কাগজে-কলমে এটা ছিল কেবলই আরেকটা নিখোঁজ সংক্রান্ত অভিযোগ; কিন্তু বাস্তবে এটা ছিল মুম্বাইয়ের অন্যতম শিহরণ জাগানো এক হত্যাকাণ্ডের কাহিনীর সূচনা—যার কেন্দ্রে ছিলেন একজন টিভি ইনসাইডার (কাস্টিং ডিরেক্টর), এক আশাবাদী অভিনেত্রী এবং সন্দেহের বশে উন্মাদ হয়ে ওঠা এক নৌ কর্মকর্তা।
২০০৮ সালের মে মাসে টেলিভিশন এক্সিকিউটিভ ও কাস্টিং ডিরেক্টর নীরজ গ্রোভার যখন ফোন ধরা বন্ধ করে দেন, তখন তার চিন্তিত পরিবার পুলিশের দ্বারস্থ হয়। তাদের সন্দেহ ছিল, নীরজের নিখোঁজ হওয়ার পেছনে এক নারী বন্ধুর হাত থাকতে পারে।
সেই নারী ছিলেন মারিয়া সুসাইরাজ— একজন উদীয়মান অভিনেত্রী, যাকে মুম্বাইতে কাজের সুযোগ পেতে সাহায্য করছিলেন নীরজ। তিনি তদন্তকারীদের জানান যে, অন্ধেরিতে একটি পার্টিতে যোগ দেওয়ার জন্য নীরজ রাত ১২টার দিকে মালাডে তার অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে চলে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যাননি।
তদন্তকারীদের মতে, নীরজ ততক্ষণে মারা গেছেন। তার শরীর টুকরো টুকরো করে কেটে ব্যাগে ভরা হয়, মুম্বাইয়ের বাইরে গাড়িতে করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং একটি জঙ্গলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। প্রথম দর্শনে যা কেবলই এক নিখোঁজ হওয়ার কেস বলে মনে হয়েছিল, তা শেষ পর্যন্ত রূপ নেয় সন্দেহের বশে সংঘটিত এক হত্যাকাণ্ডে; যার পরপরই ঘটেছিল অপরাধের প্রায় প্রতিটি চিহ্ন মুছে ফেলার এক মরিয়া চেষ্টা।
নীরজ গ্রোভার মুম্বাইভিত্তিক প্রযোজনা সংস্থা ‘সিনার্জি অ্যাডল্যাবস’-এ কাজ করতেন। বন্ধু ও সহকর্মীরা তাকে এমন একজন মানুষ হিসেবে চিনতেন, যিনি প্রায়শই বিনোদন জগতে নতুন আসা তরুণ-তরুণীদের পথ দেখাতে সাহায্য করতেন।
মারিয়া সুসাইরাজও ছিলেন তেমনই একজন। কন্নড় সিনেমার ছোটখাটো এই অভিনেত্রী টিভিতে কাজ করার চেষ্টা করছিলেন, আর নীরজ তার জন্য অডিশনের ব্যবস্থা করে এবং ইন্ডাস্ট্রিতে পরিচিতি তৈরি করতে সাহায্য করছিলেন বলে জানা যায়।
মারিয়ার সঙ্গে কোচিতে কর্মরত ভারতীয় নৌবাহিনীর কর্মকর্তা লেফট্যানেন্ট এমিল জেরোম ম্যাথিউয়ের সম্পর্ক ছিল। তারা বিয়ে করার পরিকল্পনা করছিলেন বলে জানা যায়।
তদন্তকারীদের মতে, মারিয়া জেরোমকে জানিয়েছিলেন যে নীরজ তাকে পছন্দ করতেন, যদিও মারিয়ার মনে তেমন কোনও অনুভূতি ছিল না। ২০০৮ সালের মে মাসের শুরুর দিকে নীরজ মারিয়াকে মুম্বাইয়ের মালাড এলাকায় একটি ভাড়া ফ্ল্যাটে উঠতে সাহায্য করছিলেন।
৬ মে রাতে তিনি মারিয়াকে ঘর গোছাতে সাহায্য করার জন্য ফ্ল্যাটে আসেন। সেদিন গভীর রাতে জেরোম মারিয়াকে ফোন করেন এবং পেছনে একজন পুরুষের কণ্ঠ শুনতে পান বলে জানান। মারিয়া তাকে বলেন, নীরজ সেখানে আছেন এবং রাতের খাবারের পর চলে যাবেন।
কিন্তু নীরজ সে রাতে সেখানেই থেকে যান।
এতে মারিয়াকে না জানিয়ে জেরোম কোচি থেকে মুম্বাইয়ের ফ্লাইট ধরেন। ৭ মে সকাল আনুমানিক সাড়ে ৭টায় ফ্ল্যাটের কলিং বেল বেজে ওঠে।
মারিয়া পরে স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমি দরজায় জেরোমকে দেখতে পাই। সে সরাসরি ঘরের ভেতরে ঢুকে পড়ে এবং আমি তার পেছনে পেছনে যাই। নীরজও ঘুম থেকে জেগে ওঠে।
প্রসিকিউশনের মতে, জেরোম শোবার ঘরে ঢুকে সেখানে নীরজকে দেখতে পান। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সংঘাত শুরু হয়ে যায়।
মারিয়া তার স্বীকারোক্তিতে অভিযোগ করেন, এমিল নীরজের ওপর ক্রমাগত ঘুসি চালাতে থাকে। দুই জনই একে অপরের সঙ্গে মারামারিতে জড়িয়ে পড়ে। আমি তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি।
তিনি আরও দাবি করেন, আমি দেখি যে জেরোম আমার রান্নাঘরের ছুরি দিয়ে নীরজকে আঘাত করছে। আমি ছুরিটি ধরার চেষ্টা করি। এতে আমার ডান হাতের তালুতে আঘাত লাগে।
প্রসিকিউশন অভিযোগ করে যে, মারামারির সময় জেরোম নীরজকে একের পর এক ছুরিকাঘাত করে হত্যা করেন।
মারিয়া আরও অভিযোগ করেন যে, জেরোম তাকে ভয় দেখান, বিছানায় ছুড়ে ফেলেন এবং ছুরি উঁচিয়ে তাকে ধর্ষণ করেন। মারিয়ার আত্মপক্ষ সমর্থনের দল পরে যুক্তি দেয় যে, তিনি ছিলেন ‘পরিস্থিতির শিকার’ এবং ভয়ের মুখে পড়ে কাজ করেছিলেন।
তবে নীরজের মৃত্যুর পর কয়েক ঘণ্টার মধ্যে যা ঘটেছিল, তা দুই জনের বিরুদ্ধেই মামলার মূল কেন্দ্রে পরিণত হয়।
হত্যাকাণ্ডের পর কেনাকাটা: তদন্তকারীদের অভিযোগ, হত্যাকাণ্ডের পর সকালের শেষের দিকে জেরোমের নির্দেশে মারিয়া কেনাকাটা করতে যান। সেই কেনাকাটার তালিকাটি সাধারণ ছিল না: ব্যাগ, পর্দা, বিছানার চাদর, রুম ফ্রেশনার এবং আরেকটি ছুরি।
মারিয়া তার স্বীকারোক্তিতে বলেন, সেদিন বেলা ১১টার পর জেরোম নীরজের লাশ টেনে বাথরুমে নিয়ে যায়। এরপর সে আমাকে ব্যাগ, পর্দা, একটি ছুরি এবং কিছু রুম ফ্রেশনার কিনতে বলে। ফিরে আসার পর জেরোম তাকে বাথরুম থেকে দূরে থাকতে এবং রক্তে ভেজা হলঘর পরিষ্কার করতে বলেছিলেন বলে মারিয়া দাবি করেন।
তদন্তকারীদের অভিযোগ, ততক্ষণে নীরজের দেহ খণ্ড-বিখণ্ড করা হয়ে গিয়েছিল।
মারিয়া তার বন্ধু কিরণ শ্রেয়াসের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং একটি হুন্দাই স্যান্ট্রো গাড়ি চেয়ে নেন। তিনি ও জেরোম গাড়িটি সংগ্রহ করেন এবং একটি পেট্রোল পাম্পে থামেন; সেখান থেকে জেরোম পাঁচটি প্লাস্টিকের ক্যান ও পাঁচ লিটার পেট্রোল কেনেন।
মারিয়া স্বীকারোক্তিতে বলেন, সে দেহের সবকটি টুকরো দুটি বড় ব্যাগে ভরে গাড়ির ভেতর রাখে। সে আমাকে গাড়ি চালাতে বলে।
পুলিশের মতে, তারা মানোরের দিকে গাড়ি চালিয়ে যান এবং আমগাঁও গ্রামের কাছে একটি জঙ্গলের কাঁচা রাস্তা ধরেন। জেরোম ব্যাগগুলো নামিয়ে তার ওপর পেট্রোল ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন বলে অভিযোগ।
এরপর তারা মারিয়ার ফ্ল্যাটে ফিরে আসেন, যেখানে রক্তের অবশিষ্ট দাগ মুছে ফেলার চেষ্টা করা হয় বলে তদন্তকারীরা জানান।
কয়েক বছর ধরে খবরে দাবি করা হয়েছিল যে, নীরজের দেহ ৩০০ টুকরো করা হয়েছিল। বিচারিক আদালত পরে এই দাবিটিকে ‘রেকর্ডে থাকা তথ্যের সত্যতা থেকে অনেক দূরে’ বলে নাকচ করে দেন এবং মন্তব্য করেন যে এটি অনর্থক জনমনে ক্ষোভ উসকে দিয়েছিল।
তবে আদালতে প্রমাণিত সত্যগুলোও যথেষ্ট ভয়াবহ ছিল।
যে ফোন কল সত্য উন্মোচন করেছিল: নীরজকে গুম করে ফেলার চেষ্টাটি বেশ বিস্তৃত হলেও এটি নিখুঁত ছিল না। সবচেয়ে বড় সূত্রগুলোর একটি এসেছিল নীরজের মোবাইল ফোন থেকে। মানোরের দিকে যাওয়ার সময় মারিয়া অসাবধানতাবশত ফোনটিতে আসা একটি কল রিসিভ করেন। তিনি প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন, কিন্তু তদন্তকারীরা ফোনটির অবস্থান ট্রেস করে ফেলেন।
ফোনটি দাদারের ধারেকাছেও ছিল না, যেখানে মারিয়া কেনাকাটা করছিলেন বলে দাবি করেছিলেন।
মারিয়া পুলিশকে ধার করা স্যান্ট্রো গাড়িটি সম্পর্কেও প্রথমে ভুয়া তথ্য দিয়েছিলেন। তিনি দাবি করেন যে এটি জেরোমের বন্ধু জিতেশের, কিন্তু তদন্তকারীরা জানতে পারেন যে জিতেশ নৌবাহিনীর ডিউটিতে দূরে ছিলেন। পরে মারিয়া স্বীকার করেন যে গাড়িটি তার বন্ধু কিরণের।
অন্য একটি ঘটনায় নীরজের এক বন্ধু তার নম্বরে ফোন করেন। মারিয়া নাকি ফোন ধরে দাবি করেন, নীরজ ফোন না নিয়েই বাইরে গেছেন।
তদন্তকারীরা এটাও দেখতে পান যে, ৭ মে থেকে ২০ মে-র মধ্যে জেরোম মারিয়াকে প্রায় ১,০০০ বার ফোন করেছিলেন। এই ফোন কল, গাড়ি এবং মোবাইল ফোনের অবস্থান—সব মিলিয়ে তাদের সাজানো গল্পটি ভেঙে পড়তে শুরু করে।
প্রায় ১০ দিন ধরে তদন্তকারীদের বিভ্রান্ত করার পর মারিয়া মালাড ফ্ল্যাটের ভেতরে আসলে কী ঘটেছিল তা প্রকাশ করেন।
আমি একটি মিথ্যা বিবৃতি দিয়েছিলাম: মারিয়া দাবি করেন, জেরোম তাঁকে হত্যা করে নিজে আত্মহত্যা করার হুমকি দিয়েছিলেন বলেই তিনি চুপ ছিলেন।
তিনি জানান, নীরজ নিখোঁজ হওয়ার পর তার বন্ধুরা মারিয়াকে তাদের সঙ্গে পুলিশ স্টেশনে যেতে বলেছিলেন।
‘আমি তাঁদের সাথে মালাড পুলিশ স্টেশনে যাই। জেরোমের নির্দেশ মতো আমি একটি মিথ্যা বিবৃতি দিই,’ তিনি বলেন।
‘পুরোটা সময় সে আমাকে পুলিশকে কিছু না বলার জন্য হুমকি দিচ্ছিল; নয়তো সে আমাকে মেরে ফেলবে এবং নিজেকেও শেষ করে দেবে। আমি বলছি যে জেরোম আমার চোখের সামনেই নীরজকে হত্যা করেছে।’
তবে তদন্ত প্রক্রিয়া সমালোচনা এড়াতে পারেনি। হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত ছুরিটি একটি ময়লার ফেলার পাইপে ফেলে দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হলেও তা সঙ্গে সঙ্গেই উদ্ধার করা যায়নি। নৌবাহিনীর প্রশিক্ষণের জন্য মুম্বাই আসার যে দাবি জেরোম করেছিলেন, পুলিশ তা সঙ্গে সঙ্গে যাচাই করতেও ব্যর্থ হয়।
তদন্তকারীরা নাকি মারিয়ার ফ্ল্যাটের ভেতরের একটি সদ্য রঙ করা দেয়ালের বিষয়টিও অনুচ্ছিক বা খেয়াল না করে এড়িয়ে গিয়েছিলেন। প্রসিকিউশন পরে অভিযোগ করে যে, রক্তের দাগ ঢাকতেই দেয়ালটি রঙ করা হয়েছিল।
রায় নীরজের পরিবারকে ক্ষুব্ধ করেছিল: ২০১১ সালের জুলাইয়ে, নীরজ খুন হওয়ার তিন বছরেরও বেশি সময় পর, মুম্বাই সেশনস কোর্ট রায় ঘোষণা করেন।
মারিয়াকে খুনের অভিযোগ থেকে খালাস দেওয়া হয়, তবে প্রমাণ লোপাটের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তাকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়— যা বিচার চলাকালীন তিনি ইতিমধ্যেই হাজতে কাটিয়েছিলেন এবং রায়ের পরপরই তিনি মুক্তি পান।
জেরোমকে অনিচ্ছাকৃত হত্যা এবং প্রমাণ লোপাটের দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়। তিনি খুনের জন্য ১০ বছর এবং প্রমাণ লোপাটের জন্য ৩ বছরের কারাদণ্ড পান, দুটি সাজাই একসঙ্গে চলার নির্দেশ দেওয়া হয়।
জেরোম কেন খুনের জন্য দোষী সাব্যস্ত হননি, তার ব্যাখ্যায় বিচারক এন. ডব্লিউ. চান্দওয়ানি পর্যবেক্ষণ করেন, তিনি যখন ঘরে প্রবেশ করেন তখন শান্ত ছিলেন। এটি থেকে প্রমাণিত হয় যে তার হত্যার কোনও উদ্দেশ্য ছিল না। স্পষ্টতই, একজন বাগদত্তার জন্য, তিনি যখন তার সঙ্গীর সঙ্গে কোনও অপরিচিত পুরুষকে দেখতে পান, তা যেকোনও বিচক্ষণ মানুষকে উত্তেজিত করবে এবং সে নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারাবে।
আদালত জেরোম ও মারিয়া উভয়কেই নীরজের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৫০,০০০ টাকা করে দেওয়ার নির্দেশ দেন।
এই রায় সারা দেশে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি করে। অনেকেই বিশ্বাস করতেন যে, অপরাধের নৃশংসতা বা প্রমাণ ধ্বংস করার প্রচেষ্টার পরিমাণের সঙ্গে এই শাস্তি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না। নীরজের পরিবার বলেছিল, তারা বিচার পায়নি।