আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিন একইসঙ্গে অনুষ্ঠিত হবে গণভোট। অর্থাৎ ওই দিন ভোটারদের দুটি করে ভোট দিতে হবে। একটি ভোট দেবেন নিজ এলাকার সংসদ সদস্য নির্বাচনের জন্য, আরেকটি ভোট দেবেন জুলাই সনদ বাস্তবায়নের পক্ষে বা বিপক্ষে। জুলাই সনদ বিষয়ক এই ভোটকেই বলা হচ্ছে গণভোট। এই ভোট দিতে হবে ‘হ্যাঁ’ অথবা ‘না’ বাক্সে।
তবে অনেক ভোটারের কাছেই এখন পর্যন্ত গণভোটের বিষয়বস্তু স্পষ্ট নয়। বিশেষ করে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে কী ঘটবে আর ‘না’ জয়ী হলে কী ঘটবে—তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এবারের গণভোট মূলত সাংবিধানিক সংস্কার সংক্রান্ত। জুলাই সনদে মোট ৮৪টি সংস্কার প্রস্তাব রয়েছে, তবে গণভোট প্রাধান্য পাচ্ছে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত ৩০টি প্রস্তাব। যদিও এই ৩০টি প্রস্তাবের বিস্তারিত ব্যালটে থাকবে না। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গণভোটের ব্যালটে চারটি প্রশ্নের একটি সেট থাকবে এবং এই সেটের পক্ষে বা বিপক্ষে একটি মাত্র ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ দিতে হবে।
অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী আলী রীয়াজ জানান, জুলাই সনদের ৮৪টি প্রস্তাবের মধ্যে সংবিধান সংস্কার সম্পর্কিত ৩০টি প্রস্তাব নিয়ে গণভোট হবে। এসব প্রস্তাবকে চারটি প্রশ্নে সংক্ষিপ্ত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। শেষ প্রশ্নটিতে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সংস্কার বাস্তবায়নের বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
গণভোটের ব্যালটে যে চারটি প্রশ্ন থাকবে—১. নির্বাচনকালীন সময়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকার, নির্বাচন কমিশন ও অন্যান্য সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান জুলাই সনদে বর্ণিত প্রক্রিয়ার আলোকে গঠন করা হবে। ২. আগামী সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে ১০০ সদস্যবিশিষ্ট একটি উচ্চকক্ষ গঠিত হবে এবং সংবিধান সংশোধনে উচ্চকক্ষের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। ৩. সংসদে নারীর প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি, বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচন, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বৃদ্ধি, মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও স্থানীয় সরকারসহ ৩০টি প্রস্তাবে জুলাই জাতীয় সনদে রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য বাস্তবায়নে আগামী নির্বাচনে বিজয়ী দলগুলো বাধ্য থাকবে। ৪. জুলাই সনদে বর্ণিত অন্যান্য সংস্কার রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতি অনুসারে বাস্তবায়ন করা হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণভোটের ফলাফল যাই হোক না কেন, এর প্রকৃত মূল্য নির্ভর করবে রাজনৈতিক সদিচ্ছার ওপর।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংবিধান সংস্কারসহ রাষ্ট্র পরিচালনায় ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। সংসদের মেয়াদ ৫ বছরই থাকবে, তবে একজন ব্যক্তি কোনোভাবেই টানা দুই মেয়াদ, অর্থাৎ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। সাংবিধানিকভাবে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ফিরবে। সংসদ হবে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট। উচ্চকক্ষ গঠিত হবে সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী দলগুলোর পাওয়া আসনের আনুপাতিক হারে ১০০ সদস্য নিয়ে। সংরক্ষিত নারী আসন ৫০ থেকে বাড়িয়ে ১০০ করা হবে। বাধ্যতামূলকভাবে ডেপুটি স্পিকার বিরোধী দল থেকে নির্বাচিত হবেন। সংসদ সদস্যরা বাজেট ও আস্থা বিল ছাড়া অন্যান্য বিষয়ে স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারবেন। রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা সংক্রান্ত আন্তর্জাতিক চুক্তিতে সংসদের উভয় কক্ষের অনুমোদন লাগবে।
এসব বিষয় মানুষ কমবেশি সবাই জানলেও গণভোটে “না” জয়ী হলে কী ঘটবে তা নিয়ে অনেকেরই অস্পষ্টতা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গণভোটে “না” জয়ী হলে জুলাই সনদ বাস্তবায়িত হবে না। সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে না এবং সংবিধান সংস্কারও হবে না। জাতীয় সংসদ বিদ্যমান কাঠামোতেই চলবে। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা থাকবে না। সংসদ সদস্যরা দলের সিদ্ধান্তের বাইরে জাতীয় সংসদে কোনও বিষয়ে ভেটো দিতে পারবেন না। সংরক্ষিত নারী আসনের সংখ্যা বাড়বে না। রাষ্ট্রপতি প্রাণভিক্ষার নামে মৃত্যুদণ্ড মওকুফসহ বর্তমান ক্ষমতাগুলো আগের মতোই প্রয়োগ করতে পারবেন। অন্তর্বর্তী সরকার ঘোষিত সংস্কার বাস্তবায়নের কোনও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকবে না।
উল্লেখ্য, রাষ্ট্রপতি বর্তমানে জাতীয় সংসদের সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে নির্বাচিত হন। জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে উচ্চকক্ষ ও নিম্নকক্ষের সদস্যদের গোপন ব্যালটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হবেন। রাষ্ট্রপতি তার নিজ ক্ষমতায় জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল, আইন কমিশন ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের চেয়ারম্যান ও সদস্য নিয়োগ দিতে পারবেন। রাষ্ট্রপতিকে অভিশংসনের ক্ষেত্রে উভয় কক্ষের দুই-তৃতীয়াংশ ভোট প্রয়োজন হবে।
গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে সংবিধানের ৯৫ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা হবে। প্রধান বিচারপতি নিয়োগ দিতে হবে আপিল বিভাগ থেকে। বিচারকের সংখ্যা নির্ধারণ হবে প্রধান বিচারপতির চাহিদার ভিত্তিতে। হাইকোর্টের বিচারক নিয়োগের দায়িত্ব থাকবে প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বাধীন কমিশনের হাতে।
এছাড়া বিচার বিভাগকে পূর্ণ স্বাধীনতার সাংবিধানিক নিশ্চয়তা, প্রত্যেক বিভাগে হাইকোর্ট বেঞ্চ স্থাপন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল শক্তিশালী করা এবং নিম্ন আদালতের বিচারকদের চাকরির নিয়ন্ত্রণ সুপ্রিম কোর্টে ন্যস্ত করার বিষয়গুলো জুলাই সনদে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টা জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে বলেন, গণভোটে “হ্যাঁ” জিতলে আগামী সংসদ নির্বাচনে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে। পরিষদ ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংবিধান সংস্কার করবে। এরপর ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সংস্কার প্রস্তাব বাস্তবায়িত হলে প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমবে, সংসদ সদস্যদের ক্ষমতা বাড়বে এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত হবে। উৎস: বাংলাট্রিবিউন।