শিরোনাম
◈ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে যুক্তরাজ্যের হোম অফিসের ৮৬ পৃষ্ঠার প্রতিবেদন প্রকাশ ◈ ফেরদৌসী মিষ্টির আসনে বিএনপির মনোনয়ন ফরম নিলেন যে ৬৭ নারী নেত্রী ◈ দীপকের আটক ঘিরে নেতৃত্বের সংকট, বিকল্প পরিকল্পনা ‘প্ল্যান বি’ প্রস্তুত সিজেপির ◈ হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের পূজা এলেই নিরাপত্তা নিয়ে আলোচনা ওঠা জাতীয় জীবনের জন্য দুঃখজনক: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ কাভার্ডভ্যান চুরি হওয়া ক্রিকেটারের টাকা যেভাবে উদ্ধার হলো ◈ মক্কায় দুই বাংলাদেশির মৃত্যুদণ্ড কার্যকরের খবর জানত না ঢাকা, তথ্য চেয়ে সৌদি আরবকে চিঠি ◈ হাসিনা-কামালসহ হাদী হত্যা মামলার আসামিদের ফেরত চাইবে বাংলাদেশ, ভারতকে কনস্যুলার সংলাপে চাপ ◈ যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের নিয়োগ পরীক্ষায় প্রশ্নফাঁস, ৮-১০ লাখ টাকায় প্রশ্ন-উত্তর বিক্রি: গ্রেপ্তার ৭ ◈ জামায়াত কার্যালয়ে হামলা: কুমিল্লা মহানগর কমিটি বিলুপ্ত, তদন্ত কমিটি গঠন ◈ ভারতে ভোটার তালিকা থেকে ১৩ কোটি নাম বাদ, ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে বাংলাদেশে পুশ-ইন শাহিদাদের

প্রকাশিত : ১৮ জুন, ২০২৬, ১২:৩৪ রাত
আপডেট : ২১ আগস্ট, ২০২৬, ০৯:০০ রাত

প্রতিবেদক : মনজুর এ আজিজ

ব্যাংকিং খাতে ফিরছে সুদিন!

মনজুর এ আজিজ: বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত দীর্ঘদিন ধরে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ এবং বাণিজ্য সম্প্রসারণের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে কাজ করছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই খাত বহুমাত্রিক সংকটে পড়েছে। খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধি, দুর্বল সুশাসন, কিছু ব্যাংকে অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারির অভিযোগ, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং আমানতকারীদের ক্রমবর্ধমান উদ্বেগ সব মিলিয়ে ব্যাংকিং ব্যবস্থা এক কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি।

ফলে তারল্য সংকট এখন কেবল আর্থিক চাপ নয়, এটি গভীর আস্থার সংকটে রূপ নিয়েছে। তবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকিং খাত সংস্কার ও পুনর্গঠনের জন্য প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকা বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই তহবিলের লক্ষ্য দুর্বল ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, ঝুঁকি হ্রাস এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং জবাবদিহিতা জোরদারের উদ্যোগও চলছে।

সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাত এখনো চাপের মধ্যে থাকলেও, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা, নীতিগত সংস্কার এবং পুনর্গঠন উদ্যোগ ভবিষ্যতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। ব্যাংকিং খাতের ভিত্তি হলো জনগণের আস্থা। আমানতকারীরা যখন তাদের অর্থের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কিত হন এবং বিনিয়োগকারীরা যখন ব্যাংকগুলোর স্থিতিশীলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তখন পুরো অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় তার প্রভাব ছড়িয়ে পড়ে। ফলে তারল্য সংকট ও আস্থাহীনতা পরস্পরকে আরও গভীর করে তোলে। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো এই সংকট কি সাময়িক, নাকি দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতার প্রতিফলন? এবং প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন হলে কি সত্যিই ব্যাংকিং খাতে সুদিন ফিরবে?

বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৬ লাখ ৪৪ হাজার ৫১৫ কোটি টাকা, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মোট বিতরণকৃত প্রায় ১৮ লাখ ৪ হাজার কোটি টাকার ঋণের মধ্যে প্রায় ৩৫.৭৩ শতাংশ এখন খেলাপি ঋণে পরিণত হয়েছে। এই বিপুল খেলাপি ঋণ ব্যাংকগুলোর মূলধন, মুনাফা এবং নতুন ঋণ বিতরণের সক্ষমতার ওপর তীব্র চাপ সৃষ্টি করেছে।

Advertisement

খেলাপি ঋণের এই ঊর্ধ্বগতির কারণে বহু ব্যাংক তারল্য ও মূলধন সংকটে পড়েছে। কিছু দুর্বল ব্যাংকের দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখতে এবং গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলন নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ ব্যাংককে বিশেষ তারল্য সহায়তা দিতে হয়েছে। একই সঙ্গে মূলধন ঘাটতি মোকাবিলায় ব্যাংক পুনর্গঠন এবং একীভূতকরণের বিষয়গুলোও বিবেচনায় রয়েছে।
এই পরিস্থিতির মধ্যেই ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে ব্যাংকিং খাত সংস্কার ও পুনর্গঠনের জন্য প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

এই তহবিলের লক্ষ্য দুর্বল ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধি, ঝুঁকি হ্রাস এবং সামগ্রিক আর্থিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন, প্রশাসনিক সংস্কার এবং জবাবদিহিতা জোরদারের উদ্যোগও চলছে। সব মিলিয়ে ব্যাংকিং খাত এখনো চাপের মধ্যে থাকলেও, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সহায়তা, নীতিগত সংস্কার এবং পুনর্গঠন উদ্যোগ ভবিষ্যতে স্থিতিশীলতা ফেরানোর সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে এর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো স্বচ্ছতা, কঠোর তদারকি এবং আস্থা পুনরুদ্ধার।

বর্তমান ব্যাংকিং খাতে আস্থা পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা মূলত চলমান সংস্কার কার্যক্রমের সফল বাস্তবায়নের ওপর নির্ভর করছে। সাম্প্রতিক সময়ে তারল্য সংকটে থাকা কিছু ব্যাংককে সচল রাখতে বাংলাদেশ ব্যাংক জরুরি সহায়তা দিয়েছে। এর মধ্যে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসিকে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার তারল্য সহায়তা প্রদান করা হয়েছে, যাতে গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলন ও স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত না হয়।

একই সঙ্গে অনিয়ম ও দুর্বল ব্যবস্থাপনার অভিযোগে কয়েকটি ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদ পুনর্গঠন এবং প্রশাসক নিয়োগ করা হয়েছে, যা শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার অংশ হিসেবে দেখা হচ্ছে। ব্যাংকিং খাত সংস্কারের জন্য বাজেটে বরাদ্দকৃত প্রায় ৪০ হাজার কোটি টাকার তহবিলকে অর্থনীতিবিদরা কেবল সহায়তা নয়, বরং পুনর্গঠন ও স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করছেন। এছাড়া বিশ্বব্যাংকের প্রায় ১.৭ বিলিয়ন ডলারের ঋণ সহায়তার সঙ্গে সুশাসন, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার শর্ত যুক্ত রয়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, এসব শর্ত বাস্তবায়িত হলে দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে ওঠা সম্ভব হবে।

অন্যদিকে দুর্বল ব্যাংকগুলোর ভবিষ্যৎ নিয়ে বাজারে অনিশ্চয়তা থাকলেও, একীভূতকরণ, ব্যাংক রেজল্যুশন আইন কার্যকর করা এবং পুনর্গঠনের একটি স্বচ্ছ রোডম্যাপ তৈরি হলে আস্থা ফিরে আসতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক বারবার আশ্বস্ত করছে যে আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা তাদের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ফলে সংস্কারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত জরুরি। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতে বর্তমান সংকট কেবল তারল্যের নয়, এটি গভীর আস্থাহীনতার ফল।

দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়ম, দুর্বল সুশাসন, রাজনৈতিক প্রভাব এবং ঋণ ব্যবস্থাপনায় বিশৃঙ্খলা এই পরিস্থিতি তৈরি করেছে। গত এক দশকে ভুয়া প্রতিষ্ঠান, কাগুজে কোম্পানি এবং প্রভাবশালী গোষ্ঠীর মাধ্যমে বিপুল অঙ্কের ঋণ গ্রহণের ঘটনা ব্যাংকিং খাতকে বড় ধরনের ঝুঁকিতে ফেলেছে। এসব ঋণের বড় অংশ পরবর্তীতে খেলাপিতে পরিণত হয়েছে, যার ফলে ব্যাংকগুলোর আর্থিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার দুর্বলতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।

অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকের প্রকৃত আর্থিক অবস্থা দীর্ঘদিন আড়ালে ছিল, ফলে সমস্যা দেরিতে প্রকাশ পেয়ে বড় আকার ধারণ করেছে। যখন ব্যাংকের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন স্বাভাবিকভাবেই আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ে। কয়েকটি দুর্বল ব্যাংকে গ্রাহকদের অর্থ উত্তোলনে সীমাবদ্ধতা বা বিলম্বের ঘটনা জনমনে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। অনেক আমানতকারী নিরাপদ ব্যাংকে অর্থ স্থানান্তর করায় দুর্বল ব্যাংকগুলোর ওপর আরও চাপ বেড়েছে।

এদিকে উচ্চ মূল্যস্ফীতি মানুষের সঞ্চয় ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে, ফলে নতুন আমানতের প্রবাহও হ্রাস পেয়েছে। সব মিলিয়ে আস্থার সংকট এখন পুরো ব্যাংকিং ব্যবস্থার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। কারণ ব্যাংকের সবচেয়ে বড় সম্পদ মূলধন বা অবকাঠামো নয় বরং গ্রাহকের আস্থা। বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাত বর্তমানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনকাল অতিক্রম করছে। সরকার ও বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে একাধিক সংস্কারমূলক পদক্ষেপ নিয়েছে পর্ষদ পুনর্গঠন, অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, এবং তারল্য সহায়তা তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য।

জাতীয় বাজেটে দুর্বল ব্যাংক পুনর্গঠনের জন্য বড় অঙ্কের বরাদ্দ এবং আন্তর্জাতিক সহযোগীদের শর্তযুক্ত সহায়তা খাতটিকে নতুন কাঠামোর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। তবে অর্থনীতিবিদরা মনে করেন, কেবল অর্থ সহায়তা যথেষ্ট নয়। প্রকৃত পরিবর্তনের জন্য খেলাপি ঋণ আদায়ে কঠোর পদক্ষেপ, অর্থ পাচার রোধে দৃশ্যমান অগ্রগতি এবং ব্যাংক পরিচালনায় রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংককে আরও স্বাধীন ও শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে।

যদি এসব সংস্কার ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং জনগণের আস্থা পুনর্গঠন করা যায়, তবে ব্যাংকিং খাত আবারও অর্থনীতির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে ফিরে আসতে পারে। ফলে বর্তমান সংকট সত্ত্বেও সুদিনের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ব্যাংকিং খাতের বর্তমান তারল্য সংকট মূলত আস্থা ও সুশাসনের গভীর সংকটের প্রতিফলন। তবে পরিস্থিতি এখনো নিয়ন্ত্রণের বাইরে নয়। স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা, কঠোর নিয়ন্ত্রক তদারকি এবং ধারাবাহিক সংস্কার কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা গেলে এই খাত আবারও স্থিতিশীলতার পথে ফিরতে পারে। অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হিসেবে ব্যাংকিং খাতের ভবিষ্যৎ নির্ভর করছে এখন নীতি, বাস্তবায়ন এবং আস্থা পুনর্গঠনের সফলতার ওপর।

  • সর্বশেষ