ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে শেষ সিন্ডিকেট সভা ঘিরে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে উত্তপ্ত পরিস্থিতির তৈরি হয়েছে। আজ সোমবার সকাল থেকেই ক্যাম্পাসে চাকরির জন্য অবস্থান নিয়েছেন ‘জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি’ নামের একটি প্ল্যাটফর্মের সদস্যরা। তাঁরা এই সিন্ডিকেটে জুলাইযোদ্ধা হিসেবে তাঁদের নিয়োগের দাবি করছেন। এ জন্য তাঁরা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য ‘জোরপূর্বক’ উপাচার্যের অফিসকক্ষে প্রবেশ করেন।
বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, জাতীয় নির্বাচনের আগে আজ সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে ৫৪৬তম সিন্ডিকেট সভা শুরু হয়েছে। এই সভা ঘিরে কয়েক দিন ধরেই বেশ আলোচনা হচ্ছে ক্যাম্পাসে। অনেকে মনে করছেন, নির্বাচনের আগে এটাই এই প্রশাসনের শেষ সিন্ডিকেট সভা। এরপর প্রশাসনের অনেকেই হয়তো পদত্যাগ করবেন। এ কারণে নির্বাচনের আগে এই সিন্ডিকেট সভাটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই সিন্ডিকেট সভায় রাজপথে থাকা জুলাইযোদ্ধাদের নিয়োগ দেওয়ার জন্য চাপও তৈরি হয়েছে, তবে প্রশাসন এই বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিচ্ছে না।
প্রশাসনের সঙ্গে বসতে আজ সকাল থেকে ৬০ থেকে ৭০ জন ‘জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটি’ প্ল্যাটফর্মের নেতা-কর্মীরা নিয়োগের দাবি জানিয়ে ক্যাম্পাসে অবস্থান নেন। তাঁরা প্রথমে বেলা ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করার জন্য আসেন। উপাচার্যের আরেকটি কাজ থাকায় তখন তাঁরা দেখা করতে পারেননি। পরে আরও কয়েক দফা দেখা করতে যান তাঁরা। তবে দুপুরের দিকে দেখা করার জন্য উপাচার্যের অফিসকক্ষে তাঁরা সবাই ঢুকে পড়েন। বেলা সোয়া একটার পর খবর পেয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক মাহবুবর রহমান উপাচার্যের অফিসকক্ষে প্রবেশ করেন। সেখানে তিনি বলতে থাকেন, কেন তাঁরা একজন উপাচার্যের কক্ষে এভাবে প্রবেশ করেছেন। যদি কোনো গুরুত্বপূর্ণ ফাইল হারাত, তাঁদের এখানে আসা উচিত হয়নি।
সাংবাদিককে হেনস্থা
প্রথম আলোর বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি ওই ঘটনার ভিডিও ধারণ করেন। সেখান থেকে প্রক্টর চলে গেলে ওই প্রতিবেদককে উপাচার্যের কার্যালয়ে আন্দোলনকারী ব্যক্তিরা ঘিরে ধরেন এবং ধারণকৃত ভিডিও ডিলিট করার জন্য চাপ দেন। একপর্যায়ে প্রক্টরকে ফোন করেন এ প্রতিবেদক। ওই ফোনে জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান প্রক্টরের সঙ্গে কথা বলেন এবং প্রতিবেদককে যেতে দেন। এ সময় তাঁরা ওই প্রতিবেদকের ফোন নম্বর, কোন বিভাগে পড়েন এবং প্রথম আলোর পরিচয়পত্র পরীক্ষা করেন।
এ সম্পর্কে জুলাই চেতনা বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, জুলাই আন্দোলনে স্বৈরাচার পতনে যাঁরা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন, তাঁদের মধ্য থেকে যোগ্যতার ভিত্তিতে কিছু মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ দেওয়া উচিত ছিল। প্রশাসন আগে এ বিষয়ে আশ্বাস দিলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন পদে মজুরিভিত্তিক নিয়োগ হলেও আন্দোলনে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা সেখান থেকে উপেক্ষিত হয়েছেন। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে আজ অন্তত পাঁচবার উপাচার্যের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টা করেন। কিন্তু সাক্ষাতের সুযোগ না দেওয়ায় তাঁরা উপাচার্যের কার্যালয়ে গিয়ে অবস্থান করছিলেন। সাক্ষাতের জন্য রাত হলেও অবস্থান করবেন।
সাংবাদিকের ভিডিও ডিলিট করার বিষয়ে জানতে চাইলে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, সাংবাদিক হিসেবে তাঁকে চিনতে পারেননি অনেকে। এ কারণে তাঁরা ভিডিওটা ডিলিট করতে বলেছিলেন। কারণ, সেখানে নিউজ করার মতো কিছু ঘটেনি।
প্রক্টর মাহবুবর রহমান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে জোরজবরদস্তি করে চাকরি আদায়ের চেষ্টা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয় এবং এটি নিয়মতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার পরিপন্থী। নিয়োগ হলে তা অবশ্যই বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে যোগ্যতার ভিত্তিতে হতে হবে। এ ধরনের কর্মকাণ্ড প্রশাসনিক কাজ ও শিক্ষার পরিবেশ ব্যাহত করে। কোনো দল বা গোষ্ঠীর নামে এমন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করা হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। হুমকি বা চাপের মুখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কোনো সিদ্ধান্ত নেবে না।
নিয়োগ বন্ধে ইউসিজির হস্তক্ষেপ চেয়ে চিঠি
এদিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চলমান পরিস্থিতিতে নিয়মবহির্ভূতভাবে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ বন্ধে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম, জিয়া পরিষদ ও ইউট্যাব। এই চিঠিতে এই তিন সংগঠনের সভাপতির স্বাক্ষর রয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, তাঁরা জানতে পেরেছেন যে আজ অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া সিন্ডিকেট সভায় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান প্রশাসন নিয়মবহির্ভূতভাবে অ্যাডহক ভিত্তিতে বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা ও কর্মচারী নিয়োগ দিতে যাচ্ছে। ২০২৪-এর ছাত্র-জনতার গণ–অভ্যুত্থানের মূল চেতনা ছিল বৈষম্যবিরোধী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় বর্তমান কর্তৃপক্ষের নিয়োগের ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ মোটেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ ছাড়া এই দ্রুততম সময়ে বিজ্ঞাপন ছাড়া এত অধিকসংখ্যক কর্মকর্তা–কর্মচারী নিয়োগে ব্যাপক আর্থিক লেনদেনের বিষয়টিও আলোচিত হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অভিভাবক হিসেবে এই নিয়মবহির্ভূত অবৈধ নিয়োগ বন্ধে বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করছি।
এ ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সভাপতি অধ্যাপক আবদুল আলিম বলেন, ‘এই ধরনের নিয়োগ তৎপরতা এক থেকে দেড় মাস ধরে চলছে। নির্বাচনের আগে এ ধরনের নিয়োগ কার্যক্রম বন্ধ রাখতে আমরা বারবার বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যকে বলেছি। আজ ও গতকাল রাত থেকে এ নিয়ে ক্যাম্পাসে অবস্থান করছে একটি দল। এ কারণে আমরা আজ দুপুরে বিষয়টি ইউজিসি চেয়ারম্যানকে অবগত করেছি।’
সূত্র: প্রথম আলো