শিরোনাম

প্রকাশিত : ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:২১ রাত
আপডেট : ২৪ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:২৩ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

কয়লা থেকে তেল উৎপাদনে চীনের সাফল্য, অর্থনৈতিক মূল্য বাড়ল ৭ গুণ

বাংলাদেশ প্রতিদিন : চীনে কয়লাকে শুধু জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার না করে তা থেকে তেল ও রাসায়নিক পণ্য উৎপাদনের মাধ্যমে এর অর্থনৈতিক মূল্য কয়েক গুণ বাড়ানোর নজির তৈরি হয়েছে। দেশটির রাষ্ট্রীয় জ্বালানি কোম্পানি ন্যাশনাল এনার্জি গ্রুপের অধীন নিংজিয়া কোল ইন্ডাস্ট্রি বছরে ৪০ লাখ টন কয়লা থেকে তেল উৎপাদন সক্ষমতার পরোক্ষ কয়লা তরলীকরণ প্রকল্প চালুর পাশাপাশি ২০২৫ সালে ২ কোটি ৪০ লাখ টন কয়লা রূপান্তর করে ৪৬ লাখ টনের বেশি তেল ও রাসায়নিক পণ্য উৎপাদন করেছে। এতে প্রতি টন কয়লার সামগ্রিক ব্যবহারমূল্য সাতগুণের বেশি বেড়েছে।

সম্প্রতি চীনা সংবাদমাধ্যম সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ডেইলির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালে নিংজিয়া কোল ৪৬ লাখ টনের বেশি তেল ও রাসায়নিক পণ্য উৎপাদন করেছে। এ সময়ে ২ কোটি ৪০ লাখ টন কয়লা রূপান্তর করা হয়, যা নিংজিয়া অঞ্চলের বার্ষিক কয়লা উৎপাদনের প্রায় এক-চতুর্থাংশ। এতে প্রতি টন কয়লার সামগ্রিক ব্যবহারমূল্য সাতগুণের বেশি বেড়েছে। এর মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি কেবল কয়লা বিক্রির প্রচলিত ব্যবসায়িক মডেল থেকে বেরিয়ে এসেছে।

বর্তমানে ডিজিটাল ও বুদ্ধিমান প্রযুক্তির উন্নয়নের মাধ্যমে নিংজিয়া কোল উৎপাদনব্যবস্থা আরও উন্নত করছে। একই সঙ্গে উচ্চমানের তেল, সূক্ষ্ম রাসায়নিক এবং নতুন উপকরণ উৎপাদনের শিল্পশৃঙ্খল সম্প্রসারণ করছে। এর ফলে ভূগর্ভে থাকা কয়লা শুধু জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের গণ্ডি পেরিয়ে উচ্চমূল্যের পণ্যে পরিণত হচ্ছে।

কয়লা থেকে তেল তৈরির প্রযুক্তি

তেলকে ‘শিল্পের রক্ত’ বলা হয়। একটি দেশের অর্থনীতি ও জ্বালানি নিরাপত্তার সঙ্গে এর সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। চীনের জ্বালানি কাঠামোতে কয়লার আধিক্য থাকলেও তেলের মজুত তুলনামূলক কম। ফলে আমদানিনির্ভরতা দেশটির জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য দীর্ঘদিনের চ্যালেঞ্জ।

নিংজিয়া অঞ্চলে মোট জ্বালানি ব্যবহারের ৯০ শতাংশের বেশি আসে কয়লা থেকে। তাই কয়লাকে তেলে রূপান্তরের প্রযুক্তি দেশটির জ্বালানি কাঠামো সংস্কার এবং কয়লাকে শুধু জ্বালানি নয়, শিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহারের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কয়লা থেকে তেল তৈরির অন্যতম প্রধান প্রযুক্তি হলো পরোক্ষ কয়লা তরলীকরণ। এ প্রক্রিয়ায় উচ্চ তাপমাত্রায় কয়লাকে অক্সিজেন ও জলীয় বাষ্পের সঙ্গে বিক্রিয়া করিয়ে কার্বন মনোক্সাইড ও হাইড্রোজেনের মিশ্রণ বা সংশ্লেষণ গ্যাসে রূপান্তর করা হয়। এরপর গ্যাসটি পরিশোধন করে ফিশার-ট্রপশ সংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় পাঠানো হয়। শেষ ধাপে কম সালফার ও কম অ্যারোমেটিকযুক্ত বিভিন্ন ধরনের তেলজাত পণ্য তৈরি হয়।

নিংজিয়া কোলের ‘কয়লা থেকে তেল’ বিভাগের উৎপাদন বিভাগের উপপরিচালক হে পেং বলেন, এই প্রযুক্তি কয়লাভিত্তিক রাসায়নিক শিল্পের অন্যতম জটিল প্রযুক্তি।

বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরতা থেকে বেরিয়ে আসা

একসময় পরোক্ষ কয়লা তরলীকরণ প্রযুক্তিতে চীনের নিজস্ব সক্ষমতা ছিল না। এ খাতে বিদেশি একটি প্রতিষ্ঠান ছিল প্রযুক্তির পথিকৃৎ ও শীর্ষস্থানীয় কোম্পানি।

২০০৪ সালের জানুয়ারিতে চীনের জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশন (NDRC) নিংজিয়া কোলের পূর্বসূরি শেনহুয়া নিংজিয়া কোল গ্রুপকে চীনের প্রতিনিধি হিসেবে নির্বাচন করে। উদ্দেশ্য ছিল বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে কয়লা থেকে তেল তৈরির প্রযুক্তি নিয়ে সহযোগিতার পথ তৈরি করা।

কিন্তু আলোচনা গড়ায় দীর্ঘ টানাপোড়েনে। প্রায় ১০ বছর ধরে চলা আলোচনায় মূল প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণে থাকা বিদেশি প্রতিষ্ঠানটি একের পর এক অতিরিক্ত শর্ত দিতে থাকে। শুধু ফিশার-ট্রপশ সংশ্লেষণ প্রযুক্তির জন্যই তারা ২৫০ কোটি মার্কিন ডলার দাবি করেছিল।

আলোচনা যখন অচলাবস্থায় পড়ে, তখন চীনের অভ্যন্তরীণ গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি আসে। নিংজিয়া কোল সফলভাবে বিশ্বের প্রথম কয়লা-থেকে-ওলেফিন উৎপাদন লাইন তৈরি করে। একই সময়ে চীনা প্রতিষ্ঠান চায়না সিনথেটিক অয়েল করপোরেশন ইনার মঙ্গোলিয়ার ইটাই এলাকায় বছরে ১ লাখ ৬০ হাজার টন সক্ষমতার পরোক্ষ কয়লা তরলীকরণ প্রকল্প চালু করে এবং মানসম্মত পণ্য উৎপাদনে সক্ষম হয়।

এরপর নিংজিয়া কোল নিজস্ব মেধাস্বত্বসম্পন্ন চায়না সিনথেটিক অয়েল কোম্পানির মধ্য-তাপমাত্রার স্লারি ফিশার-ট্রপশ সংশ্লেষণ প্রযুক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। ২০১৩ সালে বছরে ৪০ লাখ টন কয়লা-থেকে-তেল উৎপাদন সক্ষমতার এই প্রদর্শনী প্রকল্পটি জাতীয় উন্নয়ন ও সংস্কার কমিশনের অনুমোদন পায়।

নিজস্ব প্রযুক্তিতে বিদেশি আধিপত্য ভাঙল চীন

নিজস্ব প্রযুক্তি তৈরি করা সহজ ছিল না। গ্যাসিফিকেশন চুল্লিতে কয়লা জমাট বাঁধা, বার্নারের স্বল্পস্থায়িত্ব এবং অনুঘটকের স্থিতিশীলতার সমস্যা—এমন নানা প্রযুক্তিগত বাধার মুখে পড়তে হয় গবেষক দলকে।

কয়লা তরলীকরণ প্রক্রিয়ার অন্যতম প্রধান যন্ত্র হলো গ্যাসিফিকেশন চুল্লি। শুরুতে বিদেশি প্রযুক্তি ব্যবহারের পরিকল্পনা থাকলেও পর্যালোচনার সময় দেখা যায়, আমদানি করা প্রযুক্তি চীনের কয়লার বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে পুরোপুরি মানানসই নয়। পরিবর্তন আনতে গেলে খরচও অনেক বেড়ে যেত।

তাই নিজস্ব প্রযুক্তিতে গ্যাসিফিকেশন চুল্লি তৈরির সিদ্ধান্ত নেয় গবেষক দল। ২০১২ সালে ‘শেননিং ফার্নেস’ নামে নিজস্ব মেধাস্বত্বসম্পন্ন গ্যাসিফিকেশন চুল্লি তৈরি করা হয়। এ প্রযুক্তির জন্য ১৫টি উদ্ভাবন পেটেন্ট পাওয়া যায় এবং বিদেশি প্রযুক্তির একচেটিয়া আধিপত্য ভেঙে দেওয়া সম্ভব হয়।

বিদেশি চুল্লি যেখানে শুধু উন্নতমানের কয়লা ব্যবহার করতে পারত, সেখানে ‘শেননিং ফার্নেস’ বিভিন্ন ধরনের কয়লা ব্যবহার করতে সক্ষম। ফলে নিম্নমানের কয়লাকেও পরিচ্ছন্নভাবে ব্যবহারের নতুন সুযোগ তৈরি হয়।

কয়লা থেকে তৈরি হচ্ছে জ্বালানি ও উচ্চমূল্যের পণ্য

৩৯ মাস নির্মাণকাজের পর ২০১৬ সালের অক্টোবরে প্রকল্পে মানসম্মত মিথানল উৎপাদন শুরু হয়। একই বছরের ডিসেম্বরে হালকা তেল, ভারী তেল ও মানসম্মত মোম উৎপাদন শুরু হয়। ২১ ডিসেম্বর মানসম্মত তেলজাত পণ্য উৎপাদন করা হয়।

এক দশকের বেশি সময় ধরে চীনের ২৯টি প্রতিষ্ঠান ও গবেষণা সংস্থার সঙ্গে যৌথভাবে কাজ করে প্রকল্পটি ৩৭টি গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তি দেশীয়ভাবে উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে।

৫৬০ হেক্টর এলাকাজুড়ে গড়ে ওঠা প্রকল্পটির আয়তন প্রায় ৬৫০টি আদর্শ ফুটবল মাঠের সমান। এখানে ২১ হাজার কিলোমিটার বৈদ্যুতিক তার, ১৩ হাজার প্রক্রিয়াজাতকরণ যন্ত্র, ১৫ হাজার বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম, ১ লাখ ১০ হাজার মিটারিং ও নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র এবং ২ লাখ ৫০ হাজার ভালভ রয়েছে।

ভূগর্ভে কোটি কোটি বছর ধরে থাকা কয়লা যখন কয়লা-থেকে-তেল উৎপাদন ব্যবস্থায় প্রবেশ করে, তখন একাধিক রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তা ডিজেল, ন্যাফথা, তরলীকৃত গ্যাস, সালফার ও ফিশার-ট্রপশ মোমসহ বিভিন্ন পণ্যে রূপান্তরিত হয়। এতে কয়লার অর্থনৈতিক মূল্য উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।

রকেটের জ্বালানি ও উচ্চমানের লুব্রিকেন্টও তৈরি হচ্ছে

চীনের নিজস্ব প্রযুক্তির মাধ্যমে কয়লাভিত্তিক জ্বালানি এখন মহাকাশ গবেষণাতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। চায়না অ্যারোস্পেস সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি করপোরেশন (CASC) কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে মিলে কয়লাভিত্তিক রকেট কেরোসিন তৈরি করেছে। এই জ্বালানি লং মার্চ-১২ রকেট উৎক্ষেপণে ব্যবহৃত হয়েছে এবং মহাকাশযানের জ্বালানির একক উৎসের ওপর নির্ভরতা কমিয়েছে।

এ ছাড়া নিংজিয়া কোলের নিজস্ব উদ্ভাবিত ‘কে সি-নেং প্লাস’ সিরিজের উচ্চমানের লুব্রিকেন্ট দেশীয় উচ্চমানের লুব্রিকেন্ট প্রযুক্তির ঘাটতি পূরণ করেছে। গাড়ি ও শিল্প খাতের জন্য ১১ ধরনের পণ্য তৈরি করা হচ্ছে। এর মধ্যে ৬৮ নম্বর অ্যান্টি-ওয়্যার হাইড্রলিক অয়েলের মান আন্তর্জাতিক উচ্চমানের পণ্যের সঙ্গে তুলনীয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তথ্যসূত্র : সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি ডেইলি, সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।

  • সর্বশেষ