মনিরুল ইসলাম: দেশীয় চলচ্চিত্রের দীর্ঘদিনের সংকট কাটিয়ে উঠতে প্রযোজনা, পরিবেশনা ও প্রদর্শনব্যবস্থায় সংস্কার, সরকারি অনুদানের স্বচ্ছ নীতিমালা, করপোরেট বিনিয়োগ এবং নতুন আয়ের উৎস তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। একই সঙ্গে দক্ষ চিত্রনাট্যকার ও সৃজনশীল পরিচালক তৈরি, আধুনিক স্টুডিও নির্মাণ, বক্স অফিসের নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ এবং আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের সিনেমা পৌঁছে দেওয়ার প্রস্তাবও উঠে এসেছে।
আজ মঙ্গলবার ২৭ অক্টোবর রাজধানীর চলচ্চিত্র ও প্রকাশনা অধিদপ্তরে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির আয়োজনে ‘আমাদের চলচ্চিত্রে সংকট, করণীয় ও গণমাধ্যমের ভূমিকা’ শীর্ষক সেমিনারে এসব প্রস্তাব তুলে ধরেন নির্মাতা, প্রযোজক, পরিবেশক, প্রদর্শক ও গণমাধ্যমকর্মীরা।
বক্তারা বলেন, দেশীয় চলচ্চিত্রশিল্পের সংকট কেবল ভালো সিনেমা নির্মাণের অভাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে দুর্বল বাণিজ্যিক পরিকল্পনা, প্রেক্ষাগৃহের সীমাবদ্ধতা, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা, নীতিমালার দুর্বলতা এবং চলচ্চিত্রের আয়-ব্যয়ের স্বচ্ছ হিসাবের অভাব। এসব সমস্যার সমাধানে বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের পরিবর্তে পুরো চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।
দুপুর ২টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র পরিচালক সমিতির সভাপতি শাহীন সুমন। বিশেষ অতিথি ছিলেন চলচ্চিত্রের ১৯ সংগঠনের আহবায়ক হেলাল খান। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন পরিচালক সমিতির মহাসচিব শাহীন কবির টুটুল, উপমহাসচিব কবিরুল ইসলাম রানা, বরেণ্য নির্মাতা কাজী হায়াৎ, ছটকু আহমেদ, শাহ আলম কিরণ, হাবিবুল ইসলাম হাবীব, মতিন রহমান, জাকির হোসেন রাজু, রায়হান মুজিব, ওয়াকিল আহমেদ, সায়মন তারিক, বন্ধন বিশ্বাস, সালাহউদ্দিন লাভলু, অমিতাভ রেজা, হিমেল আশরাফ, আরশাদ আদনান, শাহরিয়ার শাকিল, শাহরিয়ার নাজিম জয়, খোরশেদ আলম খসরু, আওলাদ হোসেন উজ্জ্বলসহ চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেকে।
চিত্র নায়ক হেলাল খান বলেন, বর্তমান সরকার চলচ্চিত্রবান্ধব সরকার। চলচ্চিত্রের উন্নয়ন যা যা করার তাই করবে। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টা চলচ্চিত্রের ব্যাপারে খুবই আগ্রহী। তথ্য উপদেষ্টা চলচ্চিত্রের বিষয়ে মনিটরিং এর দায়িত্বে রয়েছেন। তার সাথে আমাদের বৈঠক হয়েছে। তিনি একজন চলচ্চিত্রপ্রেমি। তার সাথে আমরা আবার বসে আজকে সেমিনারে যেসব মতামত উঠে আসবে তা একটি প্রতিনিধি দলের মাধ্যমে তুলে ধরা হবে।
তিনি বলেন, কবীরপুরে ফিল্ম সিটির জায়গা রয়েছে একে কি ভাবে চলচ্চিত্রের কাজে লাগানো যায় তা নিয়েও আমরা আলোচনা করতে পারি। এদেশের ১৮ কোটি মানুষ চলচ্চিত্রের প্রতি তাদের ভালোবাসা আছে। তারা হলে গিয়ে, মোবাইলে, ওটিটিতে চলচ্চিত্র দেখেন। আমাদের ভালো গল্প নির্ভর চলচ্চিত্র নির্মাণ করতে হবে যাতে সিনেমা দর্শকরা হলমুখী হন আবার। তিনি ঘোষণা দেন আগামী ২০ ডিসেম্বর জাঁকজমকপূর্ণ ভাবে তিনি একটি নতুন সিনেমার মহরত করবেন।
চলচ্চিত্রের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে করপোরেট প্রতিষ্ঠান
সেমিনারে স্বাগত বক্তব্যে পরিচালক সমিতির মহাসচিব শাহীন কবির টুটুল বলেন, দেশের বেসরকারি ব্র্যান্ড ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে চলচ্চিত্রের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে হবে। চলচ্চিত্রে বেসরকারি বিনিয়োগ বাড়াতে পারলে নির্মাণের পরিধি ও মান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হবে।
পরিচালক সমিতির সভাপতি শাহীন সুমন ভারতের মালয়ালম চলচ্চিত্রশিল্পের উদাহরণ টেনে বলেন, ভারতের আঞ্চলিক চলচ্চিত্রশিল্প যদি নিজেদের অবস্থান শক্ত করতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ কেন পারবে না? এ জন্য প্রয়োজন পরিকল্পিত উদ্যোগ ও সংশ্লিষ্ট সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা।
তিনি বলেন, কবিরপুরে ফিল্ম সিটির জন্য সরকারের বিশাল জায়গা রয়েছে। সেই জায়গাকে চলচ্চিত্রের উন্নয়নে কীভাবে কাজে লাগানো যায়, তা নিয়ে আট থেকে দশজনের একটি প্রতিনিধিদলের সরকারের সঙ্গে বসা উচিত।
তিনি চলচ্চিত্র নির্মাণের অবকাঠামো গড়ে তোলার পাশাপাশি সেগুলোর কার্যকর ব্যবহার, প্রশিক্ষণ এবং নিয়মিত প্রযোজনা নিশ্চিত করার ওপর জোরদেন।
শুধু বড় বাজেট নয়, প্রয়োজন সব ধরনের সিনেমা
বর্ষীয়ান নির্মাতা মতিন রহমান চলচ্চিত্রে সৃজনশীল পরিচালক ও চিত্রনাট্যকারের সংকটের কথা তুলে ধরেন। তাঁর মতে, বাণিজ্যিক ও শৈল্পিক—দুই ধারার সিনেমাই নির্মাণ করতে হবে। শুধু বড় বাজেটের চলচ্চিত্র নয়, স্বল্প ও মাঝারি বাজেটের ছবির জন্যও উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি বলেন, চলচ্চিত্রশিল্পের সবাই অবকাঠামো নির্মাণ নিয়ে ব্যস্ত থাকলেও পুরো ইকোসিস্টেম বা সামগ্রিক ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করা জরুরি। কারণ, সিনেমা নির্মাণের পাশাপাশি সেটি দর্শকের কাছে পৌঁছানো, প্রদর্শন এবং বিনিয়োগের অর্থ ফেরত পাওয়ার ব্যবস্থাও শক্তিশালী হওয়া প্রয়োজন।
চলচ্চিত্রের প্রযোজক এবং ভার্সেটাইল মিডিয়ার কর্ণধার আরশাদ আদনানও নতুন নির্মাতা ও শিল্পী তৈরির ওপর গুরুত্ব দেন। তিনি বলেন, সৃজনশীলতার অভাবে নতুন পরিচালক ও শিল্পীদের যথাযথভাবে সামনে আনা যাচ্ছে না।
তাঁর মতে, চলচ্চিত্রে বিনিয়োগ ও করব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোর আগ্রহ বাড়বে। একই সঙ্গে বিদ্যমান নীতিমালার দুর্বলতা দূর করা প্রয়োজন। প্রযোজক ও হলমালিকদেরও একসঙ্গে কাজ করতে হবে।
তারকানির্ভরতা কমিয়ে বাড়াতে হবে ঝুঁকি নেওয়ার মানসিকতা
নির্মাতা সালাহউদ্দিন লাভলু মনে করেন, এক-দুজন তারকার ওপর নির্ভর করে একটি চলচ্চিত্রশিল্প টিকে থাকতে পারে না। আগে অনেক জনপ্রিয় নায়ক-নায়িকা ছিলেন। অথচ এখন ১৫ থেকে ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত একটি চলচ্চিত্রও এক-দুজন শিল্পীকে কেন্দ্র করে তৈরি করার প্রবণতা দেখা যায়।
এ ধরনের তারকানির্ভরতা থেকে বেরিয়ে এসে নতুন শিল্পী তৈরি এবং বৈচিত্র্যময় গল্পের চলচ্চিত্র নির্মাণের ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
অভিনেতা ও নির্মাতা শাহরিয়ার নাজিম জয় বলেন, ইউটিউবকেন্দ্রিক নাটকের বাজেট একসময় দুই-তিন লাখ টাকা থাকলেও এখন তা ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত পৌঁছেছে। নাটকের নির্মাতারা দর্শকের চাহিদা বুঝে কাজ করেছেন বলেই এ পরিবর্তন সম্ভব হয়েছে। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্টদেরও দর্শকের রুচি ও চাহিদা বুঝে পরিকল্পনা করতে হবে।
শাকিব খানের মতো তারকা তৈরি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আরেকজন শাকিব খান তৈরি করতে হলে সেই পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ, ঝুঁকি গ্রহণ এবং ভালো সিনেমা নির্মাণ করতে হবে। কম বাজেটে সিনেমা বানিয়ে তাঁর বিকল্প তৈরি করা সম্ভব নয়।
সিনেমা হলের বিকল্প হতে পারে শিল্পকলা একাডেমি ও কমিউনিটি সেন্টার
দেশে প্রেক্ষাগৃহের সংকট মোকাবিলায় বিকল্প প্রদর্শনব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রস্তাব দেন নির্মাতা মতিন রহমান। তাঁর মতে, সারা দেশের শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তন ও কমিউনিটি সেন্টারগুলোকে পরিকল্পিতভাবে সিনেমা প্রদর্শনের কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে।
এসব স্থানে তুলনামূলক কম খরচে চলচ্চিত্র প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা গেলে দর্শকের কাছে দেশীয় সিনেমা পৌঁছানোর সুযোগ বাড়বে। একই সঙ্গে নতুন দর্শক তৈরির ক্ষেত্রও প্রসারিত হবে।
চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জ্বল বলেন, ভালো সিনেমা তৈরি হলে ভালো প্রেক্ষাগৃহও তৈরি হবে। অর্থাৎ প্রদর্শনব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি দর্শক আকৃষ্ট করার মতো মানসম্পন্ন চলচ্চিত্র নির্মাণ জরুরি।
তবে সেমিনারে উঠে আসা প্রস্তাবগুলোর বাস্তবায়নে বিদ্যমান অবকাঠামো, বিনিয়োগের সক্ষমতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে প্রদর্শনের উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ।
প্রেক্ষাগৃহের আয় ভাগাভাগিতে ন্যায্যতা প্রয়োজন
আলফা আইয়ের কর্ণধার শাহরিয়ার শাকিল চলচ্চিত্রের জন্য সঠিক বাণিজ্যিক পরিকল্পনার ওপর জোর দেন। তাঁর মতে, একটি সিনেমার আয়ের জন্য একাধিক উৎস তৈরি করতে হবে। পাশাপাশি নীতিমালা স্পষ্ট ও কার্যকর করা গেলে চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং প্রেক্ষাগৃহ স্থাপনে বিনিয়োগ বাড়তে পারে।
স্টার সিনেপ্লেক্সের সঙ্গে আয় ভাগাভাগির অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি জানান, আগে প্রতিষ্ঠানটি প্রযোজকদের ১৭ থেকে ১৮ শতাংশের বেশি শেয়ার দিত না। পরে কয়েকজন মিলে আলোচনার মাধ্যমে প্রথম দুই সপ্তাহের জন্য সেই অংশ ৩০ শতাংশে উন্নীত করা হয়েছিল।
এ অভিজ্ঞতার উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো আলোচনায় বসলে অনেক সমস্যার সমাধান সম্ভব। প্রযোজক, পরিবেশক ও প্রদর্শকদের মধ্যে পারস্পরিক সমঝোতা এবং আয়ের ন্যায্য বণ্টন চলচ্চিত্রের বাণিজ্যিক ভিত্তি শক্তিশালী করতে পারে।
বর্ষীয়ান নির্মাতা কাজী হায়াৎও অতীতের প্রেক্ষাগৃহে চলচ্চিত্র প্রদর্শন ও আয় ভাগাভাগির ব্যবস্থা নিয়ে কথা বলেন। তিনি সরকারি অনুদানে নির্মিত প্রথম চলচ্চিত্র ‘সূর্যদীঘল বাড়ি’র অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, সে সময় প্রেক্ষাগৃহের খরচ বাদ দিয়ে অবশিষ্ট অর্থ থেকে প্রযোজকের প্রাপ্য অংশ দেওয়া হতো। এই ব্যবস্থার কারণে বলাকা হলে ছবিটির প্রিন্ট আটকে পড়েছিল।
পরে সাপ্তাহিক বিচিত্রায় একজন সাংবাদিক ছবিটির সমালোচনা লিখলে দর্শকের আগ্রহ বাড়ে। এরপর রাজশাহীর একটি হলে এবং পরে আবার ঢাকায় ছবিটি মুক্তি পায়। কাজী হায়াতের এই অভিজ্ঞতা চলচ্চিত্রের প্রচার, সমালোচনা এবং দর্শক তৈরিতে গণমাধ্যমের ভূমিকার গুরুত্ব তুলে ধরে।
সরকারি অনুদানে ধাপে ধাপে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব
সরকারি অনুদানের প্রক্রিয়া নিয়ে নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন নির্মাতা অমিতাভ রেজা। তিনি বলেন, অনুদান প্রদানের নীতিমালা আরও স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কয়েক ধাপে অর্থ দেওয়ার প্রস্তাব দেন তিনি।
তাঁর প্রস্তাব অনুযায়ী, প্রথম ধাপে চিত্রনাট্য উন্নয়নের জন্য সর্বোচ্চ পাঁচ লাখ টাকার স্ক্রিপ্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড দেওয়া যেতে পারে। পরবর্তী ধাপে দেওয়া হবে প্রোডাকশন ফান্ড এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের শেষ পর্যায়ে পোস্ট-প্রোডাকশন ফান্ড।
নির্মাতা হিমেল আশরাফও চিত্রনাট্যকারের সংকটের কথা তুলে ধরে বলেন, প্রতিটি কাজ করতে গিয়ে তাঁকে এই সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। তাঁর মতে, সিনিয়র শিল্পীদের কাজে যুক্ত করা এবং চলচ্চিত্র নির্মাণের উপযোগী পরিবেশ তৈরি করাও জরুরি।
আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে পৌঁছাতে হবে দেশীয় সিনেমা
চলচ্চিত্র প্রযোজক-পরিবেশক সমিতির সাবেক সভাপতি খোরশেদ আলম খসরু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রকে অ্যামাজন ও নেটফ্লিক্সের মতো আন্তর্জাতিক স্ট্রিমিং প্ল্যাটফর্মে পৌঁছে দেওয়ার উপায় খুঁজে বের করার আহ্বান জানান।
বিশ্বব্যাপী ডিজিটাল দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারলে দেশীয় চলচ্চিত্রের প্রচার ও আয়ের নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে এ জন্য চলচ্চিত্রের মান, আন্তর্জাতিক বাজারের উপযোগিতা, স্বত্ব ব্যবস্থাপনা এবং বিপণন পরিকল্পনার ওপরও গুরুত্ব দিতে হবে।
সিনিয়র চিত্র সম্পাদক ফজলে হক বলেন, আশির দশকে তো চলচ্চিত্রের জন্য সরকারী অনুদানের প্রয়োজন ছিলো না। চলচ্চিত্র একটি ব্যবসা। একে ব্যবসায়িকভাবে দেখতে হবে। ভালো চলচ্চিত্র ছাড়া দর্শককে সিনেমা হলে ফেরানো যাবে না। তিনি গোলাপী এখন ট্রেনে সিনেমার কথা তুলে ধরে বলেন সরকারীভাবে এই ছবিটি পরিবেশনার দায়িত্ব পালন করে। এ সিনেমা থেকে একটি টাকাও পাওয়া যায়নি। সরকার পরিবেশনার দায়িত্ব নিলে এ ব্যবসা শেষ হয়ে যাবে।।চলচ্চিত্র ব্যবসাকে স্বাধীন ভাবে ব্যবসা করতে দিতে হবে। তা হলেই চলচ্চিত্রের উন্নয়ন সম্ভব।
সিনিয়র সাংবাদিক মনিরুল ইসলাম বলেন, গণমাধ্যম আর চলচ্চিত্র একে অপরের পরিপূরক। বিনোদন সাংবাদিকরা সবসময় চলচ্চিত্রের পক্ষে ছিলো। আছে। থাকবে। চলচ্চিত্রের লোকজনকে ঐক্যবদ্ধ ভাবে চলচ্চিত্র সংকটে ভূমিকা রাখতে হবে। এখন সাংবাদিকতার ধরন বদলে গেছে। ইউটিউব। মাল্টিমিডিয়া তাদের মতো করে ভাইরাল কনন্টেন প্রচার করে ভিউ বানিজ্যের জন্য। চলচ্চিত্রের লোকজনও মুখিয়ে থাকে ভাইরাল হতে। যা মনে চায় তাই বুম দেখলেই বলতে থাকে। এ থেকে বের হয়ে আসতে হবে।
চলচ্চিত্র সাংবাদিক তুষার আদিত্য সরকারী অনুদান নিয়ে কথা বলেন। সরকারী অনুদানের টাকা যাকে তাকে না দিয়ে মূলধারার চলচ্চিত্রকে দিলে চলচ্চিত্রের উন্নয়ন হবে। টাকা দেন খোঁজ নেওয়া হয় না টাকার কি হচ্ছে। সিনেমার কি হচ্ছে।
চলচ্চিত্র সাংবাদিক সৈকত সালাউদ্দিন বলেন, বক্স অফিসের তথ্য প্রকাশের বিষয়টি পরিচালক ও প্রযোজকদের সদিচ্ছার ওপর নির্ভরশীল। চলচ্চিত্রের ব্যবসার নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশ করা গেলে বিনিয়োগকারী, নির্মাতা ও দর্শক—সবার জন্যই তা সহায়ক হবে।
চলচ্চিত্র সাংবাদিক নাজমুল আলম রানা চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর মধ্যে ঐক্যের অভাবের কথা উল্লেখ করেন। তাঁর মতে, পরিচালক, প্রযোজক ও প্রদর্শকদের মধ্যে সমন্বয় বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সময়োপযোগী চলচ্চিত্র নির্মাণ এবং শিল্পীদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করাও জরুরি।
সংকট উত্তরণে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
সেমিনারে উঠে আসা বক্তব্য ও প্রস্তাবগুলো থেকে স্পষ্ট, দেশীয় চলচ্চিত্রের সংকট কাটাতে শুধু সরকারি অনুদান কিংবা প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণ যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন মানসম্মত চিত্রনাট্য, দক্ষ নির্মাতা ও শিল্পী তৈরি, স্বচ্ছ বিনিয়োগ, ন্যায্য আয় বণ্টন, বিকল্প প্রদর্শনব্যবস্থা এবং কার্যকর বিপণন কৌশল।
একই সঙ্গে গণমাধ্যমকে চলচ্চিত্রের প্রচার, গঠনমূলক সমালোচনা এবং ব্যবসাসংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য প্রকাশে আরও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে হবে। চলচ্চিত্রসংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলোর পারস্পরিক সহযোগিতা এবং সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগের সমন্বয়ও জরুরি।
সংশ্লিষ্টদের প্রস্তাবগুলো বাস্তবায়িত হলে দেশীয় চলচ্চিত্রের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলতে পারে। তবে এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নির্ভর করবে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা, দায়িত্ব বণ্টন, বিনিয়োগ এবং বাস্তবায়নের ধারাবাহিকতার ওপর।
সেমিনারে আরও বক্তব্য দেন প্রযোজক ও পরিচালক মো. ইকবাল, পরিচালক জাকির হোসেন রাজু ও ছটকু আহমেদ, রায়হান মুজিব, মুশফিকুর রহমান গুলজার, হাবিবুল ইসলাম হাবিব, আবু মুসা দেবু, ওয়াকিল আহমেদ, সাংবাদিক আহমেদ তেপান্তর, জয়সহ চলচ্চিত্র অঙ্গনের অনেকে।