আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ইরান স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে, হরমুজ প্রণালির ব্যবস্থাপনা থেকে তারা কোনোভাবেই সরে দাঁড়াবে না এবং এই কৌশলগত জলপথের ওপর নিজেদের নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখতে প্রয়োজনে যুদ্ধ করতেও প্রস্তুত। বুধবার প্রেস টিভিকে এ কথা জানিয়েছেন একটি অবগত নিরাপত্তা সূত্র।
সূত্রটি জানায়, গত ৪৮ ঘণ্টার ঘটনাপ্রবাহ তেহরানের অবস্থানকে আরও দৃঢ় করেছে এবং এ বিষয়ে একটি নতুন সামরিক ও কৌশলগত নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। --- পার্সটুডে
সূত্রের ভাষ্য অনুযায়ী, ইরানের হালনাগাদ কৌশল অনুযায়ী দেশটির ভূখণ্ড বা স্বার্থের বিরুদ্ধে নতুন করে কোনো হামলা হলে ইসলামী প্রজাতন্ত্র সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে জবাব দেবে।
তিনি আরও বলেছেন, ইরানের নতুন প্রতিশোধমূলক নীতির অধীনে ইরানের বিরুদ্ধে যেকোনো হামলার পর তাৎক্ষণিকভাবে দুটি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। প্রথমত, হরমুজ প্রণালি সব ধরনের নৌযান চলাচলের জন্য সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে। দ্বিতীয়ত, শত্রুপক্ষের লক্ষ্যবস্তুতে কমপক্ষে দুই-এক অনুপাতে হামলা চালানো হবে। অর্থাৎ, ইরানের একটি লক্ষ্যবস্তুতে হামলা হলে জবাবে অন্তত দুটি শত্রু লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হবে।
সূত্রটি আরও বলেন, এ বিষয়ে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকে (MoU) স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে যে, ইরান নিজস্ব ব্যবস্থাপনা অনুযায়ী হরমুজ প্রণালি পুনরায় খুলে দেবে। তাই ইরান তার নির্ধারিত কাঠামোর বাইরে কোনো নতুন নৌপথ প্রতিষ্ঠার অনুমতি দেবে না।
সাম্প্রতিক সময়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে হুমকি দিয়েছেন, সে বিষয়েও ওই সূত্র ওয়াশিংটনের উদ্দেশে কঠোর বার্তা দিয়েছে।
সূত্রটি প্রেস টিভিকে জানায়, "যেকোনো হুমকির জবাব শক্তিশালীভাবে দেওয়া হবে। ইরান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও এ অঞ্চলে তার মিত্রদের মধ্যে কোনো পার্থক্য করে না।
তিনি আরও বলেন, "ট্রাম্প সাম্প্রতিক হুমকি দিয়ে কোনো লাভ করবেন না। বরং তিনি নিশ্চিতভাবেই হরমুজ প্রণালি এবং চূড়ান্ত চুক্তি নিয়ে চলমান আলোচনা—উভয়ই হারাবেন। এখন সিদ্ধান্ত তাঁর।"
এই সতর্কবার্তা এমন এক সময়ে এসেছে, যখন পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে উত্তেজনা বেড়েছে। বুধবার ভোরে মার্কিন বাহিনী ইরানের উপকূলীয় এলাকায় নতুন করে অবৈধ ও উসকানিমূলক হামলা চালায়।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের হরমোজগান প্রদেশ এবং মাহশাহর এলাকার কয়েকটি উপকূলীয় ঘাঁটি ও বেসামরিক স্থাপনায় সামরিক হামলা চালায়, যা প্রকাশ্যেই যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘন করেছে।
এর জবাবে ইসলামী বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি) প্রাথমিক প্রতিক্রিয়া হিসেবে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন ব্যবহার করে বাহরাইন ও কুয়েতে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের ৮৫টি সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়।
আইআরজিসি জানায়, হামলায় বাহরাইনের পোর্ট সালমান, মার্কিন পঞ্চম নৌবহরের কার্যক্রম এলাকা এবং কুয়েতের আলি আল সালেম বিমানঘাঁটির স্থাপনাগুলো লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। একই সঙ্গে বাহিনীটি জানায়, একটি এমকিউ-৯ (MQ-9) ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। তাদের দাবি, ড্রোনটি অভিযানে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে সেটিকে গুলি করে নামিয়ে দেওয়া হয়।
বুধবার এর আগে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের খাতাম আল-আম্বিয়া কেন্দ্রীয় সদর দপ্তর জানায়, "আগ্রাসী মার্কিন বাহিনীকে" যে কোনো ধরনের সহায়তা প্রদানকারী উৎসকে ইরানের সশস্ত্র বাহিনী বৈধ সামরিক লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করবে।
সামরিক সদর দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়, "ইসলামী ইরানের সার্বভৌমত্ব ও ভূখণ্ড লঙ্ঘনের জন্য আগ্রাসী মার্কিন বাহিনীকে যে কোনো ধরনের সহায়তা প্রদানকারী উৎস ইরানের সশস্ত্র বাহিনীর বৈধ লক্ষ্যবস্তু হবে।"
বিবৃতিতে আরও বলা হয়, হরমুজ প্রণালিতে বাণিজ্য-জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকারের জন্য একমাত্র নিরাপদ পথ হলো ইরান নির্ধারিত নৌপথ এবং তেহরান এ প্রণালির ব্যবস্থাপনায় কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ মেনে নেবে না।
এদিকে, ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার ও প্রধান আলোচক মোহাম্মদ বাকের কলিবফ ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সমঝোতা স্মারক (MoU) লঙ্ঘনের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ওয়াশিংটনের "দাদাগিরি ও জবরদস্তির যুগ শেষ হয়ে গেছে।"
তিনি যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে চারটি বড় ধরনের সমঝোতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলে ধরেন: ১. হরমুজ প্রণালিতে ইরানের নির্ধারিত ব্যবস্থাপনা লঙ্ঘন। ২. ইরানের তেল রপ্তানির ওপর পুনরায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ। ৩. ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে সামরিক হামলা। ৪. লেবাননে ইসরায়েলের অব্যাহত আগ্রাসনের প্রতি সমর্থন।
কলিবফ বলেন, "দাদাগিরি ও জবরদস্তির যুগ শেষ। এভাবে কিছুই অর্জন করা যাবে না। আমরা কখনোই নতি স্বীকার করব না।