মনজুর এ আজিজ: চলতি বছরের নভেম্বরে তুরস্কের আনাতলিয়ায় অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে জাতিসংঘের ৩১তম জলবায়ু সম্মেলন। এতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অংশ নেওয়ার কথা রয়েছে। বৈশ্বিক জলবায়ু কূটনীতির এ গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলনকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে বাংলাদেশ আবারও আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন, অভিযোজন সহায়তা এবং ক্ষয়ক্ষতি তহবিলে ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করার কূটনৈতিক প্রস্তুতি জোরদার করছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ক্লাইমেট ডিপ্লোমেসি বিভাগের মহাপরিচালক কাজি এহসানুল হক গণমাধ্যমকে জানান, ‘কপ৩১ সম্মেলনে কার্বন নিঃসরণ কমানো, অভিযোজন, ক্ষতিপূরণ, জলবায়ু অর্থায়ন এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের মতো বিষয়গুলো সামনে রেখে ব্যাপক প্রস্তুতি গ্রহণ করছে বাংলাদেশ’। তিনি বলেন, আগের কপ সম্মেলনগুলোতেও আমরা জলবায়ু আলোচনায় তাৎপর্যপূর্ণ অবদান রেখেছি। কপ৩১-এ বাংলাদেশের কৌশল নির্ধারণ প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, প্রতিষ্ঠান, থিংক ট্যাংক, এনজিওসহ অন্যান্য অংশীজনের সঙ্গে ধারাবাহিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হচ্ছে।
বিশ্লেষকদের মতে, এবারের কপ৩১ শুধু আরেকটি বার্ষিক জলবায়ু সম্মেলন নয়। গত বছরের কপ৩০-এর পর এটিকে অনেকেই ইমপ্লিমেন্টেশন কপ বা প্রায়োগিক জলবায়ু সম্মেলন হিসেবে দেখছেন। অর্থাৎ নতুন প্রতিশ্রুতির চেয়ে আগের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের ওপর বেশি গুরুত্ব থাকবে।
তুরস্ক ও অস্ট্রেলিয়ার যৌথ প্রেসিডেন্সি ইতিমধ্যে জানিয়েছে, এবারের সম্মেলনের অগ্রাধিকার হবে, বিদ্যুতায়ন, জলবায়ু অর্থায়ন, সহনশীল নগর, টেকসই কৃষি, সবুজ শিল্পায়ন এবং ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের সক্ষমতা বৃদ্ধি।
বাংলাদেশের প্রায় ৭১০ কিলোমিটার উপকূলীয় অঞ্চল, ঘনবসতি, নদীভাঙন, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং অনিয়মিত বৃষ্টিপাত অর্থনীতি ও খাদ্য নিরাপত্তার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করছে। প্রতি বছর দুর্যোগ-পরবর্তী পুনর্বাসন, অবকাঠামো মেরামত এবং কৃষি উৎপাদন পুনরুদ্ধারে বিপুল অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের অবদান অত্যন্ত সীমিত হলেও এর ক্ষতির বোঝা বহন করতে হচ্ছে সবচেয়ে বেশি।
এ বিষয়ে স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটির বিজ্ঞান অনুষদের ডিন এবং বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপার যুগ্ম সম্পাদক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বাংলাদেশ বিশ্বব্যাপী গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের খুবই সামান্য অংশের জন্য দায়ী, কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব সবচেয়ে বেশি ভোগ করছে। তাই জলবায়ু ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর জন্য পর্যাপ্ত অর্থায়ন, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি নিশ্চিত করা আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের দায়িত্ব।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগের অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্যাহ বলেন, বাংলাদেশ শুধু ক্ষতির শিকার নয় বরং জলবায়ু অভিযোজনের ক্ষেত্রে একটি বৈশ্বিক উদাহরণও।
বর্তমানে জলবায়ু-সম্পর্কিত ব্যয়ের বড় অংশই জাতীয় বাজেট থেকে বহন করা হয়। ফলে বাংলাদেশের দাবি কেবল সহানুভূতির নয়, বরং জলবায়ু ন্যায়বিচার, ন্যায্য অর্থায়ন এবং যৌথ বৈশ্বিক দায়িত্বের ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত।
বিশ্লেষকদের মতে, কপ৩১-এ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অগ্রাধিকার হবে জলবায়ু অর্থায়ন। অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্যাহর মতে, এনডিসি ৩.০ লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে মোট প্রয়োজনীয় ১১৬.১৮ বিলিয়ন ডলারের মধ্যে ৯০.২৩ বিলিয়ন ডলার বৈশ্বিক অর্থায়ন হিসেবে আদায় করা।
এদিকে উন্নয়নশীল দেশগুলো বহুদিন ধরে অভিযোগ করে আসছে, উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুত অর্থ বাস্তবে পর্যাপ্ত হারে পৌঁছায় না এবং অর্থ পাওয়ার প্রক্রিয়াও জটিল। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) বলছে, বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজন ও সহনশীলতা গড়ে তুলতে প্রতিবছর প্রায় ২৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার প্রয়োজন। কিন্তু বাস্তবে দেশটি তার তুলনায় অনেক কম অর্থ পায়। এই প্রেক্ষাপটে অর্থ মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রথম জাতীয় জলবায়ু অর্থায়ন কৌশল প্রণয়নের উদ্যোগও শুরু হয়েছে।
কপ৩১-এ অভিযোজন অর্থায়ন বাড়ানো, জলবায়ু অর্থায়ন নিয়ে নতুন কর্মসূচি এবং লেনদেন এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও উন্নয়নশীল দেশগুলোর প্রত্যাশা অনুযায়ী অর্থপ্রবাহ এখনও নিশ্চিত হয়নি। ফলে কপ৩১-এ এই বিষয়গুলো নিয়ে কঠিন দরকষাকষি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্যাহর মতে, অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করা এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুতি পূরণে অনীহা, অর্থায়নের ধীরগতি এবং ঋণনির্ভর অর্থায়নের প্রবণতা উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য উদ্বেগের কারণ।
পররাষ্ট্র ও পরিবেশ সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ এবার এককভাবে নয়, বরং জলবায়ু-ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর জোটের সঙ্গে সমন্বয় করে আলোচনা এগিয়ে নিতে চাইবে। বিশেষ করে ক্ষয়ক্ষতি তহবিল কার্যকর করা, অভিযোজন প্রকল্পে অনুদানভিত্তিক অর্থায়ন বৃদ্ধি, প্রযুক্তি হস্তান্তর এবং সক্ষমতা উন্নয়নের বিষয়গুলোতে যৌথ অবস্থান বাংলাদেশের দরকষাকষির শক্তি বাড়াতে পারে।
ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশের উচিত অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ দেশের সঙ্গে সমন্বিত অবস্থান গ্রহণ করা। একই সঙ্গে বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য, সফল অভিযোজন উদ্যোগ এবং জলবায়ু বিনিয়োগের সম্ভাবনা তুলে ধরে উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর আলোচনা চালানো। দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক অংশীদারিত্ব জোরদার করাও গুরুত্বপূর্ণ’। একই সঙ্গে জাপান, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, কানাডা এবং বহুপাক্ষিক উন্নয়ন অংশীদারদের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকেও বাংলাদেশ বিশেষ গুরুত্ব দিতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এদিকে অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্যাহর মতে, কপ৩১-এ বাংলাদেশের কূটনৈতিক কৌশলের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত জলবায়ু ন্যায়বিচার, সহজলভ্য অর্থায়ন এবং ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর সুরক্ষা নিশ্চিত করা। বাংলাদেশকে বৈশ্বিক জলবায়ু তহবিল থেকে অনুদানভিত্তিক, সহজ শর্তের এবং দ্রুত অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করার দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরা।
বিশ্লেষকদের মতে, কপ৩১-কে শুধু জলবায়ু সম্মেলন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি এখন অর্থনৈতিক কূটনীতি, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং সবুজ বিনিয়োগ আকর্ষণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি, উপকূলীয় অবকাঠামো, নগর জলাবদ্ধতা ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু-সহনশীল কৃষি এবং দুর্যোগ পূর্বাভাস ব্যবস্থায় আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহায়তা বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগ এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট সংস্থার মধ্যে সমন্বয় বাড়ানোর ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। কূটনৈতিক সূত্র বলছে, কপ৩১-এর আগে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক বৈঠকে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরা, সম্ভাব্য অংশীদার দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা এবং অভিন্ন স্বার্থসম্পন্ন দেশগুলোর সমর্থন নিশ্চিত করার প্রচেষ্টা চলবে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জলবায়ু অর্থায়নের ক্ষেত্রে শুধু অর্থের প্রতিশ্রুতি পেলেই হবে না; সেই অর্থ দ্রুত ও সহজ শর্তে পাওয়ার ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে অনেক উন্নয়নশীল দেশ অভিযোগ করেছে, জটিল আবেদন প্রক্রিয়া, দীর্ঘ অনুমোদন এবং কঠোর শর্তের কারণে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলো সময়মতো অর্থ ব্যবহার করতে পারেনি।
সংশ্লিষ্টরা জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতা, অর্থ ব্যবহারের স্বচ্ছতা, আন্তর্জাতিক মানের পরিবেশ ও সামাজিক সুরক্ষা নীতি অনুসরণ এবং ফলাফল মূল্যায়নের সক্ষমতা বাড়ানোও বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, দাতারা এখন শুধু প্রকল্প অনুমোদনের পাশাপাশি প্রকল্পের কার্যকারিতা ও জবাবদিহিতার দিকেও সমান গুরুত্ব দিচ্ছেন।
অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্যাহ বলেন, ভবিষ্যতে শুধু ঋণনির্ভর অর্থায়নের পরিবর্তে ফলাফলভিত্তিক অর্থায়ন, কার্বন ক্রেডিট, গ্রিন বন্ড এবং অন্যান্য উদ্ভাবনী অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব বাড়ানো প্রয়োজন, যাতে উন্নয়নশীল দেশগুলো অতিরিক্ত ঋণের বোঝা ছাড়াই জলবায়ু কার্যক্রম এগিয়ে নিতে পারে।
এ বিষয়ে অনেকটাই একমত অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার। তিনি বলেন, এখন শুধু অর্থ পাওয়াই যথেষ্ট নয়; অর্থের কার্যকর ব্যবহার, স্বচ্ছতা, মনিটরিং, মূল্যায়ন এবং বাস্তব ফলাফল দেখাতে হবে। ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, বাংলাদেশ আজ জলবায়ু কূটনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও বিশ্বাসযোগ্য কণ্ঠস্বর। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা, অভিযোজন, কমিউনিটিভিত্তিক সহনশীলতা এবং আন্তর্জাতিক আলোচনায় নেতৃত্বের কারণে বাংলাদেশ বৈশ্বিকভাবে প্রশংসিত।
অধ্যাপক মোহাম্মদ সফি উল্যাহ বলেন, বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর পক্ষে একটি শক্তিশালী ও বিশ্বাসযোগ্য কণ্ঠস্বর হিসেবে কাজ করছে। অভিযোজন, ক্ষয়ক্ষতি, জলবায়ু অর্থায়ন এবং ন্যায়ভিত্তিক রূপান্তর নিয়ে বাংলাদেশের সুস্পষ্ট ও তথ্যনির্ভর অবস্থান কপ৩১-সহ বৈশ্বিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশকে একটি প্রভাবশালী অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। এদিকে জলবায়ু কূটনীতিকে এগিয়ে নিতে নতুন উইং চালু করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
কপ৩১ বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক পরীক্ষা। বিশ্লেষকদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য বাংলাদেশের দায় অত্যন্ত সীমিত হলেও এর অভিঘাত সবচেয়ে বেশি অনুভব করছে। তাই কপ৩১ শুধু আরেকটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন নয় বরং এটি বাংলাদেশের জন্য ন্যায্য অর্থায়ন, প্রযুক্তিগত সহযোগিতা এবং টেকসই উন্নয়নের স্বার্থে একটি গুরুত্বপূর্ণ কূটনৈতিক মঞ্চ। এই সম্মেলনে বাংলাদেশের সাফল্য নির্ধারণ করবে আগামী বছরগুলোতে জলবায়ু ঝুঁকি মোকাবিলায় কতটা আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সম্পদ আহরণ করতে পারবে তার ওপর।