রক্তে শর্করা বেড়ে গেলে বেশিরভাগ মানুষ সেটিকে টাইপ ১ বা টাইপ ২ ডায়াবেটিস বলেই ধরে নেন। কিন্তু বিবিসির প্রতিবেদনে উঠে এসেছে টাইপ ৫ ডায়াবেটিসের বিষয়টি। সমস্যা যা দীর্ঘদিন অপুষ্টিতে ভোগার কারণে টাইপ ৫ ডায়াবেটিস হয় বলে ধারণা করা হয়, যদিও এটিকে আলাদা একটি রোগের ধরন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়নি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বা ডব্লিউএইচও। যদিও আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন (আইডিএফ) ২০২৫ সালে এই ধরনটিকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি দিয়েছে। গবেষকদের ধারণা, বিশ্বজুড়ে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ এ রোগে আক্রান্ত হতে পারেন, অথচ ভুল নির্ণয়ের কারণে অনেকেই সঠিক চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
অ্যালবার্ট আইনস্টাইন কলেজ অব মেডিসিনে গ্লোবাল ডায়াবেটিস ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. মেরেডিথ হকিন্স মনে করেন, ডায়াবেটিসের এই ধরনটি শনাক্ত করতে না পারা খুবই বিস্তৃত সমস্যা এবং এর ফলে প্রয়োজন ছাড়াই ইনসুলিন ব্যবহারের কারণে মৃত্যুর ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে।
ডায়াবেটিসের ধরণ ও প্রভাব
টাইপ ১ ডায়াবেটিস একটি অটোইমিউন অবস্থা, যেখানে শরীর ইনসুলিন উৎপাদন বন্ধ করে দেয়। অটোইমিউনের ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তির শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ভুলে সুস্থ অঙ্গ প্রত্যঙ্গকে উল্টো আক্রমণ করে তা ক্ষতিগ্রস্ত করে।
আর টাইপ ২ ডায়াবেটিস ইনসুলিন প্রতিরোধের সঙ্গে সম্পর্কিত। কিন্তু বিজ্ঞানীদের মতে, টাইপ ৫ দীর্ঘস্থায়ী অপুষ্টির সঙ্গে সম্পর্কিত হতে পারে, যা ইনসুলিন উৎপাদনকারী অগ্ন্যাশয়ের বিকাশকে প্রভাবিত করে। এই রোগীদের শরীরে কিছু ইনসুলিন তৈরি হলেও সেটা যথেষ্ট নয় এবং তারা ইনসুলিনের প্রতি অস্বাভাবিকভাবে সংবেদনশীল হতে পারেন। এ কারণেই প্রচলিত চিকিৎসা সবসময় কার্যকর হয় না, বরং কিছু ক্ষেত্রে তা ক্ষতিকর হতে পারে।
কোনো কোনো রোগীর ক্ষেত্রে, এমনকি সাধারণ মাত্রার ইনসুলিনও হাইপোগ্লাইসেমিয়া সৃষ্টি করতে পারে যা প্রাণঘাতী হতে পারে। যখন রক্তে শর্করার মাত্রা বিপজ্জনকভাবে কমে যায়, সেই অবস্থাকে হাইপোগ্লাইসেমিয়া বলে। অন্যান্য ধরনের মতোই, টাইপ ৫ থেকেও অন্ধত্ব, কিডনি বিকলতা, স্নায়ু ক্ষতি এবং ধীরে সারে এমন ক্ষত হতে পারে। অনেক সময় ওজনের তরুণদের মধ্যে টাইপ ৫ ডায়াবেটিস দেখা যায়। তাদের রক্তে শর্করার মাত্রা খুব বেশি থাকে বলে সহজেই ভুল করে এটিকে টাইপ ১ হিসেবে ধরা হয়।
উপসর্গ
টাইপ ৫ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের দেয়া তথ্য থেকে এই রোগের কিছু উপসর্গ উঠে আসে। ৩০ বছর বয়সী উগান্ডায় বসবাসকারী নোয়েলা মুকুম্বি। টাইপ ৫ ডায়াবেটিসের উপসর্গ অনেকটাই অন্যান্য ধরনের ডায়াবেটিসের মতো। এর মধ্যে রয়েছে—
এই লক্ষণ দেখা দিলে সৎর্ক হতে হবে। কারণ যদি আপনার টাইপ ৫ ডায়াবেটিস হয় আর চিকিৎসা চলে টাইপ ২ এর তাহলে বিপদ বাড়তে পারে। তাই সতর্কতা দরকার।
অপুষ্টির কারণে ডায়াবেটিস
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এশিয়া ও সাহারা-দক্ষিণ আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষদেড় মাঝে টাইপ ৫ বেশি দেখা যায়। কারণ এখানকার অনেকেই শৈশবের অপুষ্টিতে ভোগেন। তবে কিছু গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, অন্যান্য দেশেও কম ওজনের মানুষের মধ্যে ডায়াবেটিস বাড়ছে। ২০২৩ সালে ‘ডায়াবেটিস কেয়ার’-এ প্রকাশিত একটি গবেষণা করা হয়। এতে অংশ নিয়েছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ২৬ লাখেরও বেশি প্রাপ্তবয়স্করা। গবেষণায় দেখা যায় মোটা নয় এমন মানুষের মধ্যে তথাকথিত ‘লিন ডায়াবেটিস’, যাকে বলা যেতে পারে অপুষ্টির কারণে ডায়াবেটিস, এর হার বাড়ছে।
লন্ডনের সোফিয়া শেয়ারার মনে করেন, তিনি এই শ্রেণিতে পড়েন। ২৩ বছর বয়সে নিয়মিত রক্ত পরীক্ষায় দেয়া যায় তার রক্তে শর্করার মাত্রা অনেকটা বেশি ছিল। তিনি জানান শৈশব ও কৈশোরের বড় একটি সময় তিনি গুরুতরভাবে কম ওজনের ছিলেন এবং একসময় হাসপাতালে চিকিৎসাও নিয়েছেন। ১৯ বছর বয়সে যখন তার ওজন বাড়তে শুরু করে, তখন থেকেই তিনি অসুস্থ বোধ করতে থাকেন।
তিনি বলেন, আমি খুব দ্রুত খুব ক্ষুধার্ত হয়ে যেতাম, শরীর কাঁপত, মনে হতো অজ্ঞান হয়ে যাব। পরীক্ষায় টাইপ ১ এবং বিরল জেনেটিক ধরনের ডায়াবেটিস বাদ দেয়ার পর, বিকল্প না থাকায় চিকিৎসকেরা তাকে টাইপ ২ ক্লিনিকে পাঠান। টাইপ ৫ শনাক্তকরণের সঙ্গে যুক্ত একজন বিজ্ঞানী তাকে বলেন, তার মধ্যে এ রোগের কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। তবে যুক্তরাজ্যে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক নির্ণয় পদ্ধতি না থাকায় তার রোগ নিশ্চিত হয়নি।
টাইপ ৫ ডায়াবেটিসের নতুন স্বীকৃতি
টাইপ ৫ ডায়াবেটিস নির্ণয় করার নির্দিষ্ট কোনো পরীক্ষা নেই আর এ কারণেই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি নিয়ে বিভ্রান্তি রয়েছে। ১৯৮৫ সালে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা এটিকে ‘অপুষ্টিজনিত ডায়াবেটিস’ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিল। কিন্তু ১২ বছর পর তারা সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে কারণ কারণ চিকিৎসকেরা একমত হতে পারেননি এটি টাইপ ২ থেকে আলাদা কি না।
তারপর ২০২৫ সালের এপ্রিল মাসে, আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিস ফেডারেশন বা আইডিএফ আনুষ্ঠানিকভাবে টাইপ ৫ ডায়াবেটিসকে স্বীকৃতি দেয়। গত বছর ‘ল্যানসেট’-এ প্রকাশিত ৫০ জনের বেশি বিজ্ঞানীর একটি গবেষণাও এ স্বীকৃতিতে ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা জানান তাদের বর্তমান শ্রেণিবিন্যাস ‘সব ডায়াবেটিস রোগীর বৈশিষ্ট্য ধারণ করে না’ এবং যথেষ্ট প্রমাণ পেলে ভবিষ্যতে টাইপ ৫ পুনরায় অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
সমর্থকদের মতে, আইডিএফ-এর স্বীকৃতিই ইতোমধ্যে রোগীদের আরও উপযুক্ত চিকিৎসা পেতে সহায়তা করছে।ড. হকিন্স বলেন, প্রথমবারের মতো, খুব শিগগিরই ডিগ্রুট'স এন্ডোক্রিনোলজি বইয়ে এ নিয়ে একটি অধ্যায় থাকবে- যা বিশ্বজুড়ে চিকিৎসকেরা ব্যবহার করেন।
সূত্র: চ্যানেল ২৪