শিরোনাম
◈ মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের গুঞ্জন, আলোচনায় একাধিক নতুন নাম ◈ ইরানে ট্রাম্পের ‘মহাপরিকল্পনা’ কি স্থল অভিযানের প্রস্তুতি? ◈ শীর্ষ সন্ত্রাসী সুব্রত বাইনের সহযোগী তানিম রেজা বাপ্পি আটক ◈ সরকারের ৫ মাস পূর্তি: শনিবার সংবাদ সম্মেলন ডেকেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ◈ দেশের যেসব অঞ্চলে সকালের মধ্যেই ঝড় হতে পারে  ◈ শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণ প্রশ্নে ভারতের নতুন বক্তব্য ◈ এটা রাজনৈতিক মঞ্চ নয়, যাকে পছন্দ হয় না, তাকেই ফ্যাসিস্ট বানিয়ে দেন: ছাত্রদল নেতাকে কুমিল্লার পুলিশ সুপারের কড়া জবাব ◈ ভারতীয় নাগরিক রেশমাকে ‘বাংলাদেশি’ পরিচয়ে পুশইনের অভিযোগ, দেশে ফিরতে ঘুরছে পথে পথে ◈ ২০ জুলাইয়ের যমুনা বৈঠক পিছোতে পারে, তবে প্রস্তুতি পুরোদমে ◈ জিম্বাবু‌য়ে‌কে হা‌রি‌য়ে সি‌রিজ সমতায় বাংলা‌দেশ

প্রকাশিত : ১৮ জুলাই, ২০২৬, ১২:১৭ রাত
আপডেট : ১৮ জুলাই, ২০২৬, ০২:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

পাকিস্তানের সিন্ধু প্রদেশে শিশুদের মধ্যে যে কারণে বাড়ছে এইচআইভি সংক্রমণ!

পাকিস্তানের বৃহত্তম শহর করাচির একটি সরকারি হাসপাতালে ভয়াবহ এইচআইভি প্রাদুর্ভাবের ঘটনায় অন্তত ১৩০ জন আক্রান্ত হিসেবে শনাক্ত হয়েছেন, যাদের অধিকাংশই শিশু। কর্মকর্তাদের মতে, সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে এই সংখ্যা দ্রুত বাড়ছে।

দেশটির সিন্ধু প্রদেশের শ্রমমন্ত্রী সাইদ গনি চলতি সপ্তাহের শুরুতে জানিয়েছেন, সিন্ধু এমপ্লয়িজ সোশ্যাল সিকিউরিটি ইনস্টিটিউশন (এসইএসএসআই) পরিচালিত কুলসুম বাই ভালিকা (কেবিভি) হাসপাতালে ১০,৫০০-এর বেশি মানুষের স্ক্রিনিং করা হয়েছে, যেখানে ১২০ জন এইচআইভি পজিটিভ শনাক্ত হয়েছেন। এছাড়া করাচির লান্ধি এলাকায় এসইএসএসআই-এর অন্য একটি কেন্দ্রে আরও ১০ জন নতুন রোগী শনাক্ত হয়েছেন।

এসইএসএসআই হলো একটি স্বায়ত্তশাসিত প্রাদেশিক সংস্থা যা সিন্ধু প্রদেশের শিল্প ও বাণিজ্যিক কর্মী এবং তাদের ওপর নির্ভরশীল ব্যক্তিদের স্বাস্থ্যসেবা ও আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকে।

কেবিভি হাসপাতালের এই সংকট প্রথম নজরে আসে ২০২৫ সালের নভেম্বরে, যখন করাচির 'সাইট টাউন'-এর বাসিন্দারা সেখানে চিকিৎসাধীন শিশুদের মধ্যে সংক্রমণের লক্ষণ দেখেন। তবে কর্মকর্তাদের ধারণা, এই প্রাদুর্ভাবের সূত্রপাত ২০২৫ সালের অক্টোবরে, যখন প্রথম ছয়টি এইচআইভি পজিটিভ কেইস প্রাদেশিক স্বাস্থ্য বিভাগে রিপোর্ট করা হয়েছিল।

এই মাসে আসলে কী ঘটেছে?

গত ১৪ জুলাই মুখ্যমন্ত্রী মুরাদ আলী শাহকে জানানো হয়েছে, দুটি তদন্তে হাসপাতালের কার্যক্রমে ভয়াবহ গাফিলতি পাওয়া গেছে। এর মধ্যে রয়েছে সংক্রমণ প্রতিরোধ প্রোটোকল না মানা, সুরক্ষা সরঞ্জামের অপর্যাপ্ত ব্যবহার এবং একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জের ভুল ব্যবস্থাপনা।

গত বছরের নভেম্বরে জমা দেওয়া প্রথম তদন্তে ১৬ জন এইচআইভি পজিটিভ শিশু শনাক্ত হয়েছিল, যাদের সবার সঙ্গে কেবিভি হাসপাতালের শিশু বিভাগের যোগসূত্র ছিল। গত ১৯ জুন প্রাদেশিক ওমবাডসম্যানের কাছে জমা দেওয়া দ্বিতীয় ও আরও বিস্তারিত তদন্ত প্রতিবেদনে ৭৮ জন সংক্রামিত এবং ৬ জনের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। এতে প্রশাসনিক ও তদারকি ব্যর্থতার জন্য নির্দিষ্ট হাসপাতাল কর্মীদের দায়ী করা হয়েছে।

মন্ত্রী সাইদ গনি বলেন, সমস্ত সংক্রমণের উৎস ২০২৫ সালের অক্টোবরের আগের। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, স্ক্রিনিং চালিয়ে গেলে আরও নতুন রোগী শনাক্ত হতে পারে। এই ঘটনায় গত ৩ জুলাই ৩৭ জন চিকিৎসক ও হাসপাতাল কর্মীকে শোকজ করা হয়েছে। গনি জানান, দায়ীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা ও বরখাস্তের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নিজের দায়বদ্ধতা নিয়ে করা এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তিনি 'পরোক্ষ দায়' স্বীকার করেছেন এবং সংকটের সমাধানে প্রয়োজন হলে পদত্যাগ করতেও আপত্তি নেই।

এটি কি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা?

সিন্ধু হাইকোর্টে দায়ের করা একটি পিটিশনে দাবি করা হয়েছে, সিরিঞ্জের আবার ব্যবহারের কারণে এই প্রাদুর্ভাব ঘটেছে। তবে গত ৪ জুলাই মন্ত্রী গনি সাংবাদিকদের বলেন, সিরিঞ্জের কারণে এই সংক্রমণ হয়নি। তার দাবি, কেবিভি হাসপাতাল 'অটো-ডিজেবল' সিরিঞ্জ ব্যবহার করে যা আবার ব্যবহার করা সম্ভব নয়।

তবে সরকারি তদন্তগুলো স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রোটোকল এবং একবার ব্যবহারযোগ্য সিরিঞ্জ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ব্যর্থতার দিকেই ইঙ্গিত করেছে। হাইকোর্টে দাখিল করা পিটিশনে আরও দাবি করা হয়েছে, সংক্রমণের প্রকৃত সংখ্যা সরকারিভাবে স্বীকার করা সংখ্যার চেয়ে অনেক বেশি।

সিন্ধু প্রদেশে এটিই প্রথম বড় এইচআইভি প্রাদুর্ভাব নয়। গত ডিসেম্বরে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এবং ইউএনএইডস পাকিস্তানকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ইস্টার্ন মেডিটেরানিয়ান অঞ্চলের (২১টি দেশ নিয়ে গঠিত) মধ্যে দ্রুততম বর্ধনশীল এইচআইভি মহামারীর দেশ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। সেখানে গত ১৫ বছরে বার্ষিক সংক্রমণ ২০০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে—২০১০ সালে যা ছিল ১৬,০০০, ২০২৪ সালে তা দাঁড়িয়েছে ৪৮,০০০-এ।

গত ১ ডিসেম্বর বিশ্ব এইডস দিবসের এক যৌথ বিবৃতিতে জানানো হয়, পাকিস্তানে প্রায় ৩ লাখ ৫০ হাজার মানুষ এইচআইভি নিয়ে বাস করছেন, যাদের প্রায় ৮০ শতাংশই তাদের সংক্রমণের বিষয়ে জানেন না। বিবৃতিতে আরও বলা হয়, ০ থেকে ১৪ বছর বয়সী শিশুদের মধ্যে সংক্রমণ ২০১০ সালের ৫৩০ থেকে ২০২৩ সালে ১,৮০০-তে পৌঁছেছে। এইচআইভি আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে মাত্র ৩৮ শতাংশ চিকিৎসা পাচ্ছে এবং মা থেকে শিশুর সংক্রমণ রোধে প্রয়োজনীয় থেরাপি পাচ্ছেন মাত্র ১৪ শতাংশ গর্ভবতী নারী।

গত জুনে ব্রিটিশ মেডিকেল জার্নাল 'দ্য ল্যানসেট এইচআইভি'-তে চিকিৎসকরা যুক্তি দিয়েছেন, পাকিস্তানের এই মহামারী বর্তমানে 'প্রধানত স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার মাধ্যমেই' চালিত হচ্ছে। তবে করাচির আগা খান ইউনিভার্সিটি হাসপাতালের সংক্রামক রোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক সৈয়দ ফয়সাল মাহমুদ সতর্ক করে বলেছেন, করাচির এই প্রাদুর্ভাব সামগ্রিক ব্যবস্থার ত্রুটি। তিনি আল জাজিরাকে বলেন, 'এই মুহূর্তে এটি বলা অসম্ভব যে যৌন মিলন, মা থেকে শিশু নাকি চিকিৎসাক্ষেত্রের অনিরাপদ প্র্যাকটিস—কোনটি সংক্রমণের প্রধান কারণ।' তিনি বলেন, ক্লিনিকে গিয়ে কতজন এইচআইভি আক্রান্ত হয়েছেন তার কোনো পদ্ধতিগত নজরদারি (সার্ভেইল্যান্স) নেই।

এই প্যাটার্ন শুধু কেবিভি হাসপাতালে সীমাবদ্ধ নয়। করাচির আরও তিনটি হাসপাতালে শিশু এইচআইভি রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। একটি কেন্দ্রে ২০২৪ সালে ১০ জন রোগী থাকলেও ২০২৫ সালে তা ৭০ জনে দাঁড়িয়েছে। পাকিস্তান মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন গত এপ্রিলে সতর্ক করেছে, ২০২৬ সালের প্রথম প্রান্তিকে সিন্ধুতে রেকর্ড করা ৮৯৪টি এইচআইভি মামলার মধ্যে ৩২৯টিই ছিল শিশুদের। তারা একে ধ্বংসের সামান্য অংশ বলে বর্ণনা করেছেন।

অধ্যাপক মাহমুদের মতে, এটি কোনো নির্দিষ্ট হাসপাতালের সমস্যা নয়, বরং দেশব্যাপী স্বাস্থ্যসেবা স্তরে ইনজেকশন সুরক্ষার দুর্বল প্রোটোকল একটি পদ্ধতিগত সমস্যা। তিনি জানান, শুধু শিশুরা নয়, ডায়ালাইসিস সেন্টারে অনিরাপদ রক্ত সঞ্চালনের কারণেও অনেকে আক্রান্ত হচ্ছেন।

কী ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে?

সিরিঞ্জ নিয়ন্ত্রণ ও ধ্বংস করার প্রাদেশিক আইন লঙ্ঘনের অভিযোগের বিষয়ে সিন্ধু সরকারকে ২০ জুলাইয়ের মধ্যে জবাব দিতে বলেছে হাইকোর্ট। ফেডারেল পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরীফ গত ৩ জুলাই নিম্নমানের সিরিঞ্জের ওপর দেশব্যাপী নিষেধাজ্ঞা দিয়েছেন। ড্রাগ রেগুলেটরি অথরিটি অব পাকিস্তান জানিয়েছে, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে সাধারণ সিরিঞ্জ বিক্রি নিষিদ্ধ হবে এবং কেবল 'অটো-ডিজেবল' সিরিঞ্জই বাজারে থাকবে।

ফেডারেল স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোস্তফা কামাল জানিয়েছেন, দেশব্যাপী অস্ত্রোপচারের আগে এইচআইভি স্ক্রিনিং বাধ্যতামূলক করা হবে। অন্যদিকে, সিন্ধু সরকার ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের দীর্ঘমেয়াদী চিকিৎসার জন্য ৭.২ মিলিয়ন ডলারের একটি এনডাউমেন্ট ফান্ড অনুমোদন করেছে। পাশাপাশি কেবিভি হাসপাতালে একটি আইসোলেশন ওয়ার্ড স্থাপন এবং ক্রয় ও সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার তৃতীয় পক্ষীয় অডিটের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

আল জাজিরার পক্ষ থেকে সিন্ধু স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে অধ্যাপক মাহমুদ বলছেন, সিরিঞ্জ নিষিদ্ধ করা সমস্যার একটি অংশ মাত্র। পাকিস্তানের ৬০ শতাংশ স্বাস্থ্যসেবা বেসরকারি খাত থেকে আসে, যা নিয়ন্ত্রণ করা অনেক কঠিন। তিনি বলেন, 'রোগীরা চিকিৎসকের কাছে গেলেই ইনজেকশন আশা করেন কারণ তারা মনে করেন এতে দ্রুত সুস্থ হওয়া যাবে। এটি মূলত একটি 'পারফেক্ট স্টর্ম'—অত্যধিক ইনজেকশন দেওয়া হচ্ছে, যা অনিয়ন্ত্রিত এবং যেখানে সুরক্ষার অভাব ও আইন লঙ্ঘনের কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেই।'  অনুবাদ: টিবিএস

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়