শীতের আগমনি বার্তা নিয়ে প্রতিবছর সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি থেকেই জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) আসতে শুরু করে পরিযায়ী পাখি। একসময় ক্যাম্পাসের বিভিন্ন লেক পাখির কলকাকলিতে মুখর থাকলেও সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই চিত্র পাল্টে গেছে। লেক ভরাট, কচুরিপানা ও আগাছার অবাধ বিস্তার, জলাশয় দূষণ এবং মানুষের অতিরিক্ত আনাগোনার কারণে ক্রমেই সংকুচিত হয়ে পড়ছে পাখিদের আবাসস্থল। ফলে আগের তুলনায় তাদের বিচরণও অনেকটাই কমেছে। যদিও কিছু লেক পরিষ্কার ও জলজ পরিবেশ পুনরুদ্ধারের উদ্যোগে চলতি অক্টোবরে কয়েকশ পরিযায়ী পাখির দেখা মিলেছে, তবুও অধিকাংশ জলাশয়ে এখনো পাখিদের জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি হয়নি।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা যায়, ক্যাম্পাসে ছোট-বড় প্রায় ডজনখানেক লেক রয়েছে। এর মধ্যে গত কয়েক বছর ধরে মাত্র ছয়টি লেকে নিয়মিত পরিযায়ী পাখির বিচরণ দেখা গেছে। লেকগুলো হলো— ওয়াইল্ডলাইফ রেসকিউ সেন্টারের (ডব্লিউআরসি) ভেতরের লেক, সুইমিংপুল-সংলগ্ন লেক, পুরাতন ও নতুন রেজিস্ট্রার ভবনের পেছনের লেক, বোটানিক্যাল গার্ডেনের ভেতরের লেক এবং পরিবহন চত্বরের পেছনের লেক।
সাধারণত পাখি আসার মৌসুমের শুরুতেই এসব লেক পরিষ্কার করে তাদের চলাচল ও খাবার সংগ্রহের উপযোগী করা হয়। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের সচেতন করতে লেকের পাশে নির্দেশনামূলক বিলবোর্ড স্থাপন ও কাঁটাতারের বেড়াও দেওয়া হয়। তবে এবার অধিকাংশ জলাশয়ে সেই প্রস্তুতি এখনো পুরোপুরি সম্পন্ন করা যায়নি।
অধিকাংশ লেকেই নেই পাখির বিচরণের অনুকূল পরিবেশ
সরেজমিনে দেখা যায়, কয়েকটি নির্দিষ্ট স্থান বাদ দিলে অধিকাংশ লেকের আগাছা এখনো পরিষ্কার করা হয়নি। যদিও এবার বিশমাইল ও পরিবহন চত্বরের পাশের লেক পরিষ্কার করা হয়েছে, তবুও মানুষের নিয়মিত অবাধ চলাচলের কারণে ওইসব এলাকায় পাখির বিচরণ বেশ সীমিত।
পুরাতন রেজিস্ট্রার ভবনের সামনের লেকটি পলি ও মাটি জমে ক্রমেই ভরাট হয়ে যাচ্ছে। লেকের চারপাশের বড় অংশ পাড় থেকে গভীর পর্যন্ত ভরাট হয়ে যাওয়ার পাশাপাশি বাকি অংশও আগাছায় ছেয়ে গেছে। ফলে চলতি মৌসুমে এখন পর্যন্ত সেখানে কোনো পরিযায়ী পাখির উপস্থিতি চোখে পড়েনি।
একই বেহাল দশা সুইমিংপুল-সংলগ্ন লেকেরও। কচুরিপানা ও আগাছায় প্রায় পুরো জলাশয় ঢেকে যাওয়ায় পাখির অবাধ বিচরণের জন্য পর্যাপ্ত খোলা পানি নেই বললেই চলে। এছাড়া আ ফ ম কামালউদ্দিন হলের সামনের লেক এবং নতুন রেজিস্ট্রার ভবনের পেছনের লেকটিও অপরিষ্কার রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে মানুষের অতিরিক্ত আনাগোনা, যার ফলে এসব জলাশয়ে পাখির দেখা মিলছে না।
অন্যদিকে, বোটানিক্যাল গার্ডেনের ভেতরের লেকের প্রায় তিন-চতুর্থাংশই কচুরিপানায় ঢাকা। তবে অবশিষ্ট সামান্য খোলা পানিতে অল্পসংখ্যক পাখির বিচরণ দেখা গেছে। এছাড়া পাখির নিরাপদ বিচরণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত কয়েকটি লেকে আবার ভেলায় চড়ে গোপনে মাছ শিকার করতেও দেখা গেছে।
উদ্যোগে কিছুটা ফিরছে পাখি, প্রধান বাধা মানুষের আনাগোনা
লেকের পরিবেশ ও জলজ বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারে শিক্ষার্থীদের উদ্যোগে কিছুটা ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের ৫২তম ব্যাচের শিক্ষার্থী অরিত্র সাত্তার জানান, গত দুই বছর ধরে ক্যাম্পাসের লেকগুলোর পরিবেশে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছিল। আগে লেকগুলো পরিষ্কার করতে গিয়ে কচুরিপানার পাশাপাশি জলজ বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক ভারসাম্যও নষ্ট হতো। এই সমস্যা সমাধানে ‘ওয়েব্রেকার’ নামের একটি প্রকল্পের মাধ্যমে জলজ পরিবেশ পুনরুদ্ধারে কাজ করা হয়েছে। বিশেষ করে পরিবহন লেকে শাপলা ও টোপাপানাসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ তৈরির পাশাপাশি পানির নিচের বাস্তুতন্ত্রও পর্যবেক্ষণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ বছর পরিযায়ী পাখির মৌসুমের শুরুতেই লেকগুলোকে উপযোগী করতে জাকসুর পরামর্শ ও সহযোগিতায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কিছু কাজ করা হয়েছে। এর সুফল হিসেবে চলতি অক্টোবরে প্রায় পাঁচ শতাধিক পরিযায়ী পাখি দেখা গেছে। তবে লেকের চারপাশে গাছপালা কমে যাওয়া এবং পর্যাপ্ত বেড়ার অভাব থাকায় মানুষের আনাগোনা লেকেই পাখির বিচরণ ব্যাহত করছে। মানুষ লেকে নেমে পড়লে বা পরিবহন লেকের আশপাশে গেলেই পাখিগুলো ভয়ে উড়ে চলে যাচ্ছে।
লেকের পরিবেশগত সংকটের কথা তুলে ধরে অরিত্র বলেন, কিছু লেক পলি জমে ভরাট হয়ে যাচ্ছে এবং পরিবহন লেকে এখনো দূষণ রয়েছে। সে তুলনায় প্রয়োজনীয় জলজ উদ্ভিদের পরিমাণও কম। ফলে কিছুটা উন্নতি হলেও মানুষের নানা কর্মকাণ্ডের কারণে পাখিরা সেখানে স্থায়ীভাবে অবস্থান করতে পারছে না।
পাখির আবাসস্থল রক্ষায় প্রশাসনের প্রতি জোরালো আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, লেকের আশপাশে মানুষের জনসমাগম ও কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি প্রাকৃতিক পরিবেশ সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জলজ উদ্ভিদ রক্ষায় নজর দেওয়া জরুরি। সম্প্রতি লেকে শাপলা জন্মাতে শুরু করলেও অনেকেই তা তুলে নিয়ে যাচ্ছেন, যা অবিলম্বে বন্ধ করা দরকার।
লেক পরিষ্কার ও উপযোগী পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ চলছে
বিশ্ববিদ্যালয়ের ডেপুটি রেজিস্ট্রার (এস্টেট) মোহাম্মদ আজিম উদ্দিন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের বেশ কয়েকটি লেক ও পুকুর এরই মধ্যে পরিষ্কার করা হয়েছে। বাকি জলাশয়গুলোও পর্যায়ক্রমে পরিষ্কার এবং পাখির জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, খুব দ্রুতই এই জলাশয়গুলো পাখিদের জন্য একটি নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গড়ে উঠবে।
পরিযায়ী পাখির নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করতে বিভিন্ন জলাশয়কে পাখির উপযোগী করে তোলার জন্য বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কাজ করছে বলে জানা গেছে। এরই অংশ হিসেবে গত ২৫ অক্টোবর এক প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে পাখিদের কোনো ধরনের বিরক্ত না করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সকল অংশীজনের প্রতি বিশেষ নির্দেশনা জারি করা হয়েছে।
প্রশাসনের নির্দেশনায় জলাশয়ের পাড়ে গাড়ি পার্কিং, মাছ ধরা, ঢোল বাজানো, পটকা ফোটানো, হাততালি দেওয়া এবং উচ্চ শব্দে গান বাজানো থেকে বিরত থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সঙ্গে পাখিদের ভয়ভীতি না দেখানো এবং জলাশয়ে পানির বোতল কিংবা পলিথিন না ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বহিরাগতদের ক্যাম্পাসে প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং নিরাপদ দূরত্ব বজায় রেখে পাখি পর্যবেক্ষণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের মতে, পাখির প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা ও মমত্ববোধের মাধ্যমেই কেবল তাদের নিরাপদ আবাসস্থল নিশ্চিত করা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে ক্যাম্পাসের সব অংশীজনের আন্তরিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করছে প্রশাসন।
১৯৮৬ সালে প্রথম দেখা মেলে পরিযায়ী পাখির
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম পরিযায়ী পাখির আনাগোনা শুরু হয় ১৯৮৬ সালে। ওই বছরের শীতে পুরাতন রেজিস্ট্রার ভবনের সামনের লেকে প্রথম অতিথি পাখিরা আশ্রয় নেয়। এরপর থেকে ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসে পরিযায়ী পাখির সংখ্যা ও নতুন নতুন বিচরণক্ষেত্র বাড়তে থাকে। শুরুতে কেবল একটি লেকে পাখির উপস্থিতি দেখা গেলেও পরবর্তী সময়ে অন্তত চারটি প্রধান লেকে তাদের নিয়মিত বিচরণ শুরু হয়।
সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞদের মতে, যেসব লেকে প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন থাকে, পর্যাপ্ত খোলা পানি ও খাবারের প্রাচুর্য থাকে, মূলত সেসব জলাশয়েই পরিযায়ী পাখিরা স্বাচ্ছন্দ্যে অবস্থান করে। কিন্তু লেক ভরাট, কচুরিপানা ও আগাছার বিস্তার, দূষণ, মানুষের অতিরিক্ত আনাগোনা এবং দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের অভাবের কারণে তাদের এই আবাসস্থল ক্রমেই সংকটের মুখে পড়ছে। পরিযায়ী পাখির নিয়মিত বিচরণ ও নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে কেবল মৌসুমি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নয়, বরং লেকগুলোর নিয়মিত সংস্কার, জলজ বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষা এবং মানুষের অনিয়ন্ত্রিত আনাগোনা বন্ধে দীর্ঘমেয়াদি ও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
সূত্র : সময়ের আলো