ আহম্মেদ, ঝিনাইদহ প্রতিনিধি: সন্ত্রাসী,চাঁদাবাজি,দখলবাজি,সালিশের নামে অর্থ আদায়,ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা,সরকারি জায়গা দখল,ত্রাণ বিতরণে অনিয়ম ও মাদক কারবারে সম্পৃক্ততাসহ নানা অভিযোগ উঠেছে ঝিনাইদহ সদর উপজেলার ১১ নম্বর পদ্মাকর ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণ,সাধারণ মানুষের কাছ থেকে অর্থ আদায় এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এসব অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে রাজনৈতিক নেতৃত্ব,প্রশাসন ও সাংবাদিকদের কাছে আবেদন করেছেন ভুক্তভোগীরা।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে,২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে এলাকায় প্রভাব বিস্তার করে বিভিন্ন বাজার ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেন আনোয়ার হোসেন ও তাঁর অনুসারীরা। এ সময় চাঁদা আদায়,ব্যবসায়ীদের হয়রানি,জমি ও সরকারি সম্পদ দখল এবং সামাজিক আধিপত্য বিস্তারের একাধিক ঘটনার বিবরণ তুলে ধরা হয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী,২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর বিভিন্ন বাজারে ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করেন আনোয়ার হোসেন ও তাঁর কর্মীরা। লৌহজাঙ্গা গ্রামের হিন্দু সম্প্রদায়ের ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করে তাঁদের কাছ থেকেও অর্থ নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। পাইকপাড়া আবাসনের পেছনে আজাদ ও তাঁর ছেলে অনিকের কাছ থেকে ছাগল চুরির অপবাদ দিয়ে ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। হাটগোপালপুর বাজারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার উদ্দেশ্যে মিমি ফার্মেসিসহ সাতটি দোকানে পরিকল্পিতভাবে চুরি করানোর অভিযোগও রয়েছে। এতে আনুমানিক পাঁচ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের। তাদের ভাষ্য,এ ঘটনায় তৎকালীন ঝিনাইদহ সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তদন্ত শুরু করলেও পরে তা আর এগোয়নি। একই বাজারের বাসস্ট্যান্ড ও ইজিবাইক স্ট্যান্ড,মাহিন্দ্র স্ট্যাড নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিজস্ব লোকজনের মাধ্যমে কমিশন বাণিজ্য পরিচালনার অভিযোগও করা হয়েছে। হাটগোপালপুর খাদ্যগুদামের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ধান-চালের ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগ উঠেছে আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। অন্য কেউ সেখানে ব্যবসা করতে গেলে হামলা ও নির্যাতনের আশঙ্কা তৈরি করা হয় বলে দাবি অভিযোগকারীদের। সরকারি জায়গায় ঘর নির্মাণ করে দেওয়ার কথা বলে মাছবাজারের ইউনুস সরদার ও বিপু মুন্সির কাছ থেকে অর্থ নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া স্কুলের খেলার মাঠ জায়গা দখল করে মার্কেট নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মামলা করলে নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে যায় বলে দাবি করা হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে হাটগোপালপুর বাজারের এক বছরের ইজারার প্রায় ২১ লাখ ৮৪ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগও তোলা হয়েছে। দুস্থ,অসহায় ও দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ করা সরকারি ত্রাণসামগ্রী বিতরণেও অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি,ইউনিয়ন পরিষদ থেকে চেয়ারম্যানকে সরিয়ে দেওয়ার পর রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে আনোয়ার হোসেন নিজের ইচ্ছামতো অর্থের বিনিময়ে এসব সহায়তা বিতরণ করেছেন। এতে প্রকৃত অসহায় মানুষেরা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে।

অভিযোগপত্রে ঝিনাইদহ সদর থানা ছাত্রদলের সদস্য সচিব সাকিব আহমেদের চাচা আরিফকে মারধর করে তার পা ভেঙে দেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া কালা লক্ষ্মীপুর গ্রামে সামাজিক আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে মাহাবুব নামের এক ব্যক্তিকে হত্যার অভিযোগ তোলা হয়েছে। পদ্মাকর গ্রামে দুই প্রতিবেশীর মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে এক পক্ষকে নিজের নিয়ন্ত্রণে নেওয়া এবং অপর পক্ষের কাছ থেকে এক লাখ টাকা আদায়ের অভিযোগও রয়েছে।

Advertisement

জেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক জাহাঙ্গীর হোসেনের ভাই হাসানের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা করে পাটবোঝাই গাড়ি নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। পরে সালিশের মাধ্যমে ১০ লাখ টাকার পাটের বিপরীতে মাত্র ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়েছে।

জমি বিক্রি ও রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে। অভিযোগপত্র অনুযায়ী,হাটগোপালপুর এলাকার কাজল বিশ্বাসের জমি বিক্রির পর তাঁর কাছ থেকে ৬০ হাজার টাকা নেওয়া হয়। পদ্মাকর গ্রামের বিএনপিকর্মী জাহিদ মোল্লার কাছ থেকে ২০ হাজার টাকা এবং তিওড়দহ গ্রামের আব্দুস সাত্তার,ছয়াইল গ্রামের জাহিদুল বিশ্বাস ওরফে ঝন্টু ও পুটিয়া গ্রামের টিপুর কাছ থেকে পৃথকভাবে মোট ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ করা হয়েছে।

সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান বিকাশ বিশ্বাসকে দুই লাখ টাকার বিনিময়ে পুনর্বাসনের অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগপত্রে তাঁকে ‘ফ্যাসিবাদের হোতা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এছাড়াও হাটগোপালপুর বাজারের পাওয়ারহাউসের উত্তর পাশে মিলন ওরফে আমেরিকান মিলনের কাছ থেকে মোটরসাইকেল কেনার জন্য জোরপূর্বক ১০ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ করা হয়েছে। বাজারের ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে কাঁচাবাজার,মাছ ও মাংসসহ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে মূল্য পরিশোধ না করার অভিযোগও তুলেছেন অভিযোগকারীরা। তাদের দাবি,বাজারে ব্যবসা করতে হলে চাঁদা দিতে হয়। কেউ প্রতিবাদ করলে হামলা,মামলা ও নির্যাতনের ভয় দেখানো হয়। এ কারণে অনেক ব্যবসায়ী ভয়ে মুখ খুলতে চান না।

আনোয়ার হোসেনের ভাগ্নে সুমনকে দিয়ে ইয়াবা,গাঁজা ও অন্যান্য মাদকের ব্যবসা পরিচালনার অভিযোগও করা হয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি,এ ধরনের কর্মকা-ের কারণে এলাকার যুবসমাজ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে চাপে রাখতে আনোয়ার হোসেন নিজের গ্রাম ছয়াইল থেকে লোকজন এনে হামলা ও নির্যাতন চালান বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। প্রতিপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ বা সামাজিক সম্পর্ক রাখলেও অন্যদের ওপর হামলার আশঙ্কা তৈরি করা হয় বলে দাবি অভিযোগকারীদের। এমনকি সামাজিক অনুষ্ঠান ও পারিবারিক আয়োজনে কাকে আমন্ত্রণ জানানো হবে,সে ক্ষেত্রেও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে। নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের আমন্ত্রণ জানাতে বাধ্য করা এবং অন্যদের সামাজিকভাবে একঘরে করার চেষ্টায় ইউনিয়নের সামাজিক সম্প্রীতি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

অভিযোগকারীদের দাবি,এসব ঘটনার কারণে পদ্মাকর ইউনিয়নের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ভীতি তৈরি হয়েছে। তাঁরা অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত,জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ এবং এলাকায় স্বাভাবিক ব্যবসায়িক ও সামাজিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়েছেন।

ভুক্তভোগী হাসান বলেন,‘হাটগোপালপুর বাজারের পাটের ব্যবসা করি আমি। আমার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা করে আনোয়ার ও তার অনুসারীরা। পরে এ ঘটনায় সালিশ বসে। সালিশে ১০ লাখ টাকার পাটের বিপরীতে মাত্র ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা দেয় আমাকে। বাকি টাকা আনোয়ার হোসেন আতœসাৎ করে।

আরেক ভুক্তভোগী পদ্মাকর গ্রামের জাহিদ মোল্লা বলেন,‘আমার পরিবারের সবাই বিএনপির রাজনীতি করে। আওয়ামীলীগ সরকারের সময় অনেক বছর নির্যাতনের শিকার হয়েছি। ২০২৪ সালের ৫আগস্ট পরবর্তী সময়ে আনোয়ার হোসেন আমার পরিবারকে বাড়িছাড়া করে। এপর্যায়ে তাকে ২০ হাজার টাকা চাঁদা দিয়ে বাড়িতে ফিরে আসি। তার কাছে এখনও জিম্মি হয়ে আছি।’

এবিষয়ে অভিযুক্ত বিএনপি নেতা আনোয়ার হোসেন বলেন,‘আমার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ উঠেছে সব মিথ্যা। নিজেদের স্বার্থ হাসিলের জন্য আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে একটি মহল।’

ঝিনাইদহ সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এ্যাড. মুন্সি কামাল আজাদ পান্নু বলেন,‘অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

ঝিনাইদহের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার শেখ বিল্লাল হোসেন বলেন,‘কারো বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ পেলে সেটা নিয়ে তদন্ত করা হবে। সত্যতা পেলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

  • সর্বশেষ