শিরোনাম
◈ বিশ্বকা‌পে ফ্রান্সের বিরু‌দ্ধে ইতিহাস গড়তে চায় মরক্কো ◈ টানা ভারী বর্ষণে উখিয়ার রোহিঙ্গা ক্যাম্পে পাহাড় ধ্বস, একই পরিবারের তিনজন সহ সাতজনের মৃত্যু ◈ ওয়ানডে সিরিজের প্রথম ম‌্যা‌চে আজ বাংলা‌দেশ-জিম্বাবু‌য়ে মু‌খোমু‌খি  ◈ ‘ট্রাফিক পুলিশকে ফোন বা অনুরোধ নয়, মন্ত্রীদের সতর্ক করেছেন প্রধানমন্ত্রী’ ◈ বাংলাদেশ সীমান্তে ৩ থানা ও ৩ আউটপোস্ট গড়তে চায় ভারতের পুলিশ ◈ বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আসল পরীক্ষা বাণিজ্য পুনর্গঠন: চায়না মর্নিং পোস্টের প্রতিবেদন ◈ পেনাল্টি মিসের মাশুল, হলান্ডের জোড়া গোলে বিদায় ব্রাজিলের ◈ ১২ হাজারের বেশি অভিবাসীকে ফেরত পাঠিয়েছে সৌদি ◈ বিশ্বকা‌পে চমক দেখা‌নো কেপ ভার্দের ফুটবলাররা দেশে ফিরে বীরোচিত সংবর্ধনা পেলেন ◈ 'আমার মৃত্যুর পর আমার লাশ যেনো এফডিসিতে নেওয়া না হয়': রোজিনার বিস্ফোরক মন্তব্য

প্রকাশিত : ০৬ জুলাই, ২০২৬, ০৯:১৯ সকাল
আপডেট : ০৬ জুলাই, ২০২৬, ১০:২২ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

ট্রাম্পের ক্রিপ্টো কয়েনে বিনিয়োগ করে ৩৮১ কোটি ডলার হারিয়েছেন প্রায় ১০ লাখ মানুষ

ডিজিটাল মুদ্রা বা ক্রিপ্টোকারেন্সিতে বিনিয়োগ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের অনুসারীদের আর্থিক অবস্থা কেমন দাঁড়িয়েছে, তার একটি হালনাগাদ হিসাব প্রকাশ পেয়েছে। আর তাদের জন্য সামগ্রিক ফল অত্যন্ত বিপর্যয়কর।

ক্রিপ্টোকারেন্সি অ্যানালিটিক্স ফার্ম 'ন্যানসেন'-এর একটি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, চলতি বছরের জুন মাসের শেষ নাগাদ পর্যন্ত যারা প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের মেমকয়েন কিনেছিলেন, তাদের মধ্যে প্রায় ১০ লাখ মানুষ ব্যাপক লোকসানের মুখে পড়েছেন। এদের সম্মিলিত লোকসানের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮১ কোটি (৩.৮১ বিলিয়ন) ডলারে।

ট্রাম্পের বার্ষিক আর্থিক বিবরণী প্রকাশের পর এই মূল্যায়ন করেছে ন্যানসেন। বিবরণী অনুযায়ী, এই ক্রিপ্টো জুয়া থেকে ট্রাম্প নিজে তুলে নিয়েছেন ৬৩ কোটি ৬০ লাখ (৬৩৬ মিলিয়ন) ডলার। এছাড়া ২০২৫ সালে তার সব ধরনের ব্যবসায়িক উদ্যোগ থেকে তিনি মোট ২২০ কোটি (২.২ বিলিয়ন) ডলারের বেশি আয় করেছেন।

জয়ের পাল্লা সব সময়ই ট্রাম্পের পক্ষেই ছিল। মেমকয়েনের দাম বাড়ুক বা কমুক, ট্রাম্পের লাভ নিশ্চিত ছিল। কারণ যখনই কেউ এই টোকেন কেনাবেচা করত, তখনই ট্রাম্প একটি নির্দিষ্ট অংশ পেতেন। ট্রাম্প তার নিজস্ব সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম 'ট্রুথ সোশ্যাল'-এর মাধ্যমে ক্রমাগত তার অনুসারীদের এই টোকেনটি কেনার আহ্বান জানিয়েছিলেন।

এক সময় ক্রিপ্টোকারেন্সির ঘোর বিরোধী ট্রাম্প ২০২৪ সালে নির্বাচনী প্রচারণার সময় ডিজিটাল মুদ্রার এই লাভজনক বাজারকে আপন করে নেন। ট্রাম্প এবং তার ছেলেরা 'ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল' নামে একটি ক্রিপ্টো স্টার্টআপ প্রতিষ্ঠা করেন এবং 'ডাব্লিউএলএফআই' নামের একটি কয়েন বিক্রি শুরু করেন, যার মূল্যও বর্তমানে মারাত্মকভাবে ধসে পড়েছে।

অভিষেকের তিন দিন আগে ট্রাম্প তার দ্বিতীয় ক্রিপ্টো উদ্যোগ চালু করেন—যেটির নাম ছিল '$ট্রাম্প' মেমকয়েন। মূলত এটি ছিল এক ধরনের নতুন শখের মুদ্রা, যার কোনো ব্যবহারিক মূল্য নেই।

ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছিলেন, 'আমরা যা কিছুর পক্ষে লড়েছি, তা উদযাপনের সময় এসেছে: জয়! আমার বিশেষ ট্রাম্প কমিউনিটিতে যোগ দিন। এখনই আপনার $ট্রাম্প টোকেন সংগ্রহ করুন!' কিন্তু শেষ পর্যন্ত এটি অত্যন্ত ভুল পরামর্শ বলে প্রমাণিত হয়েছে।

ক্রিপ্টোর বেশির ভাগ লেনদেনই পাবলিক ডোমেইনে দেখা যায়, যা ব্লকচেইন নামক ডিজিটাল লেজারে রেকর্ড করা থাকে। এর ফলে বিশ্লেষকরা ওয়ালেট নামক ব্যক্তিগত ক্রিপ্টো অ্যাকাউন্ট থেকে কয়েন কেনার ইতিহাস সহজেই ট্র্যাক করতে পারেন। ন্যানসেনের তথ্য অনুযায়ী, জুন মাসের শেষ পর্যন্ত '$ট্রাম্প' মেমকয়েন কিনে লোকসান গুনেছেন এমন ওয়ালেটের সংখ্যা ৯ লাখ ৮৮ হাজার ৯০৫টি। অর্থাৎ প্রতি তিনজন ক্রেতার মধ্যে প্রায় দুই জনই লোকসানের শিকার হয়েছেন।

ন্যানসেন জানিয়েছে, এই ৯ লাখ ৮৮ হাজার ৯০৫টি ওয়ালেটের সম্মিলিত লোকসানের পরিমাণ ৩৮১ কোটি ডলার। এর মধ্যে এমন ক্রেতারাও আছেন যারা লোকসানের পরেও তাদের কয়েন বিক্রি না করে নিজের কাছে রেখে দিয়েছেন। গত শুক্রবার এই কয়েনটি লেনদেন হচ্ছিল মাত্র ১.৭৬ ডলারে, যা এর সর্বোচ্চ মূল্য ৭৫.৩৫ ডলার থেকে ৯৭ শতাংশ কম।

ক্ষতিগ্রস্তদের মধ্যে একজন নিকোলাস পিন্টো। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ট্রাম্পকে ভোট দেওয়া পিন্টো একজন নিয়মিত ক্রিপ্টো ব্যবসায়ী। তিনি জানান, তিনি '$ট্রাম্প' কয়েনে প্রায় ৫ লাখ ডলার বিনিয়োগ করেছিলেন এবং বর্তমানে তার অর্ধেকই খুইয়েছেন।

এক সাক্ষাৎকারে পিন্টো বলেন, 'জনগণের চোখে বিশ্বস্ত হয়ে ওঠার পর তিনি ডিজিটাল মুদ্রা চালু করতে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার অপব্যবহার করছেন। এটি অবিশ্বাস্য। এটি প্রায় একটি আইনি উপায়ের প্রতারণা।'

হোয়াইট হাউস অবশ্য এমন দাবি সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছে যে ট্রাম্প তার অনুসারীদের ঠকিয়ে নিজের পকেট ভারী করেছেন। ট্রাম্প হোয়াইট হাউসে আসার পর থেকে তার প্রশাসন এই শিল্পের ওপর থেকে নীতিগত তদারকি অনেকটাই শিথিল করেছে।

গত মঙ্গলবার ট্রাম্পের বার্ষিক আর্থিক প্রতিবেদন প্রকাশের পর হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র অ্যানা কেলি নিউ ইয়র্ক টাইমসকে এক বিবৃতিতে বলেন, 'প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প গর্বের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বিশ্বের ক্রিপ্টো রাজধানীতে পরিণত করেছেন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প এবং তার প্রশাসনের নেওয়া প্রতিটি পদক্ষেপ মার্কিন জনগণের সর্বোত্তম স্বার্থেই করা হয়েছে।'

তবে $ট্রাম্প মেমকয়েন উদ্যোগের কোনো প্রতিনিধি এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেননি। অন্যদিকে ওয়ার্ল্ড লিবার্টির মুখপাত্র ডেভিড ওয়াচম্যান 'ডাব্লিউএলএফআই'-এর দাম ধসে পড়ার পেছনে বিটকয়েন এবং অন্যান্য ক্রিপ্টোকারেন্সির সামগ্রিক বাজার ধসকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেন, 'বাজারের ওপর কারও নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ওয়ার্ল্ড লিবার্টি তাদের গভর্নেন্স টোকেন ডাব্লিউএলএফআই-এর পাশে রয়েছে, যা প্রথম দিন থেকেই তাদের ইকোসিস্টেমে ভূমিকা রাখছে।'

তবে ট্রাম্প একাই যে এই ডিল থেকে লাভবান হয়েছেন তা নয়। মেমকয়েনটি চালুর পর এর দাম ১ ডলার থেকে বেড়ে ৭০ ডলারের বেশি হয়ে যায়, যা কিছু ঝানু ক্রিপ্টো ব্যবসায়ীদের জন্য বড় মুনাফা হাতিয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করে দেয়।

এই অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীরা সাধারণত স্বয়ংক্রিয় প্রোগ্রাম বা বট ব্যবহার করে খুব দ্রুত ডিজিটাল মুদ্রা কিনে নেন। তারা জানেন যে মেমকয়েনগুলোর দাম খুব দ্রুত আকাশে ওঠে এবং তত দ্রুতই ধসে পড়ে। ফলে সাধারণ ও অপেশাদার বিনিয়োগকারীরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই অভিজ্ঞরা তাদের কয়েন চড়া দামে বিক্রি করে কেটে পড়েন।

ন্যানসেনের মতে, প্রায় ৫ লাখ ক্রিপ্টো ওয়ালেট $ট্রাম্প কয়েন থেকে মোট ৪০০ কোটি ডলার মুনাফা করেছে। তবে প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, 'এই সংখ্যাটি মূলত প্রমাণ করে যে কতিপয় প্রারম্ভিক ক্রেতা বিশাল লাভ নিয়ে চলে গেছেন, যেখানে সাধারণ খুচরা বিনিয়োগকারীদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বিশাল লোকসান সহ্য করেছে।'

ট্রাম্প এবং তার সহযোগীদের জন্য বিপুল মুনাফা এনে দেওয়া ক্রিপ্টো উদ্যোগগুলোর মধ্যে এই মেমকয়েন ছিল একটি।

ট্রাম্পের আর্থিক বিবরণী অনুযায়ী, গত বছর ওয়ার্ল্ড লিবার্টি থেকে তার মোট মুনাফা দাঁড়িয়েছিল ৭৯ কোটি ৯০ লাখ (৭৯৯ মিলিয়ন) ডলারে। এর মধ্যে শত শত মিলিয়ন ডলার এসেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে, যারা ২০২৫ সালের শুরুতে গোপনে কোম্পানির প্রায় অর্ধেক মালিকানা কিনে নিয়েছিল। এছাড়া নির্দিষ্ট কিছু খরচ বাদ দেওয়ার পর $ডব্লিউএলএফআই কয়েন বিক্রির লভ্যাংশের ৭৫ শতাংশ ট্রাম্পের কোম্পানির জন্য সংরক্ষিত ছিল। ফলে কয়েনটির দাম ধসে পড়লেও ট্রাম্পের লাভ কিন্তু নিশ্চিত ছিল।

তবে ওয়ার্ল্ড লিবার্টির কয়েনে সাধারণ বিনিয়োগকারীদের সঠিক লোকসানের হিসাব মেলানো কিছুটা জটিল। শুরুতে কোম্পানিটি সরাসরি বিনিয়োগকারীদের কাছে ০.০১৫ বা ০.০৫ ডলারে কয়েন বিক্রি করেছিল। যারা ০.০৫ ডলারে কিনেছিলেন তারা সামান্য লাভে আছেন। কিন্তু গত সেপ্টেম্বরের আগে এটি সাধারণ বাজারে বা এক্সচেঞ্জে লেনদেনের জন্য উন্মুক্ত ছিল না।

এক্সচেঞ্জের লেনদেনগুলো জনসমক্ষে ট্র্যাক করা কঠিন। তবে ন্যানসেন যে ২৬,৬৬৩টি ওয়ালেট ট্র্যাক করতে পেরেছে, তার মধ্যে ৮৫ শতাংশই লোকসানে রয়েছে। তাদের মোট লোকসানের পরিমাণ ৮ কোটি ৩০ লাখ ডলারের বিপরীতে লাভ হয়েছে মাত্র ২ কোটি ৩০ লাখ ডলার।

তবে এটি আসল লোকসানের একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র, কারণ এক্সচেঞ্জে লেনদেন করা অন্যান্য ক্রেতাদের তথ্য ন্যানসেনের কাছে নেই। বর্তমানে ওয়ার্ল্ড লিবার্টির এই কয়েনটি মাত্র ০.০৫৭ ডলারে লেনদেন হচ্ছে, যা গত সেপ্টেম্বরের মূল্যের চেয়ে ৮২ শতাংশ কম।

বাজারে কয়েনগুলোর দাম ধসে পড়লেও ট্রাম্পকে কোনো জবাবদিহিতার মুখে পড়তে হচ্ছে না। কারণ কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো ক্রিপ্টোকারেন্সি সংক্রান্ত নজরদারি বা আইনি প্রয়োগ প্রায় বন্ধ করে দিয়েছে।

নিউইয়র্ক বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন ও আইনি নীতি বিষয়ের অধ্যাপক স্টিফেন গিলার্স বলেন, ট্রাম্প এবং তাঁর সহযোগীরা শেষ পর্যন্ত প্রতারিত বিনিয়োগকারীদের পক্ষ থেকে একটি 'ক্লাস-অ্যাকশন' (যৌথ) মামলার মুখোমুখি হলে তিনি অবাক হবেন না। যদিও ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (এসইসি) ঘোষণা করেছে যে তারা মেমকয়েন নিয়ে আর কোনো চুলচেরা বিশ্লেষণ করবে না।

মেমকয়েনটির ওয়েবসাইটে অবশ্য আগেই সতর্ক করে দেওয়া হয়েছিল যে, এটিকে যেন বিনিয়োগের মাধ্যম হিসেবে না দেখা হয়। সেখানে লেখা ছিল, 'ট্রাম্প মেমস মূলত $ট্রাম্প চিহ্নের প্রতি সমর্থন এবং বিশ্বাসের প্রতীক হিসেবে কাজ করার জন্য তৈরি করা হয়েছে, এটি কোনো বিনিয়োগের সুযোগের বিষয় নয়।'

তবে গিলার্স বলেন, ট্রাম্পের অফিস ছাড়ার পর এই সতর্কবার্তাটি আইনি চ্যালেঞ্জ এড়ানোর জন্য যথেষ্ট নাও হতে পারে। গিলার্স আরও বলেন, 'ট্রাম্প যখন একজন রিয়েল এস্টেট ব্যবসায়ী ছিলেন, তখন তিনি নিজেই গর্ব করে বলতেন যে তিনি মানুষের কল্পনার জগত নিয়ে খেলতে ভালোবাসেন। এখানেও তিনি তাঁর সমর্থকদের বড়লোক হওয়ার স্বপ্ন দেখিয়ে বিনিয়োগ করতে উৎসাহিত করেছেন—ঠিক যখন তিনি নিজে কোটি কোটি ডলার ক্যাশ করে কেটে পড়ছিলেন।'

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়