মনিরুল ইসলাম : বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পে দীর্ঘদিনের সংকট কাটছে না। সিনেমা নির্মাণ, প্রেক্ষাগৃহে মুক্তি, দর্শক উপস্থিতি এবং ব্যবসায়িক সাফল্য—প্রতিটি ক্ষেত্রেই রয়েছে নানা চ্যালেঞ্জ। এর মধ্যে ২০২৬ সালের ১৪ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে মুক্তিপ্রাপ্ত সিনেমার সংখ্যা প্রায় ২৫টি বলে উল্লেখ করা হচ্ছে। বছরের বাকি সময়েও নতুন সিনেমা মুক্তির সম্ভাবনা থাকলেও চলচ্চিত্রের বাজারে প্রত্যাশিত গতি ফেরেনি।
এমন পরিস্থিতিতে দেশের সিনেমা হল টিকিয়ে রাখতে ভারতীয় সিনেমা আমদানির ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন বাংলাদেশ চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জ্বল। অন্যদিকে, তথ্য কমপ্লেক্সে সিনেপ্লেক্স স্থাপনের পরিকল্পনা এবং সরকারি অনুদানের সিনেমায় ২ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের বিষয়টিও চলচ্চিত্র অঙ্গনে আলোচনায় এসেছে। তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী (এমপি) এর সাথে সিনেমা হল মালিক সমিতির এক বৈঠকে এসব কথা উঠে এসেছে।তবে এসব উদ্যোগের চূড়ান্ত নীতিমালা, বাস্তবায়নের সময়সীমা ও অর্থ বরাদ্দের বিষয়গুলো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন বলে মনে করেন হল মালিকরা্
সিনেমার খরা, বিপাকে হল মালিকেরা
বাংলাদেশের সিনেমা হলের সংকট নতুন নয়। একসময় দেশের বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা শহরে বিপুলসংখ্যক একক পর্দার সিনেমা হল চালু ছিল। সময়ের সঙ্গে অনেক হল বন্ধ হয়ে গেছে। যেসব হল এখনো চালু রয়েছে, সেগুলোর অনেকগুলোই দর্শকসংকট, পরিচালন ব্যয় এবং নিয়মিত ভালো সিনেমার অভাবে লোকসানের মুখে পড়ছে।
চলচ্চিত্র প্রদর্শক সমিতির সভাপতি আওলাদ হোসেন উজ্জ্বল বিভিন্ন সময়ে সিনেমা হলের সংকট নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, শুধু দেশীয় সিনেমার ওপর নির্ভর করে বর্তমান পরিস্থিতিতে হল ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। এ কারণে বিদেশি সিনেমা আমদানির অনুমতি এবং হল পরিচালনায় সহায়ক নীতিমালার দাবি জানিয়েছেন প্রদর্শকেরা।
২০২৬ সালের জুনে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে উজ্জ্বল বিদেশি সিনেমা আমদানির পাশাপাশি ই-টিকিটিং ব্যবস্থা চালু এবং চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশনে (বিএফডিসি) কেন্দ্রীয় সার্ভার স্থাপনের প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তাঁর মতে, এসব উদ্যোগ চলচ্চিত্রের ব্যবসায় স্বচ্ছতা বাড়াতে এবং প্রযোজকদের স্বার্থ সুরক্ষায় সহায়ক হতে পারে।
ভারতীয় সিনেমা আমদানিতে কেন আগ্রহী হল মালিকেরা?
বাংলাদেশের সিনেমা হলগুলোতে সারা বছর সমানভাবে দর্শক আসে না। সাধারণত ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে বড় বাজেটের সিনেমা মুক্তি পেলে দর্শক উপস্থিতি বাড়ে। কিন্তু উৎসবের বাইরে অনেক সিনেমা প্রত্যাশিত দর্শক পায় না। ফলে বছরের দীর্ঘ সময় হল পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়ে।
এ পরিস্থিতিতে ভারতীয় সিনেমা আমদানিকে সম্ভাব্য ব্যবসায়িক সমাধান হিসেবে দেখছেন হল মালিকদের একটি অংশ। তাঁদের যুক্তি, পরিচিত তারকা, বড় বাজেট, প্রচারণা এবং উন্নত নির্মাণশৈলীর কারণে ভারতীয় কিছু সিনেমা বাংলাদেশের দর্শকের আগ্রহ তৈরি করতে পারে। এসব সিনেমা প্রদর্শনের সুযোগ থাকলে হলের প্রদর্শনীসংখ্যা বাড়ানো এবং দর্শক টানার নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে।
২০২৩ সালে দীর্ঘদিনের বিরতির পর বাংলাদেশে ভারতীয় হিন্দি সিনেমা প্রদর্শনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। তবে অনুমতি পাওয়ার পরও আমদানি, পরিবেশনা ও প্রদর্শন নিয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা আলোচনা হয়েছে।
প্রদর্শক সমিতির পক্ষ থেকে ভারতীয় সিনেমা আমদানির পক্ষে যুক্তি তুলে ধরে বলা হচ্ছে, দেশীয় সিনেমার পাশাপাশি বিদেশি সিনেমার জন্যও প্রেক্ষাগৃহে জায়গা থাকা প্রয়োজন। এতে দর্শকের সামনে বিকল্প বাড়বে এবং হল মালিকদের ব্যবসা সচল রাখার সুযোগ তৈরি হতে পারে।
তবে ভারতীয় সিনেমা আমদানির পক্ষে যুক্তি থাকলেও এর বিপরীতে দেশীয় চলচ্চিত্রের বাজার ও নির্মাতাদের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নটিও গুরুত্বপূর্ণ। আমদানির নীতিমালা এমন হওয়া প্রয়োজন, যাতে হল মালিকেরা ব্যবসার সুযোগ পান, আবার বাংলাদেশের সিনেমাও পর্যাপ্ত প্রদর্শনী ও প্রচারণার সুযোগ থেকে বঞ্চিত না হয়।
শুধু সিনেমা আমদানি কি সংকটের সমাধান?
চলচ্চিত্রশিল্পের সংকটের পেছনে রয়েছে একাধিক কারণ। সিনেমা হলের সংখ্যা কমে যাওয়া, নিয়মিত মানসম্মত সিনেমার অভাব, দুর্বল বিপণন, প্রযোজনা ব্যয়, দর্শকের রুচির পরিবর্তন এবং প্রেক্ষাগৃহের সুযোগ-সুবিধার সীমাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল হয়েছে।
এ অবস্থায় ভারতীয় সিনেমা আমদানি হলে কিছু হল সাময়িকভাবে ব্যবসায়িক সুবিধা পেতে পারে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদে দেশীয় চলচ্চিত্রশিল্পকে শক্তিশালী করতে হলে বাংলাদেশি সিনেমার নির্মাণমান, গল্প, বিপণন ও প্রদর্শনব্যবস্থার উন্নয়নও জরুরি।
একই সঙ্গে সিনেমা হলের আধুনিকায়ন, অনলাইন টিকিট বিক্রি, দর্শক জরিপ, স্বচ্ছ আয়-ব্যয়ের হিসাব এবং প্রযোজক-প্রদর্শকদের মধ্যে ন্যায্য রাজস্ব বণ্টনের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের জুলাইয়ে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনেও নতুন সিনেমার অভাব এবং হলের স্থবিরতা নিয়ে প্রদর্শকদের উদ্বেগ উঠে আসে। সেখানে বছরের বিভিন্ন সময়ে সিনেমা মুক্তির অনিয়মিত প্রবাহকে হল ব্যবসার অন্যতম সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়।
তথ্য কমপ্লেক্সে সিনেপ্লেক্স স্থাপনের পরিকল্পনা
চলচ্চিত্র প্রদর্শনের পরিসর বাড়ানোর পাশাপাশি আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ। এ ক্ষেত্রে তথ্য কমপ্লেক্সে সিনেপ্লেক্স স্থাপনের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে তা দর্শকদের জন্য নতুন সুযোগ তৈরি করতে পারে।
সিনেপ্লেক্স সাধারণত আধুনিক পর্দা, উন্নত শব্দব্যবস্থা, আরামদায়ক আসন এবং উন্নত পরিবেশে সিনেমা দেখার সুযোগ দেয়। ফলে দর্শকদের একটি অংশের কাছে এসব প্রেক্ষাগৃহ আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে।
তবে তথ্য কমপ্লেক্সে সিনেপ্লেক্স স্থাপনের পরিকল্পনার সুনির্দিষ্ট অবস্থান, পর্দার সংখ্যা, নির্মাণব্যয়, বাস্তবায়নের সময়সীমা এবং পরিচালনব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত সরকারি তথ্য যাচাই করা প্রয়োজন। পরিকল্পনাটি বাস্তবায়িত হলে সেখানে দেশীয় সিনেমার নিয়মিত প্রদর্শন নিশ্চিত করা এবং নতুন নির্মাতাদের কাজ দর্শকের সামনে তুলে ধরার সুযোগ রাখা গুরুত্বপূর্ণ হবে।
আধুনিক প্রেক্ষাগৃহের সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বন্ধ হয়ে যাওয়া সিনেমা হল পুনরায় চালু করা এবং চালু হলগুলোর সংস্কারেও উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ, শুধু বড় শহরে সিনেপ্লেক্স বাড়লে দেশের সব শ্রেণির দর্শকের কাছে সিনেমা পৌঁছানোর সমস্যা পুরোপুরি দূর হবে না।
সরকারি অনুদানের সিনেমায় ২ থেকে ৫ কোটি টাকা?
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পে সরকারি অনুদান দীর্ঘদিন ধরেই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। বিশেষ করে নির্মাণব্যয় বহন করতে অক্ষম নির্মাতা, বিকল্পধারার চলচ্চিত্র এবং শিল্পসম্মত সিনেমা তৈরির ক্ষেত্রে এ অনুদান সহায়ক হতে পারে।
চলচ্চিত্রশিল্পের উন্নয়নে সরকারি অনুদানের পরিমাণ বাড়ানোর বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। ২০২৬ সালের ১৬ মে তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন জানিয়েছিলেন, আগামী অর্থবছরের বাজেটে চলচ্চিত্রে অনুদানের পরিমাণ বাড়ানোর প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি অনুদান দ্রুত ছাড় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিনেমা নির্মাণ শেষ করার জন্য কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও তিনি জানান।
এদিকে, অনুদানের সিনেমায় ২ থেকে ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত অর্থায়নের বিষয়টি আলোচনায় এলেও এই অঙ্ককে চূড়ান্ত সরকারি বরাদ্দ হিসেবে ধরে নেওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রজ্ঞাপন বা আনুষ্ঠানিক ঘোষণা যাচাই করা জরুরি।
অনুদানের পরিমাণ বাড়ানোর উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে বড় পরিসরে সিনেমা নির্মাণ, উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহার, দক্ষ কলাকুশলী নিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক মানের নির্মাণে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি হতে পারে। তবে অর্থ বরাদ্দের পাশাপাশি প্রকল্প নির্বাচন, অর্থ ছাড়, নির্মাণের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ এবং সিনেমা মুক্তির বিষয়েও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
অনুদানের সিনেমা হলে পৌঁছানোও জরুরি
সরকারি অর্থায়নে সিনেমা নির্মিত হলেও তা দর্শকের কাছে পৌঁছাতে না পারলে অনুদানের প্রত্যাশিত সুফল পাওয়া কঠিন। তাই শুধু নির্মাণে অর্থায়ন নয়, সিনেমার প্রচার, পরিবেশনা এবং প্রেক্ষাগৃহে প্রদর্শনের ব্যবস্থাও গুরুত্বপূর্ণ।
অনুদানের সিনেমার ক্ষেত্রে কয়েকটি বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পেতে পারে—
- স্বচ্ছ নির্বাচন: যোগ্যতা, চিত্রনাট্যের মান, নির্মাণপরিকল্পনা ও সম্ভাব্য দর্শক বিবেচনায় প্রকল্প নির্বাচন।
- সময়মতো অর্থ ছাড়: অর্থ ছাড়ে দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে নির্ধারিত সময়ে নির্মাণ শেষ করার সুযোগ।
- জবাবদিহি: বরাদ্দ করা অর্থের যথাযথ ব্যবহার এবং নির্মাণের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ।
- প্রদর্শনের নিশ্চয়তা: নির্মিত সিনেমা যেন প্রেক্ষাগৃহ, চলচ্চিত্র উৎসব ও বৈধ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে দর্শকের কাছে পৌঁছাতে পারে, সেই ব্যবস্থা।
- বাণিজ্যিক ও শিল্পসম্মত সিনেমার ভারসাম্য: নতুন নির্মাতা, বিকল্পধারার চলচ্চিত্র এবং দর্শকপ্রিয় সিনেমার জন্য উপযোগী সহায়তার ব্যবস্থা।
এভাবে অনুদান ব্যবস্থাকে কার্যকর করা গেলে সরকারি অর্থায়নের সুফল নির্মাতা ও দর্শক—উভয় পক্ষের কাছেই পৌঁছানোর সম্ভাবনা বাড়বে।
চলচ্চিত্রশিল্প বাঁচাতে সমন্বিত উদ্যোগের প্রয়োজন
বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের বর্তমান পরিস্থিতিতে ভারতীয় সিনেমা আমদানি, সিনেপ্লেক্স স্থাপন এবং সরকারি অনুদান বাড়ানোর আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব উদ্যোগের কোনোটিই এককভাবে পুরো সংকটের সমাধান করতে পারবে না।
সিনেমা হল মালিকদের ব্যবসায়িক নিরাপত্তা, দেশীয় প্রযোজকদের ন্যায্য সুযোগ, মানসম্মত সিনেমা নির্মাণ এবং দর্শক তৈরির উদ্যোগকে একই পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে।
বিদেশি সিনেমা আমদানির ক্ষেত্রে ভারসাম্যপূর্ণ নীতিমালা, দেশীয় সিনেমার জন্য পর্যাপ্ত প্রদর্শনী, প্রেক্ষাগৃহ আধুনিকায়নে সহায়তা এবং অনুদানের অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা গেলে শিল্পটির ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা বাড়তে পারে।
২০২৬ সালের বাকি সময় এবং আগামী বছর বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখন দেখার বিষয়, সিনেমা হল মালিকদের দাবি, আধুনিক প্রেক্ষাগৃহ নির্মাণের পরিকল্পনা এবং সরকারি অনুদান বাড়ানোর উদ্যোগ কতটা বাস্তবায়িত হয়। এসব উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে ঘোষণার পাশাপাশি কার্যকর নীতিমালা, সময়মতো বাস্তবায়ন এবং চলচ্চিত্রশিল্পের সব পক্ষের মধ্যে সমন্বয়ের ওপর।