মনিরুল ইসলাম : শারদীয় দুর্গাপূজার টানা পাঁচ দিনের ছুটিকে কেন্দ্র করে দেশের অন্যতম প্রধান পর্যটনকেন্দ্র কক্সবাজারে ছয় লাখের বেশি পর্যটকের সমাগমের প্রত্যাশা করছেন পর্যটন খাতের ব্যবসায়ীরা। আগামী ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ছুটিতে বিপুলসংখ্যক পর্যটককে বরণ করে নিতে প্রস্তুতি নিচ্ছে সমুদ্রসৈকতের এই শহর। ইতোমধ্যে হোটেল, মোটেল ও রিসোর্টের প্রায় ৭০ শতাংশ কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। পর্যটকদের বাড়তি চাপ সামাল দিতে আবাসন, পরিবহন, নিরাপত্তা ও সেবার মান নিশ্চিত করার প্রস্তুতিও চলছে।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, দীর্ঘ ছুটিতে বিপুলসংখ্যক মানুষের আগমন স্থানীয় পর্যটন অর্থনীতিতে নতুন গতি সঞ্চার করবে। হোটেল-রিসোর্টের পাশাপাশি রেস্তোরাঁ, পরিবহন, সৈকতকেন্দ্রিক ব্যবসা, শুঁটকি ও পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয় বিভিন্ন পণ্যের ব্যবসায়ও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
প্রতিদিন এক লাখের বেশি পর্যটক আসার প্রত্যাশা
কক্সবাজার হোটেল-মোটেল মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার জানিয়েছেন, দুর্গাপূজার ছুটিতে প্রতিদিন গড়ে এক লাখের বেশি পর্যটক কক্সবাজারে আসতে পারেন। সেই হিসাবে পাঁচ দিনে পর্যটকের সংখ্যা ছয় লাখ ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
তিনি জানান, কক্সবাজারে বিভিন্ন শ্রেণির পাঁচ শতাধিক হোটেল, মোটেল ও কটেজ রয়েছে। এসব আবাসিক প্রতিষ্ঠানের বেশির ভাগেই অগ্রিম বুকিংয়ের চাপ বাড়ছে। ইতোমধ্যে অনেক হোটেলের প্রায় ৭০ শতাংশ কক্ষ বুকিং হয়ে গেছে।
অন্যদিকে, কক্সবাজার হোটেল এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সভাপতি নাজিম উদ্দীন জানিয়েছেন, টানা পাঁচ দিনের ছুটিকে কেন্দ্র করে হোটেল-মোটেলগুলোতে ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। বিশেষ করে তারকা মানের হোটেলগুলোর অধিকাংশ কক্ষ ইতোমধ্যে বুকিং হয়ে গেছে। এ পরিস্থিতিতে পর্যটন ব্যবসায়ীরা ব্যস্ত ও লাভজনক একটি সপ্তাহের প্রত্যাশা করছেন।
তারকা হোটেল ও রিসোর্টে বাড়ছে বুকিং
দুর্গাপূজার ছুটিতে পর্যটকদের আগমন বাড়তে থাকায় তারকা হোটেল ও রিসোর্টগুলোতেও বুকিংয়ের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
রামুর মেরিন ড্রাইভ-সংলগ্ন পেঁচারদ্বীপের মারমেইড বিচ রিসোর্টের ব্যবস্থাপক রানা কর্মকার জানিয়েছেন, তাঁদের রিসোর্টের প্রায় ৮০ শতাংশ কক্ষ ইতোমধ্যে অগ্রিম বুকিং হয়ে গেছে। শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষে অতিথিদের স্বাগত জানানোর প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি রিসোর্টের রেস্তোরাঁ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। ফলে সেখানে রাত্রিযাপন না করেও দর্শনার্থীরা ঘুরতে যেতে এবং খাবার খেতে পারবেন।
অন্যদিকে, তারকা মানের বেস্ট ওয়েস্টার্ন হেরিটেজ হোটেলের ফ্রন্ট অফিস ম্যানেজার তারেক আজিজ জানিয়েছেন, তাঁদের হোটেলের প্রায় ৮০ থেকে ৯০ শতাংশ কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়েছে।
পর্যটকদের আকৃষ্ট করতে হোটেলটিতে আগামী ২০, ২১ ও ২২ অক্টোবর বিশেষ বুফে ডিনারের আয়োজন করা হয়েছে। জনপ্রতি ১ হাজার ২০০ টাকায় ৫০টির বেশি পদের খাবার পরিবেশনের পরিকল্পনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা।
যাত্রীদের চাপ সামলাতে বিশেষ ট্রেন
দুর্গাপূজার ছুটিতে কক্সবাজারমুখী যাত্রীদের বাড়তি চাপ সামাল দিতে বিশেষ ট্রেন পরিচালনার উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। আগামী ২০, ২৩ ও ২৪ অক্টোবর কক্সবাজার রুটে বিশেষ ট্রেন চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
রেলওয়ের নির্ধারিত সূচি অনুযায়ী, ২০ অক্টোবর চট্টগ্রাম থেকে ঢাকাগামী ‘ঢাকা স্পেশাল’ দুপুর ২টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে সন্ধ্যা ৭টা ৩০ মিনিটে ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
একই দিন ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী ‘ট্যুরিস্ট স্পেশাল’ রাত ১০টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে পরদিন সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে কক্সবাজারে পৌঁছাবে।
২৩ অক্টোবর কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী বিশেষ ট্রেন সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে রাত ৮টায় ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। একই দিন ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী ‘ট্যুরিস্ট স্পেশাল’ রাত ১০টা ৩০ মিনিটে যাত্রা করে পরদিন সকাল ৬টা ৫০ মিনিটে গন্তব্যে পৌঁছাবে।
এ ছাড়া ২৪ অক্টোবর কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী ‘ট্যুরিস্ট স্পেশাল’ সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে রাত ৮টায় ঢাকায় পৌঁছানোর কথা রয়েছে। ওই দিন ঢাকা থেকে চট্টগ্রামগামী ‘চট্টগ্রাম স্পেশাল’ রাত ১০টা ৩০ মিনিটে ছেড়ে পরদিন ভোর ৪টায় চট্টগ্রামে পৌঁছানোর পরিকল্পনা রয়েছে।
কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশনের স্টেশন ম্যানেজার জয়নাল আবেদীন বিশেষ ট্রেন পরিচালনার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, টানা ছুটিতে কক্সবাজারগামী যাত্রীদের চাপ অনেক বেড়ে যায়। এ চাপ সামাল দিতে অতিরিক্ত ট্রেনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
নিরাপত্তা ও পর্যটকসেবায় বিশেষ নজর
ছুটিতে বিপুলসংখ্যক পর্যটকের আগমনকে কেন্দ্র করে নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছে জেলা প্রশাসন।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানিয়েছেন, পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। দুর্গাপূজার ছুটিতে পর্যটকদের চাপ বাড়বে। তাঁদের নিরাপত্তা ও স্বাচ্ছন্দ্য নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করা হবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, পর্যটকের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সৈকত ও অন্যান্য দর্শনীয় স্থানে নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, যানবাহন চলাচল এবং জরুরি সেবার বিষয়গুলোও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। এসব ক্ষেত্রে সমন্বিত প্রস্তুতি থাকলে পর্যটকেরা স্বাচ্ছন্দ্যে ভ্রমণ করতে পারবেন।
অতিরিক্ত ভাড়া ও পর্যটক হয়রানি ঠেকানো জরুরি
কক্সবাজারে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে হোটেলকক্ষের ভাড়া, খাবারের দাম এবং স্থানীয় পরিবহন খরচ নিয়ে ভোগান্তির আশঙ্কাও তৈরি হয়। বিশেষ করে আগে থেকে আবাসন বুকিং না করা পর্যটকেরা ছুটির সময় কক্ষ পেতে সমস্যায় পড়তে পারেন।
এ কারণে হোটেল-রিসোর্টে কক্ষের প্রাপ্যতা ও ভাড়ার স্বচ্ছতা, রেস্তোরাঁয় খাবারের মূল্য এবং পর্যটকদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সেবাদাতাদের আচরণের বিষয়ে নজরদারি প্রয়োজন।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করেন, পর্যটকদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, খাবারের অস্বাভাবিক মূল্য নির্ধারণ কিংবা কোনো ধরনের হয়রানি ঠেকানো গেলে কক্সবাজারের পর্যটন ভাবমূর্তি আরও উজ্জ্বল হবে।