ইফতেখার আলম বিশাল, রাজশাহী প্রতিনিধি: রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে প্ল্যাটফর্ম সম্প্রসারণের কাজ করতে গিয়ে মাটির নিচে থাকা সরকারি ডিজেল সংরক্ষণ ট্যাংকের পাইপ ফেটে বিপুল পরিমাণ ডিজেল ছড়িয়ে পড়ার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, ট্যাংকে সংরক্ষিত প্রায় ১০ হাজার লিটার ডিজেল ড্রেনে ভেসে গেছে। তবে প্রকৃতপক্ষে কত লিটার ডিজেল অপচয় হয়েছে এবং এতে সরকারের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ কত—তা এখনো নিশ্চিত করেনি রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ।
শনিবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনের ৮ নম্বর প্ল্যাটফর্মসংলগ্ন এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।
রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, স্টেশনের তেলের ডিপোতে ট্রেনের ইঞ্জিন ও পাওয়ার কারের জন্য সরকারি বরাদ্দের ডিজেল সংরক্ষণ করা হয়। সেখানে একটি ট্যাংকের ধারণক্ষমতা প্রায় ৩০ হাজার লিটার। পাশাপাশি পদ্মা ও যমুনা ওয়েলের এজেন্সিও রয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ৮ নম্বর প্ল্যাটফর্মের নতুন কাজের অংশ হিসেবে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এসকেভেটর দিয়ে মাটি কাটার সময় মাটির নিচে থাকা ডিজেল সরবরাহের পাইপটি কেটে ফেলে। এতে ট্যাংকে সংরক্ষিত ডিজেল দ্রুত বের হয়ে পাশের ড্রেনে ছড়িয়ে পড়ে।
সরেজমিনে দেখা যায়, তেলের ডিপোর পাশ দিয়ে একটি ড্রেন শিরোইল কলোনির দিকে চলে গেছে। ওই ড্রেনে ছড়িয়ে পড়া তেল স্থানীয়দের অনেকেই বালতি ও বিভিন্ন পাত্র দিয়ে সংগ্রহ করছেন। কেউ কেউ ড্রামেও তেল জমা করছেন। এতে ঘটনাস্থলে মানুষের ভিড় তৈরি হয়।
প্রশ্ন উঠেছে, মাটির নিচে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহের পাইপলাইন থাকার পরও কাজ শুরুর আগে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে সেগুলোর অবস্থান ও নকশা সম্পর্কে যথাযথভাবে অবহিত করা হয়েছিল কি না। কাজ শুরুর আগে রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী বা দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জায়গাটি পরিদর্শন করে ঠিকাদারকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছিলেন কি না, সেটিও এখন সামনে এসেছে।
ঘটনার বিষয়ে রেলওয়ের এসএই এআইডব্লিউ মো. ইমরান হোসেন বলেন, ৮ নম্বর লাইনে নতুন করে মাটি কাটার কাজ করার সময় পাইপটি কেটে যায়। ঢাকার ‘রুবেল এন্টারপ্রাইজ’ নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সেখানে কাজ করছে। পুরোনো লাইনের জায়গায় নতুন করে কাজ করতে গিয়ে এ ঘটনা ঘটেছে।
তিনি বলেন, ‘‘ঘটনার খবর পাওয়ার পর আমরা চেক ভালভ বন্ধ করে দিয়েছি।’’
ট্যাংকে কত পরিমাণ ডিজেল ছিল জানতে চাইলে তিনি জানান, সেখানে ৩০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার একটি ট্যাংক রয়েছে এবং স্টক থাকে।
তবে মাটির নিচে কোথায় কোথায় পাইপলাইন রয়েছে, সে বিষয়ে তিনি বলেন, ‘‘আমি চলতি মাসেই রেলওয়েতে যোগদান করেছি। মাটির নিচে কী কী লাইন সংযোগ গেছে এবং কোথায় কোথায় গেছে, তা আমি বলতে পারব না।’’
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, ট্যাংকে থাকা প্রায় ১০ হাজার লিটার ডিজেল ড্রেনে চলে গেছে। তবে রেলওয়ের পক্ষ থেকে এখনো ওই পরিমাণ ডিজেল অপচয়ের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করা হয়নি।
এখানেই বড় প্রশ্ন—ট্যাংকের ধারণক্ষমতা ৩০ হাজার লিটার হলে ঘটনার সময় এতে প্রকৃতপক্ষে কত লিটার ডিজেল মজুত ছিল? ঘটনার আগে ও পরে স্টক রেজিস্টারে কী পরিমাণ ডিজেল ছিল? পাইপ ফেটে যাওয়ার পর কত লিটার ডিজেল বের হয়েছে? কতটুকু উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে? আর কতটুকুই বা ড্রেন দিয়ে চলে গেছে?
এসব হিসাব নিরূপণ না হওয়া পর্যন্ত সরকারের আর্থিক ক্ষতির প্রকৃত চিত্রও স্পষ্ট হচ্ছে না। বাজারমূল্যে ডিজেলের বর্তমান দাম হিসাব করে ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণের পাশাপাশি অপচয় হওয়া জ্বালানি সরকারি হিসাব থেকে কীভাবে সমন্বয় করা হবে, সে প্রশ্নও উঠেছে।
অভিযোগ রয়েছে, ঠিকাদারি কাজ শুরুর আগে মাটির নিচে থাকা পাইপলাইন, বৈদ্যুতিক সংযোগ ও অন্যান্য অবকাঠামো চিহ্নিত করে নিরাপদভাবে কাজ পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়নি। যদি যথাযথভাবে নকশা যাচাই, স্থান চিহ্নিতকরণ ও প্রকৌশলগত তদারকি করা হয়ে থাকে, তাহলে কীভাবে এসকেভেটরের আঘাতে সরকারি ডিজেল সরবরাহের পাইপলাইন ক্ষতিগ্রস্ত হলো—এ প্রশ্নেরও জবাব প্রয়োজন।
এ ঘটনায় রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ, প্রকৌশলী, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এবং তদারকির দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিদের ভূমিকা খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। একই সঙ্গে ডিজেল অপচয়ের ঘটনায় সরকারি সম্পদের ক্ষতি হলে তার দায় কার—সেটিও তদন্তের মাধ্যমে নির্ধারণের দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান যান্ত্রিক প্রকৌশলী মো. আমিনুল হাসানের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ফলে এ বিষয়ে তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এদিকে ঘটনার ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গেলে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) হাবিলদার মিজানুর রহমান গণমাধ্যমকর্মীদের কাজে বাধা দেন এবং তাঁদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। ঘটনাস্থলে ভিডিও ধারণে বাধা দেওয়ার পাশাপাশি সাংবাদিকদের নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য করার অভিযোগও করেন উপস্থিত গণমাধ্যমকর্মীরা।
এ বিষয়ে আরএনবি পশ্চিমের চিফ কমান্ড্যান্ট আসাবুল ইসলাম বলেন, সাংবাদিকদের সঙ্গে এ ধরনের আচরণ করা কোনোভাবেই উচিত হয়নি। বিষয়টি খতিয়ে দেখে ওই সদস্যের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
একদিকে সরকারি জ্বালানি সংরক্ষণের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা, অন্যদিকে তার পাশেই চলমান নির্মাণকাজ। এমন স্পর্শকাতর এলাকায় মাটি কাটার আগে প্রয়োজনীয় সমন্বয় ও তদারকি করা হয়েছিল কি না, এখন সেটিই বড় প্রশ্ন।
সরকারি সম্পদ রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর গাফিলতি থাকলে তার দায় এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। মাত্র কয়েক মিনিটের একটি দুর্ঘটনায় যদি সত্যিই হাজার হাজার লিটার সরকারি ডিজেল নষ্ট হয়ে থাকে, তাহলে এটি নিছক দুর্ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ আছে কি না—সেটিও তদন্তের বিষয়।
তাই ঘটনার পর শুধু পাইপের ভালভ বন্ধ করেই দায়িত্ব শেষ নয়; ট্যাংকের ঘটনার আগের ও পরের স্টক হিসাব, পাইপলাইনের নকশা, ঠিকাদারি কাজের অনুমোদন, কাজ শুরুর আগে সাইট পরিদর্শনের নথি, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব এবং প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ নির্ধারণে দ্রুত তদন্ত প্রয়োজন।