দেশের সামগ্রিক রপ্তানি আয় কমলেও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে চীনের বাজারে বাংলাদেশের রপ্তানিতে বড় উল্লম্ফন হয়েছে। সদ্য বিদায়ী অর্থবছরে চীনে রপ্তানি বেড়ে ৮২১ মিলিয়ন মার্কিন ডলারে পৌঁছেছে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৮ দশমিক ২৪ শতাংশ বেশি।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) সূত্রে জানা যায়, গত পাঁচ অর্থবছরের মধ্যে এটিই সর্বোচ্চ রপ্তানি আয়। ২০২১-২২ অর্থবছরে যেখানে রপ্তানি ছিল ৬৮৩ মিলিয়ন ডলার, সেখানে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে ৮২১ মিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে। অর্থাৎ, পাঁচ বছরে মোট ১৩৮ মিলিয়ন ডলার বা ২০ দশমিক ১৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জিত হয়েছে।
২০২৫–২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট রপ্তানি আয় দাঁড়িয়েছে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা আগের অর্থবছরের ৪৮ দশমিক ২৮ বিলিয়ন ডলার থেকে ০ দশমিক ৫৮ শতাংশ কম।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের বাজারে তৈরি পোশাক, নিটওয়্যার, চামড়াজাত পণ্য, কৃষিপণ্য ও পাটজাত পণ্যের চাহিদা বৃদ্ধি, শুল্ক-সুবিধার কার্যকর ব্যবহার, উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধি ও নতুন ক্রেতা যুক্ত হওয়ায় এই প্রবৃদ্ধি সম্ভব হয়েছে। এছাড়া রপ্তানিকারকদের মানোন্নয়ন ও প্রতিযোগিতামূলক মূল্য নির্ধারণও ইতিবাচক ভূমিকা রেখেছে।
তবে চীনের বাজারের বিশাল আকার ও শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধার কথা বিবেচনা করলে বাংলাদেশের বর্তমান রপ্তানির পরিমাণ এখনো খুবই কম। ফলে এ বাজারে রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানোর জন্য রয়েছে বিপুল সম্ভাবনা ও সুযোগ।
দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য
বাংলাদেশ ব্যাংকের সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চীন থেকে বাংলাদেশ ১ হাজার ৮২০ কোটি ডলারের পণ্য আমদানি করেছে।
আর রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য বলছে, একই সময়ে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানির পরিমাণ ছিল মাত্র ৬৯ কোটি ৪৫ লাখ ডলার। ফলে দুই দেশের মধ্যে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭৫১ কোটি ডলারে।
চীনা বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের শতভাগ শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার রয়েছে। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে এ সুবিধা কার্যকর হয়। এর আগে ২০২০ সালে বাংলাদেশের ৯৭ শতাংশ পণ্য এ সুবিধার আওতায় ছিল।
বাংলাদেশের শিল্প ও উৎপাদন তথা কাঁচামালের অন্যতম প্রধান উৎস চীন। বিশেষ করে তৈরি পোশাক শিল্পে ব্যবহৃত ওভেন কাপড়, সুতা, রাসায়নিকসহ বিভিন্ন কাঁচামালের বড় অংশই আসে দেশটি থেকে।
এছাড়া শিল্পযন্ত্র আমদানির বড় অংশ ও নানাবিধ পণ্য আমদানি করা হয় চীন থেকে। দেশের মোট আমদানির ২৫ শতাংশেরও বেশি আসে দেশটি থেকে। তবে দেশটিতে বাংলাদেশের রপ্তানি খুবই কম এবং বিলিয়ন ডলারের নিচে।
রপ্তানি বৃদ্ধি ইতিবাচক সংকেত
বাংলাদেশ-চায়না চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (বিসিসিসিআই) সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম জাগো নিউজকে বলেন, চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে রপ্তানি বেড়ে প্রায় ৮২ কোটি ১০ লাখ ডলারে পৌঁছেছে, যা ইতিবাচক সংকেত দেয়।’
শুধু শুল্ক-সুবিধা পেলেই রপ্তানি বাড়ে না। চীনের বিভিন্ন প্রদেশে রোডশো, বাণিজ্য মেলা, ক্রেতা-বিক্রেতার সরাসরি (বি-টু-বি) বৈঠক ও পণ্যের সক্রিয় প্রচারণা চালাতে হবে।-বিসিসিসিআই সভাপতি মোহাম্মদ খোরশেদ আলম
তবে চীন থেকে বাংলাদেশের প্রায় ১৯ বিলিয়ন ডলারের আমদানির তুলনায় এই রপ্তানি এখনো খুবই সামান্য বলে মনে করেন তিনি।
চীন বাংলাদেশের জন্য শতভাগ শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা দিয়েছে উল্লেখ করে খোরশেদ আলম বলেন, ‘এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এই সুবিধার কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা। এজন্য চীনের বাজারে কোন পণ্যের চাহিদা রয়েছে, কোন খাতে বাংলাদেশ প্রতিযোগিতামূলক হতে পারে- এসব বিষয়ে নিয়মিত বাজার গবেষণা, ব্যবসায়িক জরিপ ও তথ্যভিত্তিক পরিকল্পনা প্রয়োজন।’
তার মতে, শুধু শুল্ক-সুবিধা পেলেই রপ্তানি বাড়ে না। চীনের বিভিন্ন প্রদেশে রোডশো, বাণিজ্য মেলা, ক্রেতা-বিক্রেতার সরাসরি (বি-টু-বি) বৈঠক ও পণ্যের সক্রিয় প্রচারণা চালাতে হবে।
‘মেড ইন বাংলাদেশ’ ব্র্যান্ডকে চীনা ভোক্তাদের কাছে পরিচিত করতে দীর্ঘমেয়াদি বিপণন কৌশল গ্রহণেরও তাগিদ দেন তিনি।
বিসিসিসিআই সভাপতি জানান, বিসিসিসিআই চীনের বিভিন্ন শহরে ‘মেড ইন বাংলাদেশ’ নামে স্থায়ী প্রদর্শনী ও বিক্রয়কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দিয়েছে। এসব কেন্দ্রের মাধ্যমে বিভিন্ন বাংলাদেশি পণ্যের বাজার যাচাই, ক্রেতাদের পছন্দ বোঝা ও সম্ভাবনাময় পণ্য শনাক্ত করা সহজ হবে।
খোরশেদ আলম বলেন, সরকার ও বেসরকারি খাত সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে চীনে বাংলাদেশের রপ্তানি অন্তত ১ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করা সম্ভব।
‘রপ্তানি ঝুড়ি এখনো বৈচিত্র্যপূর্ণ নয়’
এই প্রবৃদ্ধি বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বার্তা হলেও এটিকে স্থায়ী করতে হবে। শুধু তৈরি পোশাকের ওপর নির্ভর না করে উচ্চ মূল্য সংযোজিত পণ্য, কৃষি-প্রক্রিয়াজাত পণ্য, ওষুধ ও প্রকৌশল পণ্যের রপ্তানি বাড়ানোর ওপর জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে চীনের বাজারে ভোক্তাদের চাহিদা অনুযায়ী নতুন পণ্য উন্নয়ন ও ব্র্যান্ডিং কার্যক্রম জোরদার করা প্রয়োজন।
চীনের মতো বিশাল বাজারে বাং