পুষ্টিগুণে ভরপুর ফল পেঁপে। বছরজুড়েই বাজারে মিলে বারোমাসি এই ফল। পেটের সমস্যা দূর করা থেকে শুরু করে ত্বক ভালো রাখা—সব ক্ষেত্রেই পেঁপের জুড়ি নেই। রোগীর পথ্য হিসেবেও এটি বেশ জনপ্রিয়। অন্য ফলের তুলনায় দামও অপেক্ষাকৃত কম। তবে বাজার থেকে কিনে আনা পেঁপেটি যদি পানসে হয়, তবে হতাশ হতে হয়।
এ নিয়েই মিজান মিয়ার সঙ্গে কথা হচ্ছিল। ব্রাহ্মণবাড়িয়া থেকে আসা মিজান ৩০ বছর ধরে আগারগাঁও তালতলা এলাকায় ফল বিক্রি করছেন। নিজের দোকানের পেঁপে হাতে নিয়ে দেখাতে দেখাতে ভালো মানের মিষ্টি পাকা পেঁপে কেনার সময় যেসব বিষয় খেয়াল রাখা দরকার, সে বিষয়ে পরামর্শ দেন।
১. গায়ের রং পরীক্ষা
পুরোপুরি সবুজ রঙের পেঁপে কখনোই পাকা হবে না। কেনার সময় খেয়াল করুন পেঁপের গায়ে হলুদ কিংবা লালচে ভাব আছে কি না। বিক্রেতারা বলেন, ‘শির পাকা পেঁপে’। পেঁপের গায়ে হালকা খাঁজকাটা দাগ থাকে। পরপর দুটি খাঁজকাটা দাগের মাঝের উঁচু অংশটাই শির। এই অংশ থেকে পাকা ভাবটা শুরু হয়।
যে পেঁপের গায়ে এমন গাঢ় হলুদ বা খানিকটা হলদে–কমলা রং ছড়িয়ে রয়েছে, সেটি বেছে নিন। যদি পেঁপের গায়ে হালকা সবুজাভ ভাব থাকে, বুঝতে হবে এটি দু–এক দিনের মধ্যে পেকে যাবে। এমন পেঁপেও নিতে পারেন। তবে পেঁপের গায়ে সমানভাবে রং ছড়িয়ে থাকলে সেসব পেঁপে নেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
২. স্পর্শ করে পরীক্ষা
পেঁপে কেনার সময় বুড়ো আঙুল দিয়ে আলতো চাপ দিয়ে দেখতে পারেন। যদি পেঁপেটি অতিরিক্ত শক্ত লাগে, তবে এটি কাঁচা বা গাছে পুরোপুরি না পাকতেই তোলা হয়েছে। আবার যদি অতিরিক্ত নরম বা আঙুল ভেতরে দেবে যায়, তবে সেটি বেশি পেকে পচে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। কেনার সময় হালকা নরম পাকা পেঁপে কিনুন, যা আঙুলের চাপে সামান্য বসে আবার আগের জায়গায় ফিরে আসবে।
৩. বোঁটার অংশটি ভালোভাবে খেয়াল করুন
পেঁপের বোঁটা বা বোঁটার চারপাশের অংশটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বোঁটার চারপাশ যদি কিছুটা খাঁজকাটা ও লালচে–হলুদ রঙের হয়, তবে সেই পেঁপে মিষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বোঁটার কাঁচা অংশ বা খুব বেশি সাদা কষ জমে থাকলে তা না কেনাই ভালো। গাছপাকা পেঁপের গায়ে খুব বেশি সাদা কষ দেখা যায় না। যদি পেঁপের শরীরজুড়ে অতিরিক্ত সাদা আঠা জমে থাকতে দেখেন, তবে বুঝে নেবেন এটি নির্ধারিত সময়ের আগেই গাছ থেকে পেড়ে কৃত্রিমভাবে পাকানো হয়েছে।
৪. মিষ্টি সুবাস পরীক্ষা
পাকা পেঁপের একটি মিষ্টি ও হালকা সুবাস থাকে। পেঁপের বোঁটার কাছাকাছি ঘ্রাণ নিয়ে দেখুন। যদি হালকা মিষ্টি ঘ্রাণ পান, তবে নিশ্চিত হতে পারেন পেঁপেটি সুস্বাদু ও পাকা। কিন্তু যদি কোনো ঘ্রাণ না থাকে বা অতিরিক্ত ঝাঁজালো বা পচা গন্ধ নাকে আসে, তখন তা এড়িয়ে চলাই ভালো।
৫. ফলের গায়ে দাগ
পেঁপের গায়ে খুব বেশি কালচে দাগ বা ছোট ছোট ছিদ্র থাকলে তা না কেনাই ভালো। কারণ, এটি হতে পারে ভেতরে পোকা থাকা বা পচে যাওয়ার লক্ষণ। তবে খুব সামান্য দাগ থাকলে সমস্যা নেই।
৬. আকার–আকৃতি খেয়াল রাখুন
জাতভেদে পেঁপের আকার ও আকৃতি ভিন্ন হতে পারে—এটা স্বাভাবিক। তবে একই জাতের পেঁপের মধ্যে আকারে চিকন টাইপের পেঁপে বেছে নিন। আকারে মোটা পেঁপের ভেতরটা অনেক ক্ষেত্রে ফাঁপা থাকে, বীজের পরিমাণ বেশি থাকায় ওজনও হয় বেশি। তাই তুলনামূলক চিকন ও মাঝারি আকারের পেঁপে বেছে নেওয়া ভালো।
৭. জাত ও অঞ্চল
জাতভেদেও পেঁপের স্বাদে ভিন্নতা আসে। কোন অঞ্চল থেকে আসছে, তার ওপরও মিষ্টতায় কমবেশি হয়। মিষ্টতায় শুরুতেই আসবে থাই রেড লেডি পেঁপে। ভেতরটা যেন আগুন রঙে রাঙা। এর পরে শাহি পেঁপেসহ দেশি জাতের মিষ্টি পেঁপে। দেশের সবচেয়ে ভালো মিষ্টি পেঁপে আসে টাঙ্গাইলের মধুপুর, গাজীপুর আর নওগাঁ জেলা থেকে।
নিজেই পেঁপে চাষ করুন
আর সবশেষে পরামর্শ হতে পারে, রোদ পায়—এমন বাসার বারান্দা বা ছাদে নিজেই চাষ করে সব রকম ভেজালের দুশ্চিন্তা এড়িয়ে তরতাজা পেঁপে খাওয়া। এ ব্যাপারে কথা হয় ১০ বছর ধরে শাহি জাতের পেঁপে চাষ করা দিনাজপুরের জুলহাশ আহমেদ রুবেল ভাইয়ের সঙ্গে। ‘রুবেল মিয়ার পেঁপে চাষ’ নামের একটি বইও লিখেছেন তিনি।
তাঁর পরামর্শ, বারান্দা বা ছাদে বড় টব, জিও ব্যাগ, হাফ ড্রাম বা বেডে সহজেই পেঁপে চাষ করা যায়। ভার্মিকম্পোস্ট সার যোগে বেলে দোআঁশ মাটি দিয়ে টব ভর্তি করে চারা রোপণ করতে পারেন। নিয়মিত পানি ও জৈব সার প্রয়োগ করলে ৯০ থেকে ১২০ দিনের মধ্যেই নিজের লাগানো গাছেই পেঁপের দেখা পেয়ে যাবেন।