বন্দর শ্রমিকদের বিরোধিতার মধ্যেই চট্টগ্রাম বন্দরের নিউ মোরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) ও এর ওভারফ্লো কনটেইনার ইয়ার্ড (ওসিওয়াই) পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুবাইভিত্তিক কোম্পানি ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে চুক্তি স্বাক্ষর করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। এ চুক্তির মাধ্যমে আগামী ১৫ বছর টার্মিনালটি পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্ব পাচ্ছে এই কোম্পানি।
আগামীকাল বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) বিকেল ৩টায় ঢাকায় ইনভেস্ট বাংলাদেশ অডিটরিয়ামে ১৫ বছরের কনসেশন (ইজারা) চুক্তি স্বাক্ষর করবে বাংলাদেশ ও সংযুক্ত আরব আমিরাত।
বাংলাদেশ ও ইউএই সরকারের ইস্যুকৃত একটি আমন্ত্রণপত্রে বলা হয়েছে, অনুষ্ঠানে ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান এসা কাজিম উপস্থিত থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।
এই চুক্তির মাধ্যমে বন্দরের সবচেয়ে ব্যস্ততম কনটেইনার টার্মিনাল এনসিটিতে আন্তর্জাতিক অপারেটর আনার ক্ষেত্রে সরকারের দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টায় এক বড় পদক্ষেপ সূচিত হচ্ছে।
তবে সরকারের এই পদক্ষেপ বন্দর শ্রমিক ও অন্যান্য স্বার্থসংশ্লিষ্টদের বিরোধিতার মুখে পড়েছে। চুক্তি স্বাক্ষরিত হলে তারা বন্দরের কার্যক্রম এবং কুতুবদিয়া বহির্নোঙর পর্যন্ত জাহাজের চলাচল বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন।
গত সোমবার চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ ভবনের সামনে এক অবস্থান কর্মসূচিতে চট্টগ্রাম বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের সমন্বয়ক ইব্রাহিম খোকন বন্দর অচল করে দেওয়ার এই হুঁশিয়ারি দেন। তিনি বলেন, 'আপনারা যদি কোনো চুক্তি স্বাক্ষরের উদ্যোগ নেন, তবে চট্টগ্রাম বন্দর তাৎক্ষণিকভাবে বন্ধ করে দেওয়া হবে। শুধু বন্দরই নয়, কুতুবদিয়া বহির্নোঙর পর্যন্ত কার্যক্রমও বন্ধ করে দেওয়া হবে।'
আন্দোলনকারীরা কেবল এনসিটি নয়, চট্টগ্রাম কনটেইনার টার্মিনাল (সিসিটি) এবং জেনারেল কার্গো বার্থেও (জিসিবি) বিদেশি অপারেটরদের প্রস্তাবিত সম্পৃক্ততার বিরোধিতা করছেন। ইব্রাহিম খোকন আরও বলেন, 'শ্রমিকরা কোনো অস্থিতিশীলতা চান না; তবে চুক্তির দিকে এগোনোর আগে সরকার যেন তাদের মতামত বিবেচনা করে। আমরা কোনো অস্থিতিশীলতা চাই না। আমরা গণতান্ত্রিক সরকারকে সহযোগিতা করতে চাই। কিন্তু আপনাদের জনগণের নাড়ি বুঝতে হবে এবং তাদের মতামতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।' সংগ্রাম পরিষদ যেকোনো চুক্তি স্বাক্ষরের আগে সরকারের সাথে সরাসরি আলোচনার দাবি জানিয়েছে।
১৫ বছরের ইজারা অনুমোদন করেছে সরকার
অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি এনসিটি এবং ওসিওয়াই-এর খসড়া কনসেশন চুক্তি নীতিগত অনুমোদন দেওয়ার কয়েক দিন পরেই বন্দর অচল করে দেওয়ার এই হুমকি আসলো। নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়ের একটি প্রস্তাবের ভিত্তিতে ১ অক্টোবরের এই অনুমোদন ১৫ বছরের পিপিপি ইজারার প্রধান বাধা দূর করে।
পাবলিক প্রাইভেট পার্টনারশিপ (পিপিপি) অথরিটির প্রজেক্ট প্রোফাইল অনুযায়ী, এনসিটির আধুনিকীকরণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুবাই সরকার মনোনীত ডিপি ওয়ার্ল্ডকে সরকারি পর্যায়ে (জিটুজি) ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনা করছে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষ (সিপিএ)।
প্রকল্পটি ২০২৩ সালের মার্চ মাসে অর্থনৈতিক সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি থেকে প্রাথমিক নীতিগত অনুমোদন পেয়েছিল। সর্বশেষ অনুমোদনটি মূলত খসড়া কনসেশন চুক্তির সাথে সম্পর্কিত, যা ১৫ বছরের টার্মিনাল পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ন্ত্রণ করবে।
সরকার এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের মধ্যে কয়েক বছর ধরে আলোচনা চলছিল। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে এই প্রক্রিয়া গতি পায়; তবে ডিপি ওয়ার্ল্ড খসড়া কনসেশন চুক্তি পর্যালোচনার জন্য অতিরিক্ত সময় চাইলে তা কিছুদিন থমকে যায়। পরবর্তীতে নতুন সরকার এই প্রক্রিয়াটি পুনরায় চালু করে।
গত মে মাসে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয় পিপিপি মডেলের অধীনে এনসিটির প্রস্তাবিত বেসরকারি পরিচালনার জন্য একটি মূল্যায়ন কমিটি পুনর্গঠন করতে সিপিএকে নির্দেশ দেয়। সিপিএ পরবর্তীতে আলোচনা কমিটির জন্য একটি ১২ সদস্যের সহায়ক দল গঠন করে।
ইন্টারন্যাশনাল ফাইন্যান্স কর্পোরেশন (আইএফসি) এই প্রকল্পের লেনদেন উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছে, যা ডিউ ডিলিজেন্স, ট্রানজেকশন স্ট্রাকচারিং, প্রস্তাবের অনুরোধ (আরএফপি) ও কনসেশন চুক্তি প্রস্তুত করা এবং নির্বাচিত আন্তর্জাতিক অপারেটরের সাথে আলোচনার সুবিধার্থে কাজ করছে।
এনসিটি সামলায় বন্দরের প্রায় অর্ধেক কনটেইনার
চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় কনটেইনার হ্যান্ডলিং সুবিধা হলো এনসিটি, যা বন্দরের উপাত্ত অনুযায়ী ২০২৫ সালে মোট কনটেইনার ভলিউমের প্রায় ৪৪% হ্যান্ডেল করেছে। এটি বর্তমানে বার্ষিক প্রায় ১৩ লাখ টিইইউএস হ্যান্ডেল করে, যা বন্দরের মোট ক্ষমতার প্রায় ৪০% এর সমান। বর্তমানে এটি বাংলাদেশ নৌবাহিনীর চট্টগ্রাম ড্রাই ডক কোম্পানি লিমিটেড দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে।
প্রস্তাবিত ইজারাটি চট্টগ্রাম বন্দর পরিচালনায় বিদেশি অংশীদারিত্বের আরেকটি বড় সম্প্রসারণ হিসেবে চিহ্নিত হবে। এর আগে সৌদি আরবভিত্তিক রেড সি গেটওয়ে টার্মিনাল ২২ বছরের ইজারায় পতেঙ্গা কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনা করছে। এছাড়া সরকার ডেনমার্কভিত্তিক এপিএম টার্মিনালকে দীর্ঘমেয়াদী পিপিপি ইজারার অধীনে লালদিয়া কনটেইনার টার্মিনাল নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্বও দিয়েছে। তবে এনসিটি একটি বিদ্যমান ও চালু টার্মিনাল, যা সিপিএর নিজস্ব উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগে তৈরি করা হয়েছে।
বৃহত্তর আন্দোলনের হুমকি শ্রমিকদের
বন্দর রক্ষা সংগ্রাম পরিষদের যুগ্ম সমন্বয়ক হুমায়ুন কবির চুক্তি স্বাক্ষরের আগে বন্দর শ্রমিকদের একটি প্রতিনিধি দলের সাথে বৈঠক করার জন্য সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি বলেন, 'শ্রমিকরা আশা করেছিল বর্তমান সরকার এমন একটি প্রক্রিয়া বন্ধ করবে যা পূর্ববর্তী সরকারের আমলে শুরু হয়েছিল।
কবির বলেন, 'আমরা যদি আপনাদের বোঝাতে পারি, তবে কোনো অবস্থাতেই চট্টগ্রাম বন্দর বিদেশিদের হাতে তুলে দেবেন না। আমরা যদি বোঝাতে ব্যর্থ হই, তবে আপনারা আপনাদের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেন।'
অন্যদিকে ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের চট্টগ্রাম শাখার সভাপতি ও শ্রমিক কর্মচারী ঐক্য পরিষদের নেতা তপন দত্ত সতর্ক করে দিয়ে বলেন, 'শ্রমিকদের দাবি উপেক্ষা করা হলে তা বৃহত্তর আন্দোলনের জন্ম দিতে পারে। বিক্ষোভকারীরা ইতোমধ্যে ৭ অক্টোবরের জন্য একটি মশাল মিছিল এবং ১৩ অক্টোবরের জন্য বন্দর চেয়ারম্যানকে ঘিরে পরবর্তী কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন।'
সব মিলিয়ে, এনসিটি ইজারা চুক্তি স্বাক্ষরের বিষয়ে সরকারের নির্ধারিত পরিকল্পনার বিরুদ্ধে বন্দর শ্রমিকদের বিরোধিতা তীব্র হওয়ায় টার্মিনালটি আন্তর্জাতিক অপারেটরের হাতে হস্তান্তরের পুরো প্রক্রিয়ায় চরম অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে।