এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্বের সর্ববৃহৎ ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ও মৎস্যভান্ডার হিসেবে খ্যাত বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের উপকূলের মানুষকে বাঁচিয়েছেন দুই শতাধিক প্রাকৃতিক দুর্যোগ ।বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনের বুক ছুঁয়ে বঙ্গোপসাগর। তার তীর ঘেঁষে মানুষের বসতি। নদী, খাল, ঘের, কৃষিজমি আর নোনা জলের সঙ্গে যাঁদের জীবন—তাঁদের কাছে ঘূর্ণিঝড় কোনো নতুন আতঙ্ক নয়। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাঁরা দেখেছেন ঝড়ের তাণ্ডব, জলোচ্ছ্বাসের উন্মত্ততা আর এক রাতেই ঘরবাড়ি-ফসল-গবাদিপশু হারানোর নির্মম দৃশ্য।
প্রাকৃতিক দুর্যোগের এই দীর্ঘ ইতিহাসে কখনো এসেছে প্রাণহানির ভয়াবহতা, কখনো ধ্বংস হয়েছে জনপদ। আবার ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়েই মানুষ নতুন করে ঘর তুলেছে, নৌকা বানিয়েছে, জমিতে ফসল ফলিয়েছে। সেই সঙ্গে বদলেছে দুর্যোগ মোকাবিলার কৌশলও।
আগে যেখানে ঘূর্ণিঝড়ের খবর পৌঁছাত দেরিতে, এখন উপগ্রহের চোখে বঙ্গোপসাগরের ঝড়ের গতিপথ দেখা যায়। আগে মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার মতো পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র ছিল না, এখন উপকূলজুড়ে রয়েছে আশ্রয়কেন্দ্র ও প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক। ফলে ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি না কমলেও কমেছে প্রাণহানির ঝুঁকি।
এ যেন শত বছরের দুর্যোগ থেকে শেখা এক দীর্ঘ পাঠ।
আশির দশকের একের পর এক আঘাত
১৯৮৩ সালের ১৪-১৫ অক্টোবর উপকূলবর্তী দ্বীপ ও চট্টগ্রাম-নোয়াখালীর চরাঞ্চলে ঘণ্টায় ১২২ কিলোমিটার বেগের বাতাসসহ তীব্র ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। এতে ৪৩ জন নিহত হন। ছয়টি মাছ ধরার ট্রলার ও একটি যন্ত্রচালিত নৌকা ডুবে যায়। নিখোঁজ হন ১৫০ জন জেলে। ক্ষতিগ্রস্ত হয় আমন ফসলও।
একই বছরের ৫-৯ নভেম্বর আবারও আঘাত হানে শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়। ঘণ্টায় ১৩৬ কিলোমিটার বেগের বাতাস ও প্রায় দেড় মিটার জলোচ্ছ্বাসে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, টেকনাফ, উখিয়া, বরিশাল, পটুয়াখালী ও নোয়াখালীর বিস্তীর্ণ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় ৩০০ জেলে ও ৫০টি নৌকা নিখোঁজ হয়। ধ্বংস হয় দুই হাজার ঘরবাড়ি।
১৯৮৫ সালের ২৪-২৫ মে ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত ছিল আরও ভয়াবহ। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, সন্দ্বীপ, হাতিয়া ও উড়িরচরসহ উপকূলীয় এলাকায় আঘাত হানা ওই ঝড়ে কোথাও কোথাও বাতাসের গতি ঘণ্টায় ১৫৪ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছায়। তিন থেকে প্রায় পাঁচ মিটার উঁচু জলোচ্ছ্বাসে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। প্রাণ হারান হাজার হাজার মানুষ। বিধ্বস্ত হয় বিপুলসংখ্যক ঘরবাড়ি, ক্ষতিগ্রস্ত হয় সড়ক ও বাঁধ।
১৯৮৬ সালের ঘূর্ণিঝড়েও উপকূলীয় দ্বীপ ও চরাঞ্চলে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। ১৯৮৮ সালের ২৪-৩০ নভেম্বরের ঝড়ে ঘণ্টায় ১৬২ কিলোমিটার বেগের বাতাস বয়ে যায়। মংলায় জলোচ্ছ্বাসের উচ্চতা ছিল প্রায় সাড়ে চার মিটার। ওই দুর্যোগে হাজারো মানুষের প্রাণহানি ঘটে। মারা যায় বিপুলসংখ্যক গবাদিপশু। সুন্দরবনের বন্যপ্রাণীর ওপরও পড়ে ভয়াবহ প্রভাব।
১৯৯১—যে রাত ভুলতে পারেনি উপকূল
বাংলাদেশের ঘূর্ণিঝড়ের ইতিহাসে ১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল একটি ভয়াবহ মাইলফলক। প্রলয়ঙ্করী ওই ঘূর্ণিঝড় উপকূলে আঘাত হানার সময় বাতাসের সর্বোচ্চ গতি সন্দ্বীপে ঘণ্টায় ২২৫ কিলোমিটার পর্যন্ত পৌঁছেছিল। বিভিন্ন উপকূলীয় এলাকায় সৃষ্টি হয় পাঁচ থেকে আট মিটার পর্যন্ত জলোচ্ছ্বাস।
নিঝুম দ্বীপ, মনপুরা, ভোলা, সন্দ্বীপসহ বিস্তীর্ণ এলাকা বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। রাতের আঁধারে জলোচ্ছ্বাস ভাসিয়ে নেয় ঘরবাড়ি, নৌকা, গবাদিপশু ও মানুষের জীবন। বিপুল প্রাণহানির পাশাপাশি ধ্বংস হয় হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পদ।
এই দুর্যোগ শুধু একটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় ছিল না; এটি বাংলাদেশের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার জন্যও ছিল একটি কঠিন শিক্ষা।
প্রশ্ন উঠেছিল—একই ধরনের দুর্যোগ ভবিষ্যতে আবার এলে মানুষকে কীভাবে বাঁচানো যাবে?
উত্তর খুঁজতে শুরু হয় সতর্কীকরণ ব্যবস্থা, আশ্রয়কেন্দ্র, উদ্ধার ও স্বেচ্ছাসেবক ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার কাজ।
১৯৯৭-এ বদলের প্রমাণ
১৯৯৭ সালের ১৬-১৯ মে আবারও শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানে। বাতাসের গতি ছিল ঘণ্টায় প্রায় ২২৫ কিলোমিটার। জলোচ্ছ্বাসও ছিল কয়েক মিটার উঁচু। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ছিল ভিন্ন।
সরকারের আগাম সতর্কতা, প্রশাসনের প্রস্তুতি এবং মানুষের সহযোগিতায় ব্যাপকসংখ্যক মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। ফলে এত শক্তিশালী একটি ঝড়েও প্রাণহানি আগের ভয়াবহ দুর্যোগগুলোর তুলনায় অনেক কম ছিল।
এই ঘটনাটি দেখিয়ে দেয়—ঘূর্ণিঝড়ের শক্তি থামানো না গেলেও প্রস্তুতি দিয়ে মানুষের জীবন রক্ষা করা যায়।
সিডর ও আইলার ক্ষত
২০০৭ সালের ১৫ নভেম্বর ঘূর্ণিঝড় সিডর দক্ষিণাঞ্চলে আঘাত হানে। প্রবল বাতাস ও জলোচ্ছ্বাসে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ জনপদ বিধ্বস্ত হয়। সুন্দরবন ও তার আশপাশের এলাকাও ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়ে। কয়েক হাজার মানুষ প্রাণ হারান। ঘরবাড়ি, ফসল, গবাদিপশু ও অবকাঠামোর বিপুল ক্ষতি হয়।
সিডরের ক্ষত শুকাতে না শুকাতেই দুই বছর পর আসে আইলা।
২০০৯ সালের ২৭ মে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ১৫টি উপকূলীয় জেলায় আঘাত হানে ঘূর্ণিঝড় আইলা। দেড় শতাধিক মানুষের প্রাণহানি ঘটে। দুই লক্ষাধিক ঘরবাড়ি এবং বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি ও ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আইলার পর খুলনা, বাগেরহাটসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বহু মানুষ দীর্ঘদিন ধরে জলাবদ্ধতা, লবণাক্ততা ও জীবিকার সংকটে পড়েন। তখন আবারও সামনে আসে একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা—ঘূর্ণিঝড়ের আঘাত কয়েক ঘণ্টার হলেও তার ক্ষত থেকে যায় বছরের পর বছর।
এখন বঙ্গোপসাগরের ঝড় দৃষ্টি এড়ায় না
ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় সবচেয়ে বড় পরিবর্তন এসেছে পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থায়।
১৯৬৮ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে আবহাওয়া উপগ্রহের ছবি গ্রহণের জন্য স্বয়ংক্রিয় চিত্র প্রেরণ ভূকেন্দ্র প্রতিষ্ঠিত হয়। সময়ের সঙ্গে সেখানে উন্নত প্রযুক্তি যুক্ত হয়েছে। উপগ্রহ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপ বা ঘূর্ণিঝড়ের অবস্থান, গতিপথ ও সম্ভাব্য তীব্রতা সম্পর্কে আগাম ধারণা পাওয়া যায়।
একসময় ঝড়ের খবর নির্ভর করত সীমিত যোগাযোগব্যবস্থার ওপর। এখন উপগ্রহের ছবি, আবহাওয়া পর্যবেক্ষণ ও আধুনিক পূর্বাভাস প্রযুক্তির মাধ্যমে ঝড়ের গতিবিধি অনেক আগেই শনাক্ত করা সম্ভব।
তবে পূর্বাভাস পাওয়া আর মানুষকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়া—দুটি আলাদা বিষয়। আর এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে মাঠপর্যায়ের প্রস্তুতি।
৩২ হাজার স্বেচ্ছাসেবকের প্রস্তুতি
বাংলাদেশের ঘূর্ণিঝড় প্রস্তুতি কর্মসূচি বা সিপিপি উপকূলীয় দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো। বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত এই কর্মসূচির আওতায় উপকূলের বিভিন্ন ইউনিয়ন ও ওয়ার্ডে প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক রয়েছেন।
তাঁদের দায়িত্ব শুধু মাইকিং বা সংকেত প্রচার করা নয়। ঝুঁকিপূর্ণ মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া, উদ্ধার, প্রাথমিক চিকিৎসা ও দুর্যোগ-পরবর্তী সহায়তাও তাঁদের কাজের অংশ।
একটি ঘূর্ণিঝড়ের আগে একজন স্বেচ্ছাসেবকের হাতে থাকা মেগাফোন কখনো একটি পরিবারের জীবন বাঁচাতে পারে। একটি আশ্রয়কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে শত শত মানুষের নিরাপদ ঠিকানা।
সুন্দরবন—প্রাকৃতিক ঢাল
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মানুষের কাছে সুন্দরবন শুধু জীবিকার উৎস নয়, এটি একটি প্রাকৃতিক সুরক্ষা বলয়ও। বঙ্গোপসাগর থেকে ধেয়ে আসা ঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের শক্তি কমাতে সুন্দরবনের ভূমিকা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা রয়েছে।
তাই সুন্দরবন ধ্বংস হলে শুধু বাঘ, হরিণ, কুমির বা অন্যান্য বন্যপ্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হবে না; ঝুঁকিতে পড়বে সুন্দরবনঘেঁষা মানুষের জীবনও।
বন রক্ষা তাই একই সঙ্গে পরিবেশ রক্ষা, জীবিকা রক্ষা এবং উপকূলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়।
ঘূর্ণিঝড় থামানো নয়, মানুষকে বাঁচানো
একটি শক্তিশালী ঘূর্ণিঝড়ের বিপুল শক্তি মানুষের পক্ষে নিয়ন্ত্রণ করা এখনো সম্ভব নয়। ঝড়ের গতিপথ বদলে দেওয়া কিংবা সমুদ্রের ওপর রাসায়নিক ছড়িয়ে তার তীব্রতা কমিয়ে দেওয়ার নানা তাত্ত্বিক ধারণা ও পরীক্ষার কথা বলা হলেও এসব পদ্ধতি বাস্তব ও পরিবেশগত নানা প্রশ্নের মুখে রয়েছে।
তাই বাস্তবসম্মত পথ একটাই—ঝড় আসবে, কিন্তু মানুষ প্রস্তুত থাকবে।
শক্তিশালী পূর্বাভাস ব্যবস্থা, দ্রুত সতর্কীকরণ, পর্যাপ্ত আশ্রয়কেন্দ্র, নিরাপদ যোগাযোগব্যবস্থা, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক, উপকূলীয় বাঁধ, সবুজবেষ্টনী এবং মানুষের সচেতনতাই পারে দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে।
বাংলাদেশ সেই পথেই এগিয়েছে। ১৯৯১-এর মতো ভয়াবহ প্রাণহানির পর ১৯৯৭-এর অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে প্রস্তুতির শক্তি। সিডর ও আইলা আবারও দেখিয়েছে, উন্নতি হলেও আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই।
কারণ উপকূল এখনো ঝুঁকির মধ্যে।
বঙ্গোপসাগর এখনো উত্তাল হয়। মেঘ জমে। নিম্নচাপ তৈরি হয়। সতর্ক সংকেত ওঠে। তারপর একসময় ঝড় আসে।
কিন্তু আগের মতো অসহায় হয়ে অপেক্ষা করে না উপকূলের মানুষ।
তারা জানে—ঝড় থামানো যাবে না। কিন্তু সতর্ক হওয়া যাবে। আশ্রয়ে যাওয়া যাবে।