শিরোনাম
◈ গ্যাবনকে হারিয়ে ফাইনালে বাংলাদেশ, প্রতিপক্ষ মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্র ◈ যৌন হয়রানি, ধর্মান্তরের চাপ, আতঙ্কে পশ্চিমবঙ্গের খ্রিস্টানরা ◈ আমেরিকা ও ইসরায়েলি-মদদপুষ্ট চার সন্ত্রাসী চক্রের ১৬ সদস্য ইরা‌নে গ্রেফতার, অস্ত্র ও যুদ্ধের গোলাবারুদ জব্দ ◈ জাপান সফর শেষে দেশে ফিরলেন তারেক রহমান, ৬ সমঝোতা দলিল ও ৪৬৫৬ কোটি ইয়েনের ঋণ সহায়তা ◈ ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনে ৩৪৩০ জন নিয়োগের অনুমোদন ◈ সরকার গঠনের লড়াইয়ে বিপাকে নেতানিয়াহু, জোট ছাড়ার ঘোষণা কট্টরপন্থি ইহুদি দলের ◈ এলডিসি উত্তরণে আরও ৩ বছর সময় পেল বাংলাদেশ, জাতিসংঘের অনুমোদন ◈ আয়ারল‌্যা‌ন্ডের ডাবলিন বিমানবন্দরে সাঙ্গাকারাকে হেনস্থা, পরিবারকে হুমকি ◈ মাও' মন্ত‌ব্যে ক্ষমা চেয়েও রেহাই নেই এমবাপের, চীনে হোর্ডিং থেকে সরছে ছবি ◈ মোটরসাইকেলের সামনের নম্বরপ্লেট সংযোজনের সময় বাড়াল বিআরটিএ, শেষ সময় ৩১ ডিসেম্বর

প্রকাশিত : ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১০:৫৬ দুপুর
আপডেট : ৩০ অক্টোবর, ২০২৬, ১১:৩৫ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বন্দর ঘিরে ক্ষমতার খেলা, ডিপি ওয়ার্ল্ডের মতো বিদেশি বিনিয়োগে সার্বভৌমত্বের ঝুঁকি

সম্ভাবনাময় অঞ্চলগুলোতে বিদেশি বিনিয়োগ ক্রমেই বাণিজ্যিক মুনাফার পরিবর্তে ভূরাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা পূরণের হাতিয়ার হয়ে উঠছে। বন্দরগুলো পরিণত হচ্ছে কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার উপকরণে। হর্ন অব আফ্রিকায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের সরবরাহ ব্যবস্থাপনা প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ড-এর কার্যক্রম দেখিয়েছে যে, বিরোধপূর্ণ অবকাঠামো চুক্তি কীভাবে আঞ্চলিক বাড়িয়ে তুলতে পারে, সার্বভৌমত্ব ক্ষুণ করতে এবং সরকারি জবাবদিহির দুর্বলতা প্রকাশ করতে পারে।

২০১৮ সালে জিবুতি যখন ডিপি ওয়ার্ল্ডের দোরালেহ কন্টেইনার টার্মিনালটি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয়, তখন বিতর্কটি তীব্র আকার ধারণ করে। জিবুতি সরকারের অভিযোগ ছিল, ডিপি ওয়ার্ল্ড ইচ্ছাকৃতভাবে টার্মিনালটির সক্ষমতা সীমিত করে রেখেছিল, যাতে জাহাজ চলাচল দুবাইয়ের জেবেল আলী বন্দরের দিকে সরিয়ে নেওয়া যায়। লন্ডনভিত্তিক আন্তর্জাতিক সালিশি আদালতে শত শত মিলিয়ন ডলার ক্ষতিপূরণ জিতলেও ডিপি ওয়ার্ল্ডের পক্ষে দেওয়া রায় উপেক্ষা করে জিবুতি টার্মিনাল পরিচালনাগত অংশীদারত্ব ‘চায়না মার্চেন্টস পোর্ট হোল্ডিংস’- এর কাছে হস্তান্তর করে।

জিবুতির সঙ্গে বিরোধের পর ডিপি ওয়ার্ল্ড সোমালিল্যান্ডে তাদের কার্যক্রম সম্প্রসারণ করে।সোমালিল্যান্ড নিজেকে একটি স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হিসেবে ঘোষণা করলেও সোমালিয়া এটিকে নিজেদের সার্বভৌম ভূখ-ের অংশ বলে মনে করে। সোমালিল্যান্ডের বারবেরা বন্দরে ডিপি ওয়ার্ল্ডের বিনিয়োগ এবং স্থলবেষ্টিত ইথিওপিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে ত্রিপক্ষীয় বন্দর ব্যবহারের চুক্তিটি মোগাদিশুকে উদ্বিগ্ন করে তোলে এবং জিবুতির লাভজনক বাণিজ্যিক অবস্থানকে হুমকির মুখে ফেলে। ইথিওপিয়া ও সোমালিল্যান্ডের মধ্যে স্বাক্ষরিত একটি বিতর্কিত সমঝোতা স্মারক পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে।

এই চুক্তিতে প্রস্তাব ছিল, লোহিত সাগরের উপকূলে সোমালিল্যান্ডের ২০ কিলোমিটার এলাকা ইথিওপিয়াকে নৌ-ঘাঁটি তৈরির জন্য ইজারা দেওয়া হবে এবং বিনিময়ে ইথিওপিয়া সোমালিল্যান্ডকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করবে। সোমালিয়া এই চুক্তিকে ‘আগ্রাসন’ হিসেবে অভিহিত করে। এর পর কূটনৈতিক তৎপরতা শুরু হয় এবং ইথিওপিয়ার জেনারেলরা সামরিক পদক্ষেপের সতর্কবার্তা দেন। পরে সমঝোতা স্মারকটির কার্যক্রম
থমকে যায়।

Advertisement

এই ঘটনাটি প্রমাণ করে যে, বন্দরকেন্দ্রিক বিনিয়োগ কীভাবে আঞ্চলিক ভূখ-গত বিরোধকে উসকে দিতে পারে এবং পুরো অঞ্চলকে সংঘাতের দিকে ঠেলে দিতে পারে। সংযুক্ত আরব আমিরাত তাদের আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের জন্য বন্দরগুলোতে বিনিয়োগ করেছে।

অন্যদিকে, তুরস্কও মানবিক সহায়তার পাশাপাশি বাণিজ্যিক ও নিরাপত্তা অংশীদারিত্বের মাধ্যমেনিজেদের অবস্থান তৈরি করেছে। বর্তমানে তুর্কি কোম্পানিগুলো মোগাদিশুর প্রধান বিমানবন্দর ও সমুদ্রবন্দর পরিচালনা করছে, সমুদ্র তীরে তেল অনুসন্ধানের অধিকার ভোগ করছে এবং আফ্রিকায় তুরস্কের বৃহত্তম সামরিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্রটিও পরিচালনা করছে। ২০২৪ সালে ইথিওপিয়া ও সোমালিল্যান্ডের মধ্যকার চুক্তিটি আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ালে, সোমালিয়া সামুদ্রিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা পেতে আঙ্কারার শরণাপন্ন হয়।

এই অত্যন্ত উত্তপ্ত পরিম-লে, বিনিয়োগের প্রাথমিক প্রতিদান শতাংশ বা লভ্যাংশে গণনা করা হয় না। বরং তা পরিমাপ করা হয় নিছক কৌশলগত প্রভাব, ভূ-রাজনৈতিক প্রতিপত্তি এবং সামুদ্রিক নিয়ন্ত্রণের নিরিখে। যেখানে একটি স্বাভাবিক বাজাওে অলাভজনক বিনিয়োগ পরিত্যক্ত হয়, সেখানে হর্ন অঞ্চলের ক্ষয়কারী পুঁজির সবচেয়ে নির্ধারক বৈশিষ্ট্য হলো, রাজনৈতিক উচ্চাকাক্সক্ষা আগ্রাসীভাবে কর্পোরেট মুনাফাকে ছাপিয়ে যায়। সংযুক্ত আরব আমিরাত ও তুরস্কের মতো দেশগুলোর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ চুক্তি পর্দার আড়ালে সম্পাদিত হলে সেগুলো সংসদীয় তদারকি, প্রতিযোগিতামূলক ক্রয় প্রক্রিয়া এবং পরিবেশগত নজরদারি এড়িয়ে যেতে পারে। এর প্রভাব তখন বন্দরের গ-ি ছাড়িয়ে বিস্তৃত হয়।

অস্বচ্ছ অর্থায়ন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দিতে পারে, শাসকগোষ্ঠীকে জবাবদিহিতার আওতামুক্ত রাখতে পারে, বাজার ব্যবস্থাকে বিকৃত করতে পারে এবং জনসেবামূলক খাত থেকে বরাদ্দ সরিয়ে নিতে পারে। ঠিক যেভাবে সংযুক্ত আরব আমিরাত ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদের এক হাজার কোটি মার্কিন ডলারের গোপন ‘চাকা প্রকল্পে’ বিপুল অর্থায়ন করছে। প্রকল্পটির আওতায় প্রাসাদ কমপ্লেক্স ও উপগ্রহ নগরী নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এসব এমন এক সময়ে গড়ে তোলা হচ্ছে যখন দেশটি সংঘাত-পরবর্তী পুনর্গঠন, মুদ্রার অস্থিতিশীলতা, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা সুবিধার তীব্র সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

জিবুতি ও ইথিওপিয়া সংলগগ্ন বাব আল-মানদেব প্রণালী দিয়ে বিশ্ব বাণিজ্যের প্রায় ১৫ শতাংশ পরিবাহিত হয়, যা সামুদ্রিক প্রবেশাধিকারকে একটি শক্তিশালী ভূ-রাজনৈতিক সম্পদে পরিণত করেছে। শেষ পর্যন্ত প্রধান বিপদ হলো, বিদেশি পুঁজি হয়তো রাজনৈতিক অভিজাতদের শক্তি ও কৌশলগত প্রভাব বাড়িয়ে তুলবে, কিন্তু একই সঙ্গে তা স্বাগতিক দেশের সার্বভৌমত্ব ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করে দেবে। স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা না থাকলে, আধুনিক বন্দরগুলো টেকসই উন্নয়নের চালিকাশক্তি হওয়ার পরিবর্তে ভূ-রাজনৈতিক চাপের হাতিয়ার হয়ে
ওঠার ঝুঁকিতে পড়ে। সূত্র: ইউরেশিয়া নিউজ।