বিশ্বকাপের ‘জে’ গ্রুপের প্রথম ম্যাচে আলজেরিয়ার বিপক্ষে মহাকাব্যিক হ্যাটট্রিক করে আর্জেন্টিনার জয়ের নায়ক ছিলেন লিওনেল মেসি। বিশ্ব চ্যাম্পিয়নদের হয়ে একাই ৩টি গোল রেকর্ডের বন্যাও বইয়ে দেন আলবিসেলেস্তা মহাতারকা। কিন্তু ম্যাচের ৩২তম মিনিটে এক ফাউলের কারণে যদি লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তেন, তবে হয়তো এই হ্যাটট্রিকটাই হতোই না।
ফুটবলপ্রেমীদের মাঝে তুমুল বিতর্কের জন্ম দেওয়া মেসির ফাউলটি কি লাল কার্ড পাওয়ার মতো? ফুটবলের আইনপ্রণেতা সংস্থা আইএফএবি-এর নিয়ম আসলে কী বলে? আর পোলিশ রেফারি সাইমন মার্চিনিয়াক কেন সে যাত্রায় পকেট থেকে কার্ড বের করলেন না?
যেসব কারণে লাল দেখতে হয় মেসির করা ট্যাকলটি মূলত আইএফএবি-এর সুনির্দিষ্ট নির্দেশিকার আওতায় পড়ে। ফুটবলের এই নিয়ম অনুযায়ী, একজন খেলোয়াড় তখনই সরাসরি লাল কার্ড পাবেন, যখন তিনি এমন কোনো ‘মারাত্মক বা বিপজ্জনক ফাউল’ করবেন যা প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের শরীরকে বড় ঝুঁকির মুখে ফেলে দেয় কিংবা যেখানে ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ও বর্বরতার’ আশ্রয় নেওয়া হয়।
আইএফএবি-এর নিয়ম বিশদভাবে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, তারা মূলত কয়েকটি আচরণকে 'মারাত্মক ফাউল' হিসেবে গণ্য করে। যখন বল দখলের লড়াইয়ের সময় কোনো খেলোয়াড় যদি সামনে, পাশ থেকে কিংবা পেছন থেকে এক বা দুই পায়ে এমনভাবে প্রতিপক্ষকে ট্যাকল করেন, যেখানে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ করা হয় কিংবা যা প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের শারীরিক নিরাপত্তাকে বিপন্ন করে তোলে, তবে তিনি মারাত্মক ফাউলের দায়ে দোষী সাব্যস্ত হবেন।
এর পাশাপাশি, মেসি ‘সহিংস আচরণের’ দায়েও মাঠ থেকে বহিষ্কৃত হতে পারতেন। নিয়মানুযায়ী সহিংস আচরণ তখনই ঘটে, ‘যখন বল দখলের কোনো লড়াই ছাড়াই কোনো খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের ওপর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ বা বর্বর আচরণ করেন অথবা করার চেষ্টা করেন।’
অসাবধানতা এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগের সংজ্ঞা কোনো খেলোয়াড় অসাবধানতাবশত নাকি বেপরোয়া আচরণের কারণে মারাত্মক ফাউল করেছেন—সেটি মূল্যায়ন করার জন্য আইএফএবি দুটি বিষয় স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করেছে। প্রথমত, অসাবধানতা তখনই ধরা হয়, ‘যখন একজন খেলোয়াড় ট্যাকল করার সময় প্রতিপক্ষের প্রতি মনোযোগ বা বিবেচনার অভাব দেখান।’ আর দ্বিতীয়ত, বেপরোয়া আচরণ ঘটে ‘যখন একজন খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ের সম্ভাব্য বিপদ বা পরিণতির কথা বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা না করে মাঠে আগ্রাসী হয়ে ওঠেন।’
সর্বশেষ নিয়ম অনুযায়ী, ‘অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ তখনই বিবেচনা করা হয়, যখন একজন খেলোয়াড় প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে প্রয়োজনের চেয়েও অনেক বেশি শক্তি খাটান।’
ম্যাচে মেসির সেই ফাউলটি এবং পরবর্তীতে পোলিশ রেফারি সাইমন মার্চিনিয়াকের নেওয়া সিদ্ধান্তের দিকে তাকালে বোঝা যায়—তিনি মেসিকে কেবলই মুখে সতর্ক করে ছেড়ে দিয়েছিলেন। রেফারি নিশ্চয়ই এটা মনে করেছিলেন যে, মেসি আসলে বল পাসের লক্ষ্যেই পা বাড়িয়েছিলেন এবং ততক্ষণে পজিশন ও বলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া আলজেরিয়ান ডিফেন্ডার আইসা মান্দির গায়ে অনভিপ্রেতভাবে এবং অতিরিক্ত বলপ্রয়োগ ছাড়াই আঘাত লেগে যায়। মূলত এই কারণেই আর্জেন্টাইন অধিনায়কের সেই অ্যাকশনটিকে রেফারি ‘মারাত্মক বা বিপজ্জনক ফাউল’ হিসেবে গণ্য করেননি।
লাল কার্ডের বিপক্ষে থিয়েরি অঁরির রেফারির এই সিদ্ধান্ত নিয়ে যখন চারদিকে সমালোচনার ঝড়, তখন যে কজন ধারাভাষ্যকার লাল কার্ড না দেওয়ার সিদ্ধান্তকে সমর্থন করেছিলেন, তাদের একজন হলেন থিয়েরি অঁরি। বার্সেলোনায় মেসির এই সাবেক সতীর্থ সরাসরিই বলেছেন যে, ‘ফাউলের পেছনে উদ্দেশ্যটা বোঝা গুরুত্বপূর্ণ’ এবং ‘সব সংঘর্ষই লাল কার্ড পাওয়ার যোগ্য নয়।’
ফক্স স্পোর্টস-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ফ্রান্সের সাবেক কিংবদন্তি অঁরি ব্যাখ্যা করেন, ‘এই ধরনের পরিস্থিতিগুলো সঠিকভাবে বিশ্লেষণ করার জন্য ফুটবলারের উদ্দেশ্যটা বোঝা খুবই জরুরি। আপনি যখন রিপ্লেটা বারবার দেখবেন, তখন পরিষ্কার বুঝতে পারবেন যে মেসির পুরো মনোযোগ ছিল বলের দিকে এবং ও নিখাদ ফুটবলীয় একটা মুভ নেওয়ার চেষ্টা করছিল; কাউকে আঘাত করার কোনো উদ্দেশ্য ওর ছিল না। হ্যাঁ, সেখানে একটা সংঘর্ষ হয়েছে। হ্যাঁ, দেখতে হয়তো একটু অন্যরকম লেগেছে। কিন্তু মাঠে সব সংঘর্ষ মানেই লাল কার্ড নয়।’