মনিরুল ইসলাম : বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে নতুন করে বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকে কেন্দ্র করে ওঠা ‘গণহত্যা সমর্থন’-এর অভিযোগ। এ অভিযোগে চলচ্চিত্র ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনের ৫০ জন অভিনেতা-অভিনেত্রীদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে বাংলাদেশ চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতি ও বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন (বিএফডিসি)-এর কাছে লিখিত আবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।
আজ মঙ্গলবার ২৮ জুলাই ‘রাষ্ট্রসংলাপ ফোরাম’-এর পক্ষে কেন্দ্রীয় সদস্য সচিব আ ন ম আয়াস এ আবেদন জমা দেন। একই দিন সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেন চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির নবনির্বাচিত সভাপতি চিত্রনায়ক শিবা সানু।
আজ মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চলচ্চিত্র শিল্পী সমিতির সভাপতি শিবা সানুর সাথে যোগাযোগ করা হলে বলেন, আমরা চিঠিটি পেয়েছি। আমিই তা গ্রহণ করেছি।
তিনি জানান, আমরা বিষয়টি দেখব। আমাদের সমিতির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী ব্যবস্থা নিব। আমাদের গঠনতন্ত্রে আছে কেউ আদালতকৃত সাজাপ্রাপ্ত হলে তার সদস্যপদ এমনিতেই বাতিল হয়ে যায়। জুলাই গণঅভ্যুত্থান নিয়ে যেহেতু অভিযোগ তা খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
চিঠিতে বলা হয়, ২০২৪ সালে গণঅভ্যুত্থানকালে স্বৈরাচারের গণহত্যার পক্ষে অবস্থানকারী অভিনেতা-অভিনেত্রীদের শিল্পী সমিতি ও বিএফডিসিতে নিষিদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন।আবেদনে প্রায় ৫০ জন অভিনেতা, অভিনেত্রী, নির্মাতা, প্রযোজক ও সাংস্কৃতিক কর্মীর নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বলা হয়, ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। আপনি নিজেও ছাত্র-জনতার সঙ্গে রাজপথে নেমে এসেছিলেন এবং ফ্যাসিবাদী আমলে নিপীরিত হয়েছেন। ওই সময় ছাত্র-জনতার ওপর সংঘটিত গণহত্যা এবং বিগত ফ্যাসিবাদী আমলে এদেশের জনগণের ওপর নির্যাতন-নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের পক্ষে যেসব পরিচালক, অভিনেতা-অভিনেত্রীরা ভূমিকা রেখেছেন, তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ অতীৰ জরুরি। যাতে ভবিষ্যতে কেউ স্বৈরাচারের দোসর হওয়ার আগে বারবার চিন্তা করে।
এমন প্রেক্ষাপটে চলচ্চিত্র অঙ্গনের কতিপয় অভিনেতা-অভিনেত্রী ২০২৪ সালে গণহত্যার পক্ষে প্রকাশ্য বক্তব্য, প্রচারণা বা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সে সময়ের দমন-পীড়নকে সমর্থন করেছেন বা বিতর্কিত ভূমিকা পালন করেছেন। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে হিটলারের পক্ষে অবস্থানকারী অভিনেতা-অভিনেত্রীদের যেভাবে জার্মানিতে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, একইভাবে বাংলাদেশে এই গণহত্যার পক্ষে অবস্থানকারীদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞামূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব বলে আমরা মনে করি।
গণহত্যার পক্ষ অবলম্বনকারী অভিনেতা-অভিনেত্রীদের তালিকা:
১। ফেরদৌস আহমেদ (তৎকালীন ঢাকা-১০ আসনের সংসদ সদস্য ও চিত্রনায়ক)
২। মেহের আফরোজ শাওন (অভিনেত্রী ও নির্মাতা, সংরক্ষিত আসনের মনোনয়নপ্রত্যাশী)
৩। রিয়াজ আহমেদ (চিত্রনায়ক)
৪। অরুণা বিশ্বাস (অভিনেত্রী)
৫। শমী কায়সার (নাট্যব্যক্তিত্ব)
৬। রোকেয়া প্রাচী (অভিনেত্রী ও নির্দেশক)
৭। মাহিয়া মাহি (চিত্রনায়িকা ও উপ-নির্বাচনে প্রার্থী হতে চাওয়া নেত্রী)
৮। নিপুণ আক্তার (চিত্রনায়িকা)
৯। তানভীন সুইটি (অভিনেত্রী)
১০। সুদি হক (নাট্যব্যক্তিত্ব)
১১। জ্যোতিকা জ্যোতি (অভিনেত্রী)
১২। সাজু খাদেম (অভিনেতা)
১৩। সোহানা সাবা (অভিনেত্রী)
১৪। পিয়া জান্নাতুল (মডেল ও আইনজীবী)
১৫। শামীমা তুষ্টি (অভিনেত্রী ও বঙ্গবন্ধু সাংস্কৃতিক জোটের নেত্রী)
১৬। জিনাত সানু স্বাগতা (অভিনেত্রী)
১৭। আশনা হাবীব ভাবনা (অভিনেত্রী)
১৮। সাইমন সাদিক (চিত্রনায়ক)
১৯। জায়েদ খান (চিত্রনায়ক ও নির্বাচনী প্রচারণাকারী)
২০। সুজাতা আজিম (অভিনেত্রী)
২১। জায়েদ খান (চিত্রনায়ক ও নির্বাচনী প্রচারণাকারী)
২২। আজিজুল হাকিম (অভিনেতা)
২৩। চন্দন রেজা (অভিনেতা)
২৪। আসাদুজ্জামান নূর (প্রবীণ অভিনেতা ও সাবেক সংস্কৃতিমন্ত্রী)
২৫। মারিয়া কিসপট্টা (মডেল)
২৬। খোরশেদ আলম খসরু (প্রযোজক)
২৭। তারানা হালিম (অভিনেত্রী)
২৮। প্রযোজক আলিমুল্লাহ খোকন
২৯। সংগীতশিল্পী-পরিচালক এসডি রুবেল
৩০। পরিচালক হাবিবুল ইসলাম হাবিব
৩১। বজলুর রাশেদ চৌধুরী
৩২। এস.এ হক অলীফ (নির্মাতা)
৩৩। মোস্তাফিজুর রহমান মানিক
৩৪। স্বাধীন খসরু
৩৫। বদরুল আনাম সৌদ (নাট্য নির্মাতা ও লেখক)
৩৬। মিলন ভট্টাচার্য (আন্দোলনপন্থী সাধারণ শিল্পীদের ফেসবুক পোস্টের স্ক্রিনশট গ্রুপে শেয়ার করে নজরদারির চেষ্টা করেছিলেন)
৩৭। উর্মিলা শ্রাবন্তী কর (অভিনেত্রী)
৩৮। সিদ্দিকুর রহমান (টেলিভিশন অভিনেতা, আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশী)
৩৯। আবদুল্লাহ রানা
৪০। বিজরী বরকতউল্লাহ
৪১। সুবর্ণা মুস্তাফা
৪২। লিয়াকত আলী লাকী
৪৪। মিলন ভট্টাচার্য (অভিনেতা)
৪৫। দীপাঞ্জিতা মার্টিন (অভিনেত্রী)
৪৬। মামুনুর রশিদ
৪৭। মোহাম্মদ শাহাদাত হোসেন (অভিনেতা)
৪৮। লিমন আহমেদ (বিনোদন সাংবাদিক)
৪৯। খান জেহাদ (সাংবাদিক ও সংস্কৃতিকর্মী)
৫০। শম্পা রেজা (অভিনেত্রী)
চিঠিতে আরও বলা হয়, আমরা বিশ্বাস করি, শিল্প ও সংস্কৃতি সমাজে ন্যায়বিচার, মানবিক মূল্যবোধ এবং গণতান্ত্রিক চেতনা বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তাই যে সকল শিল্পী, পরিচালক এবং বিনোদন সাংবাদিক গণহত্যার পক্ষ নিয়েছেন, তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার কোনো বিকল্প নেই।
চিঠিতে আমাদের ৩ দফা দাবি তুলে ধরা হয়। দাবি ৩ টি হলো,
১। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানকালে গণহত্যার পক্ষ অবলম্বনকারীদের বিরুদ্ধে তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষ প্রমাণিত হলে শিল্পী সমিতি ও বিএফডিসি থেকে নিষিদ্ধ করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে হস্তান্তরপূর্বক সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
২। ভবিষ্যতে শিল্পীদের মানবাধিকার লঙ্ঘন, সহিংসতা বা গণতান্ত্রিক মূল্যবোধবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া প্রতিরোধে স্থায়ী নীতিমালা প্রণয়ন করতে হবে।
৩। শিল্পী সমিতিকে মানবাধিকার, পেশাগত নৈতিকতা এবং সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতা রক্ষায় সুস্পষ্ট অবস্থান গ্রহণ করতে হবে।সভাপতি, আমরা আশা করি বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবেন।