শিরোনাম
◈ টানা বৃষ্টিতে উখিয়ার তিন রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড়ধস, নারী-শিশুসহ ৮ জন নিহত ◈ ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম‌্যা‌চে আজ বাংলা‌দেশ-জিম্বাবু‌য়ে মু‌খোমু‌খি  ◈ ‘ট্রাফিক পুলিশকে ফোন বা অনুরোধ নয়, মন্ত্রীদের সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী’ ◈ বাংলাদেশ সীমান্তে ৩ থানা ও ৩ আউটপোস্ট গড়তে চায় ভারতের পুলিশ ◈ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আসল পরীক্ষা বাণিজ্য পুনর্গঠন: চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন ◈ পেনাল্টি মিসের মাশুল, হলান্ডের জোড়া গোলে বিদায় ব্রাজিলের ◈ ১২ হাজারের বেশি অভিবাসীকে ফেরত পাঠিয়েছে সৌদি ◈ বিশ্বকা‌পে চমক দেখা‌নো কেপ ভার্দের ফুটবলাররা দেশে ফিরে বীরোচিত সংবর্ধনা পেলেন ◈ 'আমার মৃত্যুর পর আমার লাশ যেনো এফডিসিতে নেওয়া না হয়': রোজিনার বিস্ফোরক মন্তব্য ◈ মোটরসাইকেল নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে গাছে ধাক্কা, ৩ বন্ধুর মর্মান্তিক মৃত্যু

প্রকাশিত : ০৬ জুলাই, ২০২৬, ০৯:১০ সকাল
আপডেট : ০৬ জুলাই, ২০২৬, ১০:১৮ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আসল পরীক্ষা বাণিজ্য পুনর্গঠন: চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন

রাজনৈতিক টানাপোড়েনসহ নানা চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে আবার স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক। দুই বছর পর বাংলাদেশিদের জন্য আবার পর্যটন ভিসা দেওয়া শুরু করেছে প্রতিবেশী দেশটি।

তবে বিশ্লেষকদের মতে, ভারতের ‘সংবেদনশীল’ পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের কাছাকাছি বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের প্রতি আগ্রহকে ঘিরেই আসল পরীক্ষা হবে ঢাকা ও দিল্লির বাণিজ্যিক সম্পর্কের পুনর্গঠনের বিষয়টির।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে গত ৩ জুলাই প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন ভারত ও এশিয়ার ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করা বিমান মুখার্জী।

তার মতে, বাংলাদেশিদের জন্য পর্যটন ভিসা আবার চালু করার ভারতের সিদ্ধান্ত দুই দেশের মধ্যকার তিক্ত সম্পর্কের বরফ গলার সবচেয়ে স্পষ্ট লক্ষণ। কিন্তু বাণিজ্য স্বাভাবিককরণের এ পথে সম্পর্কের আসল পরীক্ষায় যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ ঘিরে চীনের আগ্রহের বিষয়টিও। বাংলাদেশে বিনিয়োগে চীনের আগ্রহ বাড়ছেই।

গণআন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ অগাস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অস্থিতিশীল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশে ভারতের ভিসা আবেদন কেন্দ্রগুলো অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা হয়।

পরে ওই মাসের মাঝামাঝি সময়ে সীমিত পরিসরে ভিসা আবেদনকেন্দ্র খুলে দেওয়া হয়েছিল। এরপর ১৬ অগাস্ট ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র রাণধীর জয়সওয়াল বলেন, পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত কেবল সীমিত পরিসরে জরুরি ও মেডিকেল ভিসা ইস্যু করবে ঢাকায় ভারতীয় হাই কমিশন।

এই সময়ে ভারতীয় ভিসাপ্রত্যাশী বাংলাদেশিরা ভোগান্তিতে পড়েন। ব্যবসার কাজে অনেকে ভারতে যেতে পারছিলেন না। মেডিকেল ভিসা সীমিত পরিসরে চালু থাকলেও ভিসা আবেদন জমা দেওয়ার অ্যাপয়েন্টমেন্ট মিলছিল না।

মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের দেড় বছরে সেই অচলাবস্থা আর কাটেনি। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বিএনপির নিরঙ্কুশ জয়ের পর দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলতে শুরু করে।

মে মাসের মাঝামাঝিতে খবর আসে, ভারত শিগগিরই বাংলাদেশিদের জন্য আবার পর্যটন ভিসা চালু করতে যাচ্ছে। এরও দেড় মাস পর ২৮ জুন থেকে পর্যটন ভিসা চালুর সুখবর দেন ঢাকায় ভারতের নতুন হাই কমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে বাংলাদেশের নতুন সরকার গত ফেব্রুয়ারিতে ভারতীয়দের জন্য তাদের নিজস্ব ভিসা পরিষেবা স্থগিতের সিদ্ধান্ত প্রত্যাহার করার পর থেকেই সম্পর্কের উন্নতি হতে শুরু করে। যদিও গণআন্দোলনের মুখে পদচ্যুত বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারতে উপস্থিতি এখনো কূটনৈতিক টানাপোড়েনের একটি অন্যতম উৎস হিসেবে রয়ে গেছে।

ভারতের ও পি জিন্দাল গ্লোবাল ইউনিভার্সিটির আন্তর্জাতিক সম্পর্কের অধ্যাপক শ্রীরধা দত্ত বলেন, “বাংলাদেশিদের জন্য ভারতের পর্যটন ভিসা মাত্র চালু হলো এবং আমি নিশ্চিত যে সীমান্ত বাণিজ্যের মত অন্যান্য বিষয়গুলোও ধীরে ধীরে শুরু হবে। এটি দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য এবং তৃতীয় কোনো দেশে বাংলাদেশের রপ্তানি, উভয় ক্ষেত্রের জন্যই ইতিবাচক বার্তা বহন করছে।”

খবরে বলা হয়, অন্যান্য দেশের বাজারে যাওয়ার পথে বাংলাদেশকে ভারতীয় স্থলবন্দর, কাস্টমস স্টেশন এবং বিমানবন্দর ব্যবহার করে পণ্য রপ্তানির যে ট্রানশিপমেন্ট সুবিধা দেওয়া হয়েছিল, ২০২৫ সালে দিল্লি তা প্রত্যাহার করে নেয়। এখন বাংলাদেশের নতুন সরকার ইঙ্গিত দিয়েছে, দেশের বিপর্যস্ত অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিত করতে তারা চীন এবং ভারত উভয়ের সঙ্গেই সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে একটি মধ্যপন্থা নীতি অনুসরণ করবে।

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান জুনে মালয়েশিয়া ও চীন সফর করেন। এ সফরের উদ্দেশ্য ছিল মালয়েশিয়ায় বাংলাদেশের কর্মীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো খাতে চীনা বিনিয়োগ নিশ্চিত করা।

অধ্যাপক শ্রীরধা দত্ত বলেন, “তারেক রহমানের সরকারের মূল লক্ষ্য হলো শিল্পায়ন গড়ে তোলা এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা। এটি তার জন্য একটি বড় বিষয় হিসেবে তুলে ধরা জরুরি। তিনি এখন এমন কোনো পক্ষের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করছেন, যারা বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে সাহায্য করতে পারে।”

বেইজিং সফরকালে তারেক রহমান বাংলাদেশে একটি চীনা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা এবং মংলা বন্দরের আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা করেছেন। এরইমধ্যে চীন মিয়ানমারের ভেতর দিয়ে বাংলাদেশকে যুক্ত করে একটি অর্থনৈতিক করিডোর প্রতিষ্ঠারও প্রস্তাব দিয়েছে।

বিশ্লেষকদের বরাতে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, চীনের এই করিডোরের প্রস্তাব শেষ পর্যন্ত বেইজিংকে বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে সরাসরি প্রবেশাধিকার এনে দিতে পারে। যে কারণে বাংলাদেশে চীনের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক পদচারণার দিকে কড়া নজর রাখছে ভারত। বিশেষ করে মংলা বন্দর এবং প্রস্তাবিত অর্থনৈতিক করিডোরের মত প্রকল্পগুলোর ওপর। কারণ এই করিডোর ও চীনের কিছু প্রকল্প ভারতের ‘চিকেনস নেক’ খ্যাত শিলিগুড়ি করিডোরের কাছাকাছি অবস্থিত।

তবে লন্ডনের একজন বিশ্লেষক প্রিয়জিৎ দেব সরকারের মতে, “বাংলাদেশের এই মুহূর্তে অর্থনৈতিক চাঙ্গাভাব কতটা জরুরি, তা বিবেচনা করে দিল্লির অস্বস্তি সত্ত্বেও তারেক রহমান তার পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে যেতে পারেন। তিনি নিজের বিকল্পগুলো বাড়ানোর চেষ্টা করছেন। কিন্তু তাকে এটি করতে হবে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে।”

বেইজিংয়ের দৃষ্টিভঙ্গির বিষয়ে অধ্যাপক শ্রীরধা দত্ত বলেন, “বাংলাদেশে কোন বিনিয়োগগুলো ভারতকে অস্বস্তিতে ফেলতে পারে সে সম্পর্কে চীন খুব ভালোই জানে। এই ধরনের বিষয় দিল্লির ক্ষোভ উসকে দিতে পারে। ফলে চীনও যেকোন পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে কিছুটা ‘দ্বিধায়’ ভুগতে পারে।”

ছয় বছর আগে ভারত ও চীনের সীমান্তে দুই দেশের সেনাদের প্রাণঘাতি সংঘর্ষের পর দীর্ঘদিন ধরে চলা উত্তেজনার অবসান ঘটিয়ে সম্প্রতি এ দুই দেশও আবার সম্পর্কোন্নয়নের চেষ্টা করছে বলে এ প্রতিবেদনে তুলে ধরা হয়।


ভারতের অশোকা ইউনিভার্সিটির রাষ্ট্র বিজ্ঞানের অধ্যাপক উদয় চন্দ্র বলেন, “চীন-বাংলাদেশ অর্থনৈতিক করিডোর উভয় দেশের স্বার্থই রক্ষা করবে। তবে এ করিডোর এখনো প্রস্তাব হিসেবেই রয়ে গেছে। বর্তমানে এটি কোনো সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনার চেয়ে এক ধরনের রাজনৈতিক সংকেত হিসেবে বেশি কাজ করছে।”

মিয়ানমারে চলমান গৃহযুদ্ধ ও অস্থিরতার প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, “সে দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় নিলে, অদূর ভবিষ্যতে এমন কোনো করিডোর গড়ে ওঠার সম্ভাবনা আমি দেখছি না। তা সত্ত্বেও, ভারতের জন্য এর স্পষ্ট প্রভাব রয়েছে। মূল উদ্বেগ হল- ভারতের পূর্ব সীমান্তে তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত প্রভাবের ধীরে ধীরে হ্রাস পাওয়া।”

চীনের সঙ্গে সম্পর্কিত বন্দর, পরিবহন নেটওয়ার্ক, শিল্প অঞ্চল এবং সম্ভাব্য ডিজিটাল ও নিরাপত্তা অবকাঠামো ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলকে ঘিরে থাকা ভূ-রাজনৈতিক দৃশ্যপটকে নতুন রূপ দিতে পারে বলেও মত তার।

উদয় চন্দ্র বলেন, “ভারত যদি বাংলাদেশকে একটি চীনকেন্দ্রিক অর্থনৈতিক ও কৌশলগত নেটওয়ার্কে অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে ঠেকাতে চায়, তাহলে তার জবাব হওয়া উচিত আরও উন্নত অর্থনীতি। ভারতকে অবশ্যই বাংলাদেশকে আরো ভালো বাণিজ্য শর্ত, সহজ ট্রানজিট এবং নির্ভরযোগ্য অবকাঠামোর সুবিধা দিতে হবে।”

বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়