শিরোনাম
◈ বয়স্ক, বিধবা ও প্রতিবন্ধী ভাতার যেভাবে আবেদন করবেন ◈ পাকিস্তানের লাহোরে দুই বিদেশি নারীকে অপহরণ করে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের অভিযোগ, উপপ্রধানমন্ত্রীর আত্মীয়সহ গ্রেপ্তার ৪ ◈ জনআস্থা ফেরাতে সন্ত্রাসবিরোধী দুই ইউনিটের নাম পরিবর্তনের প্রস্তাব, বাড়ছে কাজের পরিধি ◈ ঢাবি নিয়ে মানহানিকর বক্তব্য: ব্যারিস্টার ফুয়াদকে ৭২ ঘণ্টার মধ্যে প্রকাশ্যে ক্ষমা চাইতে লিগ্যাল নোটিশ ◈ এবার যে কারণে এয়ারপোর্ট থেকে ফিরলেন সিলেটের নতুন ডিসি, যোগদান অনিশ্চিত ◈ আমেরিকা ও ইসরায়েলের অপরাধের বিচার করা হবে, বল‌লেন ইরানের প্রেসিডেন্ট ◈ আ‌র্জেন্টিনা কখনো হাল ছাড়ে না: ‌কোচ স্কালোনি ◈ নারী ক্রিকেটের পাইপলাইন আরো শক্তিশালী কর‌তে বি‌সি‌বি ‌বিভাগীয় মেন্টর নি‌য়োগ দি‌চ্ছে  ◈ বিশ্বজুড়ে বাড়ছে ডেঙ্গু, সতর্ক করল বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ◈ অর্থনৈতিক সংকট কাটিয়ে উচ্চ মধ্যম আয়ের দেশে হিসেবে মর্যাদা পেল শ্রীলঙ্কা

প্রকাশিত : ০৪ জুলাই, ২০২৬, ১১:০১ দুপুর
আপডেট : ০৪ জুলাই, ২০২৬, ১২:৫৬ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

সাড়ে ৫ বছরে ৪৭ মণের উপ‌রে সোনা জব্দ

ডেস্ক রি‌পোর্ট: দুবাই থেকে চট্টগ্রাম হয়ে গত বৃহস্পতিবার রাজধানীর হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ল্যান্ড করে বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-১৪৮ ফ্লাইট। ওই ফ্লাইট থেকে প্রায় ১৮ কেজি ৭২০ গ্রাম স্বর্ণের (১৬০টি বার) চোরাচালান জব্দ করে গোয়েন্দা সংস্থা, শুল্ক গোয়েন্দা, এভসেক ও কাস্টমস মিলে একটি যৌথ দল।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, গোপন তথ্যের ভিত্তিতে এভসেকের সহায়তায় বিমানের কার্গো হোল্ডে তল্লাশি চালিয়ে বিশেষভাবে লুকিয়ে রাখা এসব স্বর্ণ জব্দ করা হয়। তবে এ ঘটনায় এখনো কেউ গ্রেপ্তার হয়নি। জব্দ করা স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য ৪৫ কোটি টাকা। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন। ----- কা‌লেরকণ্ঠ

অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, ১৮ কেজি স্বর্ণ জব্দ শুধু একটি ঘটনা নয়, মূলত এভাবে আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালান চক্রের অন্যতম প্রধান রুট হয়ে উঠেছে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। এর আগে গত ১১  জুন চোরাচালানের প্রায় ৬০০ গ্রাম স্বর্ণালংকারসহ ছয়জনকে আটক করে এয়ারপোর্ট আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন (এপিবিএন)। এপিবিএন জানায়,  আটক ব্যক্তিরা ‘চোরাচালান চক্রের সদস্য’, তাঁরা ওই চক্রের ‘রিসিভার’ হিসেবে কাজ করতেন। এর আগে গত ২৮ মার্চ চোরাচালানের প্রায় ১৮ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়।

এভাবে গত সাড়ে পাঁচ বছরে প্রায় এক হাজার ৯০২ কেজি (৪৭.৫৫ মণ) চোরাচালানের  স্বর্ণ জব্দ করা হয় শাহজালাল বিমানবন্দর থেকে। জব্দ করা এসব স্বর্ণের দাম বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের গতকাল শুক্রবার নির্ধারিত ২২ ক্যারেটের মূল্য ধরে (প্রতি ভরি দুই লাখ ২৮ হাজার ৫৫৬ টাকা) প্রায় তিন হাজার ৭২৮ কোটি টাকা। এ  থেকে বোঝা যায়, গত কয়েক বছরে এই বিমানবন্দর আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাকারবারিদের অন্যতম করিডর হয়ে ওঠে। বিশেষ করে দুবাইকেন্দ্রিক স্বর্ণ চোরাচালান চক্রগুলো অভিনব সব উপায়ে সক্রিয় হয়ে ওঠার চেষ্টা অব্যাহত রেখেছে।

এছাড়া চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং সিলেটের ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও স্বর্ণ চোরাচালানের প্রবেশপথ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিজিবি), শুল্ক গোয়েন্দা, এপিবিএন এবং অন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর নিয়মিত অভিযানে প্রতি মাসেই দেশজুড়ে ছোট-বড় অসংখ্য সোনার চোরাচালান জব্দ হচ্ছে।

ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য মতে, ২০২১ থেকে ২০২৬ সালের এ পর্যন্ত সাড়ে পাঁচ বছরে শতাধিক অভিযানে বিমানবন্দর থেকে এক হাজার ৯০২ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ উদ্ধারের পরও এই রুটে কারবারিরা ঝুঁকি নিয়ে চোরাচালান অব্যাহত রেখেছে। সর্বশেষ ৪৫ কোটি টাকার সোনার চালান জব্দ সেই কথা মনে করিয়ে দেয়। দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বলছেন, আগের তুলনায় নজরদারি অনেক বেড়েছে। সে কারণে চোরাচালানের ঘটনা কমে আসছে।

স্বর্ণ জব্দ ও মামলার পরিসংখ্যান

ঢাকা কাস্টম হাউসের তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ৬৯৮ কেজি স্বর্ণ উদ্ধার করা হয়। ২০২২-২৩ অর্থবছরে ৫৫৫ কেজি, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে জব্দ স্বর্ণের পরিমাণ ৪১৭ কেজি এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ১৬৯ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে। আর চলতি বছরের এ পর্যন্ত প্রায় সাড়ে ৬৩ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়েছে।

বিমানবন্দর থানার তথ্য অনুযায়ী, ২০২১ সাল থেকে চলতি বছরের এ পর্যন্ত স্বর্ণ চোরাচালানের অভিযোগে   ৫৪০টি মামলা করা হয়েছে। তবে অনেক ঘটনায় কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় বেশির ভাগ  মামলার আসামি অজ্ঞাতপরিচয়।

শাহজালাল কেন বিশেষ টার্গেট : স্বর্ণ পাচারের রুট হিসেবে দেশীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রগুলো শাহজালাল বিমানবন্দরকে ব্যবহার করছে। বেশির ভাগ চালান আসে সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাই, পাশাপাশি সৌদি আরব, কাতার, ওমান ও কুয়েত থেকে আসা ফ্লাইটে। চোরাকারবারিরা কখনো যাত্রীর শরীরে, কখনো বিমানের সিট, টয়লেট, বর্জ্য ট্রলি বা কার্গো অংশে স্বর্ণ লুকিয়ে আনে। একের পর এক চালান ধরা পড়ার পরও চক্রটি কেন বারবার এই রুট ব্যবহার করছে, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দৃশ্যত অনেক চালান ধরা পড়লেও হয়তো এর চেয়ে বড় বড় চালান প্রশাসনের চোখ ফাঁকি দিয়ে নিরাপদে বের করে নিয়ে যাচ্ছে। এ  কারণে বারবার তারা এই বিমানবন্দরকে বেছে নিচ্ছে।

বাহক ধরা না পড়ায় আসামি অজ্ঞাতপরিচয় : সর্বশেষ চালানে বাহক ধরা না পড়ায় মামলার এজাহারে কোনো আসামির নাম উল্লেখ নেই। এর আগে গত ২৮ মার্চ প্রায় ১৮ কেজি স্বর্ণ জব্দ করা হয়। দুবাই থেকে আসা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের বিজি-৩৪৮ ফ্লাইটের কার্গো কম্পার্টমেন্টের টয়লেটে বিশেষ কায়দায় লুকানো স্বর্ণের বারগুলো পাওয়া যায়। ২৪ ক্যারেটের এসব স্বর্ণের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় ৪৬ কোটি টাকা। এ ঘটনায় মামলা করা হলেও আসামি অজ্ঞাতপরিচয়।

মার্চের ঘটনার তিন মাস পর গত ২ জুলাই একই ধরনের আরেকটি চালান ধরা পড়ে।  তদন্তকারীরা বলছেন, পর পর দুটি ঘটনার মধ্যে অনেক মিল রয়েছে। একই এয়ারলাইনস এবং স্বর্ণের পরিমাণ প্রায় এক।

তদন্তকারীদের ভাষ্য, এতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সম্পৃক্ততা থাকতে পারে। তাঁদের সঙ্গে নেপথ্যে কারা রয়েছে, সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের মুখপাত্র বোসরা ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, ‘ব্যক্তির অপরাধের দায় প্রতিষ্ঠান নেবে না। তদন্ত করছে পুলিশ। যাদের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া যাবে, তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

পাচারে অভিনব যত কৌশল : বিভিন্ন সময়ে স্বর্ণ জব্দ করার চিত্র বলছে, পাচারকারীরা টয়লেট থেকে ট্রলি, ব্যাটারি থেকে বেল্ট—অভিনব যত কৌশল সবই ব্যবহার করছে। চোরাকারবারি চক্রগুলো কখনো কেবিন ক্রু, বিমানবালা, ফ্লাইটের পাইলট, ইঞ্জিনিয়ার, ট্রলিম্যান কিংবা ক্লিনারদের ব্যবহার করছে। আবার কখনো যাত্রীবেশী বাহক দিয়ে ভ্যাকুয়াম ক্লিনার, ইলেকট্রিক মোটর, ট্রলির হ্যান্ডল, হুইলচেয়ার, জুতা, বেল্টের কোমরবন্ধনী, শার্টের কলার, সাবানের কেস, সাউন্ড বক্সের অ্যাডাপ্টার, ওষুধের কৌটা, ল্যাপটপের ব্যাটারি এবং মলদ্বারে বা দেহের বিভিন্ন অংশে লুকিয়ে স্বর্ণ নিয়ে আসে। এমনকি স্বর্ণের বারের ওপর কালো অথবা সিলভার রঙের প্রলেপ দিয়ে কিংবা গলায় সাধারণ চেইনের সঙ্গে লকেট হিসেবে ঝুলিয়েও বার পাচারের চেষ্টা করা হয়।

যে কারণে আকর্ষণীয় দুবাই রুট : আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্য, বিশেষ করে দুবাই থেকে পরিচালিত চক্রগুলো বাংলাদেশকে ট্রানজিট ও বাজার দুই হিসেবেই ব্যবহার করছে।

সস্তায় স্বর্ণ সংগ্রহ, উচ্চ চাহিদা, কর ফাঁকি এবং আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্ক—সব মিলিয়ে এই রুট তাদের কাছে অত্যন্ত লাভজনক।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, প্রায় প্রতিটি বড় চালানের সঙ্গেই দুবাই সংযোগ পাওয়া যাচ্ছে। পাশাপাশি বাংলাদেশে প্রতি ১০ গ্রাম সোনার শুল্কের তুলনায় ভারতে শুল্কের হার অনেক বেশি। এর ফলে চোরাকারবারিরা বাংলাদেশকে ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার করে প্রতিবেশী দেশে সোনা পাচার করে। অন্যদিকে শুল্ক গোয়েন্দাদের তথ্য মতে, মধ্যপ্রাচ্য ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশকেন্দ্রিক প্রায় ৭০টি সক্রিয় সিন্ডিকেট এই অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত।

বিদেশে বাংলাদেশি সিন্ডিকেট : বিগত সরকারের সময়ে মধ্যপ্রাচ্য ও পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অবস্থান করে যেসব বাংলাদেশি স্বর্ণ চোরাচালান পরিচালনা করছিল এমন অন্তত এক ডজনের বেশি ব্যক্তির নাম গোয়েন্দা প্রতিবেদনে এসেছে। এ ছাড়া আকাশপথে চোরাচালানে মূল হোতার সহযোগী হিসেবে সিভিল এভিয়েশন ও শুল্ক বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকর্মী, পুলিশ ও আনসার সদস্যদের নামও এসেছে।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর চ্যালেঞ্জ : কাস্টমস, গোয়েন্দা সংস্থা, এভিয়েশন সিকিউরিটি (এভসেক) ও অন্যান্য সংস্থার অভিযান বাড়লেও বড় চ্যালেঞ্জ রয়ে গেছে মূল হোতাদের শনাক্ত করা নিয়ে। কারণ অনেক ক্ষেত্রে স্বর্ণ জব্দ করা হলেও ক্যারিয়ার বা প্রকৃত সংগঠকদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয় না। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বিমানবন্দরে স্ক্যানিং, গোয়েন্দা নজরদারি এবং আন্ত সংস্থার সমন্বয় আরো শক্তিশালী করা গেলে স্বর্ণ চোরাচালান উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।

নতুন চালান জব্দের পর নড়েচড়ে বসছে প্রশাসন : বিমানবন্দরে কর্মরত একাধিক গোয়েন্দা কর্মকর্তা জানান, শাহজালাল বিমানবন্দরের আগমনী ও বহির্গমন নিরাপত্তা ব্যবস্থা বিশ্বমানের। তবে যখন একসঙ্গে একাধিক ফ্লাইট অবতরণ করে, তখন যাত্রীদের ওপর বিশেষ নজরদারি করা হয়। তথ্যদাতার মাধ্যমে সুনির্দিষ্ট তথ্য থাকলে পৃথকভাবে তল্লাশি চালানো হয়। এর পরও চোরাকারবারিদের তৎপরতা উদ্বেগজনক। বিশেষ করে গত বৃস্পতিবারের চোরাচালানের স্বর্ণ জব্দের পর ফের নজরদারি আরো বাড়ানো হয়েছে।

বিমানবন্দরের নির্বাহী পরিচালক এস এম রাগিব সামাদ গণমাধ্যমকে বলেন, ‘আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বর্তমানে নজরদারি বেশি। বিমানবন্দরকে চোরাকারবারিমুক্ত রাখতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমাদের চেষ্টার কারণেই স্বর্ণের চালান ধরা পড়ছে।’

ঢাকা কাস্টম হাউসের অতিরিক্ত কমিশনার মুহাম্মদ কামরুল হাসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের এখানে স্বর্ণের চোরাচালান জব্দ করা হচ্ছে। পরে ফৌজদারি আইনে মামলা করা হচ্ছে। তবে স্বর্ণের চোরাচালান আসার মূল পয়েন্ট দুবাইসহ অন্যান্য স্থানে যথাযথ কর্তৃপক্ষের শক্তিশালী সমন্বয় জরুরি।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়