কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির পেছনে বিপুল অর্থ ঢালতে গিয়ে শেয়ারবাজারে বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো। বছরের শেষ প্রান্তিকের ব্যবসার হিসাব প্রকাশের পর তৈরি হওয়া আশঙ্কার জেরে গতকাল বৃহস্পতিবারই পুঁজিবাজারে গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের বাজারমূল্য কমেছে ৫০ হাজার কোটি (৫০০ বিলিয়ন) মার্কিন ডলারেরও বেশি।
এআই প্রযুক্তির অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে গুগলের মূল আয়—সার্চ ইঞ্জিনের বিজ্ঞাপন বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় শেয়ারবাজারে ধস নামে। এতে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ারের দাম গত ছয় মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে।
একই সপ্তাহে অ্যালফাবেটের পাশাপাশি ই-কমার্স জায়ান্ট আমাজন এবং সফটওয়্যার প্রতিষ্ঠান মাইক্রোসফটও তাদের বিনিয়োগকারীদের আর্থিক প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। সেখানে দেখা গেছে, এআই প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে প্রতিষ্ঠানগুলো বিপুল অর্থ ব্যয় করে চলেছে। তবে এই বিপুল খরচের কারণে তাদের মূল ব্যবসার প্রবৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে দেখে গভীরভাবে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন সাধারণ ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা।
প্রথম দেখায় গুগলের মূল প্রতিষ্ঠান অ্যালফাবেটের ত্রৈমাসিক ফলাফল বেশ ইতিবাচক মনে হয়েছিল। গত বছরের তুলনায় মোট রাজস্ব ২৫ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২ হাজার ৭৬০ কোটি ডলারে। বিশেষ করে ‘গুগল ক্লাউড’-এর রাজস্ব ১০৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় ৩ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছানোয় এটি সম্ভব হয়েছে।
তবে একই সময়ে কোম্পানির মুনাফা একলাফে কমেছে ২৫ শতাংশ। পাবলিক কোম্পানি হিসেবে ইতিহাসে দ্বিতীয়বারের মতো প্রতিষ্ঠানটি ‘নেগেটিভ ফ্রি ক্যাশ ফ্লো’ বা নগদ অর্থের ঘাটতি দেখিয়েছে, যার পরিমাণ ৯০০ কোটি ডলারের বেশি। মাত্র তিন মাস আগের হিসাবের তুলনায় এই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ।
চলতি মূলধন মূলত পরিচালন ব্যয় এবং নতুন বিনিয়োগের পর কোম্পানির হাতে থাকা অবশিষ্ট অর্থকে বোঝায়। অর্থাৎ, গুগল বর্তমানে আয়ের চেয়ে ব্যয়ের মাত্রা বাড়িয়ে দিয়েছে। আর এই বাড়তি খরচের প্রায় পুরোটাই যাচ্ছে এআই খাতে।
গতকাল বৃহস্পতিবার দিন শেষে পুঁজিবাজারে অ্যালফাবেটের মোট বাজারমূল্য ৩ দশমিক ৯৭ ট্রিলিয়ন ডলার থেকে নেমে ৩ দশমিক ৪৬ ট্রিলিয়ন ডলারে দাঁড়ায়।
বর্তমানে গুগলের সার্চ ইঞ্জিনে যেকোনো অনুসন্ধানের ফলাফলে শুরুতেই ‘এআই সামারি’ বা এআই সারসংক্ষেপ দেখানো হচ্ছে। ফলে মূল ওয়েবসাইটের বিজ্ঞাপনে ব্যবহারকারীদের ক্লিক কমে গেছে, যা বিজ্ঞাপনের বিক্রি সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। উল্লেখ্য, গুগল সার্চ থেকে আসা বিজ্ঞাপনই অ্যালফাবেটের আয়ের প্রধান উৎস।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান ফরেন্সটারের প্রধান বিশ্লেষক ট্রেসি উ এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘অ্যালফাবেটের হতাশাজনক সার্চ ব্যবসার ফলাফল স্পষ্ট করে দেয় যে মূল ব্যবসাগুলোর শক্তি বজায় রেখে একই সঙ্গে এআই প্রযুক্তিতে বিশাল অঙ্কের তহবিল জোগানো কতটা চ্যালেঞ্জিং।’
যদিও গুগলের চিফ বিজনেস অফিসার ফিলিপ শিন্ডলার এআই চালিত নতুন সার্চ ইঞ্জিন নিয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন, তবুও গতকাল শেয়ারবাজারে কোম্পানির শেয়ারমূল্য প্রায় ১৩ শতাংশ পড়ে যায়।
ট্রিলিয়ন ডলারের আশায় আমাজন, সাড়া নেই বিনিয়োগকারীদের
প্রতিবেদন প্রকাশের পর ক্ষতির মুখে পড়েছে আমাজনও। লেনদেন শেষের পর বাজারে তাদের শেয়ারের দাম কমেছে ৬ শতাংশ।
ত্রৈমাসিক বিক্রি ১১ শতাংশ বেড়ে ২০ হাজার ১০০ কোটি ডলারে পৌঁছালেও, আমাজনের নগদ অর্থের ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ৪ হাজার ২০০ কোটি ডলারে। এই সংখ্যাটি ইঙ্গিত দেয়, আমাজন আয়ের চেয়ে বহুগুণ বেশি খরচ করছে এবং গত তিন মাসে এই ব্যয়ের গতি ছয় গুণ বেড়েছে।
তবে আমাজনের প্রধান নির্বাহী অ্যান্ডি জ্যাসি এই ব্যয়কে সমর্থন করে জানিয়েছেন, তাঁদের সামনে এমন দুটি ব্যবসার সুযোগ রয়েছে, যা ভবিষ্যতে আমাজনকে ১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলার এনে দিতে পারে।
যদিও সেই দুটি ব্যবসা ঠিক কী, তা নির্দিষ্ট করে বলেননি জ্যাসি। তবে বিশ্লেষকদের সঙ্গে আলাপে তিনি আমাজনের নিজস্ব কম্পিউটার চিপ তৈরি ও বিক্রি এবং তাঁদের এআই ডেভেলপার প্ল্যাটফর্ম ‘বেডরক’ (Bedrock)-এর বিশাল আর্থিক সম্ভাবনার কথা বারবার উল্লেখ করেন।
আমাজনের অতিরিক্ত খরচ নিয়ে প্রশ্ন উঠলে জ্যাসি স্বীকার করেন, এই বিপুল ব্যয় আগামী ২৫ বছর ধরে ভাগ করে করতে পারলে সুবিধা হতো, কিন্তু বর্তমান প্রতিযোগিতামূলক বাজার সেই সুযোগ দিচ্ছে না। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে আমাজনের রাজস্ব ও নগদ অর্থের প্রবাহ চিরতরে বদলে যাবে।
এআইয়ের প্রকৃত মূল্য নিয়ে প্রশ্ন মাইক্রোসফটে
ওয়াল স্ট্রিট বা পুঁজিবাজার মাইক্রোসফটের আর্থিক তথ্যে কিছুটা কম প্রতিক্রিয়া দেখিয়েছে; বৃহস্পতিবার তাদের শেয়ারের দাম ১ শতাংশেরও কম কমেছে।
ওপেনএআইয়ের অন্যতম প্রধান বিনিয়োগকারী এই প্রতিষ্ঠানটি এআই সম্পর্কিত বিনিয়োগে আগের চেয়ে প্রায় ৫০০ কোটি ডলার খরচ কমিয়েছে। পাশাপাশি খরচ কমাতে তারা হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাইয়ের পরিকল্পনাও ঘোষণা করেছে।
এর মধ্যে মাইক্রোসফটের মোট রাজস্ব আগের বছরের চেয়ে ১৯ শতাংশ বেড়ে ৯ হাজার ২৩০ কোটি ডলারে পৌঁছেছে এবং ক্লাউড ব্যবসা ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৩০০ কোটি ডলারে।
কোম্পানির প্রধান নির্বাহী সত্য নাদেলা জানান, মাইক্রোসফটের এআই চ্যাটবট ‘কোপাইলট’-এর দৈনন্দিন ব্যবহারকারী আগের বছরের চেয়ে ৫০০ শতাংশ বেড়েছে এবং জুলাইয়ের পর থেকে এর মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় কাজের সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে।
সাধারণত খরচ কমানো এবং বিক্রি বাড়ার সংবাদ বিনিয়োগকারীদের ইতিবাচক বার্তা দেয়। কিন্তু বিশ্লেষক ট্রেসি উ মনে করেন, প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর এআই নিয়ে দেওয়া বড় বড় প্রতিশ্রুতি বাস্তবে কতটা সফল হবে, তা নিয়ে বাজারে বড় ধরনের প্রশ্ন থেকে যাচ্ছে।
তিনি মন্তব্য করেন, ‘মাইক্রোসফটের ফলাফল প্রমাণ করে বাজারে এআইয়ের চাহিদা প্রবল, কিন্তু একই সঙ্গে এটি এই বড় প্রশ্নটিকেও সামনে নিয়ে আসে যে—প্রযুক্তি শিল্পে শেষ পর্যন্ত এআই থেকে প্রকৃতপক্ষে কে বা কারা মূল্য বা মুনাফা তুলে নিতে পারবে।’