দেশের জ্বালানি সংকটের কারণে বস্ত্র ও পোশাক খাত অনেকটা খুঁড়িয়ে চলছে। তবে ব্যতিক্রম নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারের দুপ্তারার মিথিলা টেক্সটাইল মিলস। তারা ধানের তুষ পুড়িয়ে স্টিম বা বাষ্প উৎপাদন করছে। এই বাষ্প গ্যাসে রূপান্তর হচ্ছে। এই গ্যাসে সচল থাকছে কারখানার চারটি ইউনিট। এতে উৎপাদন, রপ্তানি, ক্রেতার সঙ্গে চুক্তি, আয়-ব্যয়– সবকিছুই চলছে নির্বিঘ্নে। সূত্র: সমকাল প্রতিবেদন
সম্প্রতি মিথিলা টেক্সটাইল মিলে গিয়ে দেখা যায়, জাপানি প্রযুক্তিতে গড়ে ওঠা নিজস্ব প্লান্টে তুষ পুড়িয়ে বাষ্প উৎপাদন হচ্ছে। এটি গ্যাসের বিকল্প জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে কারখানায়। উইভিং, ডায়িং, ওয়াশিং, ফিনিশিং ইউনিটে নিরবচ্ছিন্নভাবে উৎপাদন চলছে। তাই সরকারি সরবরাহ লাইনের গ্যাসের সংকটে এই প্রতিষ্ঠানে তেমন কোনো প্রভাব পড়ছে না। ঘড়ির কাঁটা মেনে চলছে কারখানার চাকা। প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তারা জানান, হুগোবস, সিঅ্যান্ডএ, জারা, জেসিপেনির মতো বিশ্ববিখ্যাত ব্র্যান্ডের রপ্তানি আদেশ এখানে ১২ মাসই আসছে।
কর্মকর্তারা জানান, এটা আহামরি কোনো প্রযুক্তি নয়। রয়েছে বিশাল আকারের স্বয়ংক্রিয় চালকল। ঘণ্টায় ১০ টন চাল ছাঁটাইয়ে সক্ষমতা সম্পন্ন এই চালকল ২৪ ঘণ্টা চালু থাকে। মোট চালের তিন ভাগের এক ভাগ তুষ পাওয়া যায়।
সরেজমিন দেখা যায়, চালকলের মুখে স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতিতে ধান চলে যাচ্ছে। বিভিন্ন পর্যায় পার হয়ে চাল আর তুষ আলাদা হচ্ছে। কনভেয়ার বেল্ট পার হয়ে চুলায় চলে যাচ্ছে তুষ। সেখানে বিশেষ পদ্বতিতে পুড়ে বাষ্প তৈরি হচ্ছে। এই বাষ্প দীর্ঘ পাইপ হয়ে চলে যাচ্ছে মিথিলার মূল কারখানার উইভিং, ডাইং ও ফিনিশিং বিভাগে।
দিনে ২০ হাজার কিউবিক মিটার গ্যাস উৎপাদন
কারখানার কর্মকর্তারা জানান, এ প্রক্রিয়ায় প্রতিদিন ২০ হাজার ১৬০ কিউবিক মিটার গ্যাস উৎপাদন হচ্ছে। এতে কারখানার চারটি ইউনিটের মোট চাহিদার ৭০ শতাংশের জোগান হচ্ছে। মাসে প্রতিষ্ঠানটির ৬০ লাখ গজ বস্ত্র উৎপাদনের সক্ষমতা আছে। গ্যাসের এই সংকটকালে দেশের বৃহত্তম দুটি টেক্সটাইল মিলে মাসে ১৫ লাখ গজ বস্ত্র সরবরাহ করা হচ্ছে এই প্রতিষ্ঠান থেকে।
জোগান ৭০ শতাংশ কেন, কেন শতভাগ নয়, এ প্রশ্নে মিথিলা গ্রুপের চেয়ারম্যান মো. আজহার খান সমকালকে বলেন, ‘১০-১২ বছর আগের চিন্তা। গ্যাসের এ রকম ভয়াবহ সংকট হতে পারে তখন মাথায় আসেনি। তখন মাথায় এলে শতভাগ উৎপাদনের ব্যবস্থা করতাম।’ অবশ্য সময় সাপেক্ষ হলেও এখন বিকল্প জ্বালানির শতভাগ উৎপাদন বিনিয়োগ সম্প্রসারণের কথা ভাবছেন তিনি।
জাতীয় গ্রিডে চাপ কমছে
বিকল্প এই বাষ্প উৎপাদনে একদিকে মাসে জাতীয় গ্রিডের এক কোটি টাকা মূল্যের গ্যাস সাশ্রয় হচ্ছে, পাশাপাশি জাতীয় গ্রিডে চাপও কিছুটা কমছে। এ প্রক্রিয়ায় বাষ্প পেতে মোটামুটি ৫০ কোটি টাকার মতো প্রাথমিক বিনিয়োগ করতে হয়েছে। স্বয়ংক্রিয় মেশিনারিজ আমদানি এবং সংযোজনে অন্তত দুই বছর সময় লেগে যায়। এ রকম প্রক্রিয়া শেষে ২০১৮ সালে উৎপাদন শুরু করে মিথিলা।
বিকল্প জ্বালানির এই উৎপাদন ব্যবস্থা নিয়ে ব্র্যান্ড ক্রেতার আগ্রহের বিষয়ে আজহার খান জানান, রপ্তানি আদেশের অভাব নেই। বছরজুড়ে কাজ থাকে। পৃথিবীর বিখ্যাত সব ব্র্যান্ড তাদের বস্ত্র আমদানি করে থাকে। সরেজমিন করার সময়ও কারখানায় ৮ ব্র্যান্ড ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিকে বসে থাকতে দেখা যায়। এর মধ্যে বাংলাদেশের পোশাকের স্পর্শকাতর ক্রেতা হিসেবে পরিচিত জাপানের ইউনিক্লোর প্রতিনিধিও ছিলেন। বিশেষ করে জ্বালানির আপৎকালে ক্রেতাদের চাপ বেশি থাকে। বস্ত্রের দর নিয়েও খুব বেশি কষাকষির প্রয়োজন হয় না।
ইউরোপের একটি বিখ্যাত ব্র্যান্ডের ঢাকার প্রতিনিধি সমকালকে বলেন, এখন সময়ই টাকা। ফাস্ট ফ্যাশনের যুগে যত দ্রুত সম্ভব পণ্য চায় ভোক্তা। সে কারণে মিথিলা এখন সবচেয়ে ভালো বিকল্প।
লাইনের গ্যাসের চেয়ে বাষ্প উৎপাদন খরচ বেশি
জানা গেল, বিকল্প এই জ্বালানির অসুবিধা হচ্ছে, উৎপাদন খরচ কিছুটা বেশি। এই প্রক্রিয়ায় বাষ্প উৎপাদন খরচ জাতীয় গ্রিডের গ্যাসের মূল্যের চেয়ে প্রায় দ্বিগুণ। আজহার খান জানান, নিজস্ব প্লান্টের গ্যাসের বিকল্প বাষ্পের কারণে উৎপাদন খরচ বেশি হলেও বাণিজ্যিকভাবে খুব বেশি সমস্যা হয় না। অনেক বস্ত্র ও পোশাক কারখানা যেখানে বন্ধ, সেখানে মিথিলার উৎপাদন চলছে নির্বিঘ্নে। উৎপাদিত চাল বাণিজ্যিকভাবে বাজারজাত হচ্ছে সফলভাবে। মিথিলা গ্রুপের ১৫শ শ্রমিক পরিবারের সারা বছরের চাল দেওয়া হচ্ছে রেয়াতি মূল্যে। কারখানায় তাদের তিনবেলা খাবারও দেওয়া হচ্ছে ভর্তুকি মূল্যে।
কারখানার চালকল বিভাগের সুপারভাইজার আব্দুল আউয়াল বলেন, ‘সব কিছু ঠিক আছে, বেতন খাওন কোনো সমস্যা নাই। সমস্যা হয় শব্দে। শব্দে এক্কেবারের কান ঝালাপালা।’
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় বুয়েটের কেমিকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন সমকালকে বলেন, তুষকে বাষ্প করে গ্যাসে রূপান্তরের এই প্রক্রিয়াকে গ্যাসিফিকেশন বলা হয়। এক সময় দেশে গ্যাসের সংকট ছিল না। সে কারণে শিল্প উদ্যোক্তাদের মাথায় এ রকম বিকল্প চিন্তা আসেনি। এখন গ্যাস সংকট যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তাতে এ ধরনের বিকল্প জ্বালানির উদ্যোগ প্রশংসার দাবি রাখে। খরচ কিছুটা বেশি হলেও সংকটকালে উৎপাদন চলছে; সেটা অনেক বড় বিষয়। অবশ্য গ্যাসের দর দফায় দফায় বাড়ানোর পর এখন আর বিকল্প এই ব্যবস্থার উৎপাদন ব্যয় বেশি হওয়ার কথা নয়। শিল্পে বিনিয়োগের স্বার্থে এ ধরনের উদ্যোগকে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।
মিথিলা কারখানাটি নির্মাণ করা হয়েছে সবুজ প্রযুক্তিতে। সবুজ অবকাঠামোর জন্য প্রতিষ্ঠানটি লিড প্লাটিনাম সনদ অর্জন করেছে। ওভেন টেক্সটাইল কারখানা হিসেবে একমাত্র মিথিলা টেক্সটাইল এই অর্জন করেছে। আর সব ধরনের শিল্পের বিবেচনায় মিথিলার অবস্থান বিশ্বে পঞ্চম। যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড স্টেট গ্রিন বিল্ডিং কাউন্সিল (ইউএসজিবিসি) এ সনদ দিয়ে থাকে। ভবন নির্মাণ থেকে শুরু করে উৎপাদনের সব পর্যায়ে পরিবেশ এবং প্রতিবেশ সুরক্ষা, সাশ্রয়ী এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার; এমনকি শ্রমিকের স্বার্থ কতটা সুরক্ষা পেল– এসব কঠিন নিক্তির মাপে বছরের পর বছর যাচাইয়ের মাধ্যমে লিড সনদ দিয়ে থাকে ইউএসজিবিসি। ২০১৮ সালে মিথিলাকে লিড প্লাটিনাম সনদ দেয় ইউএসজিবিসি। লিডের চার ক্যাটেগরির মধ্যে প্লাটিনাম সর্বোচ্চ মানের। গোল্ড, সিলভার ও সাধারণ সনদ নামে আরও তিনটি ক্যাটেগরি আছে।