শিরোনাম
◈ ম্যাকাই টেস্টে ভয়াবহ বিপর্যয়, ১২ রানেই ৫ উইকেট হারাল বাংলাদেশ ◈ ধেয়ে আসছে শক্তিশালী এল নিনো, ২০২৭ হতে পারে ইতিহাসের উষ্ণতম বছর ◈ স্থানীয় সরকারে মঈন খান: অভিজ্ঞ নেতৃত্বের সামনে বড় পরীক্ষা ◈ ছাত্র অবস্থায় এমপি, দুই দশক পর প্রতিমন্ত্রী শামীম লিংকন ◈ দুই প্রতিমন্ত্রী এক মন্ত্রণালয়ে ◈ ফাঁস দিয়ে মৃত্যুর মিছিল, ৬ মাসে ১০০ জনের মৃত্যু ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়  ◈ প্রথমবার পূর্ণমন্ত্রী হওয়া রশিদুজ্জামান মিল্লাতের রাজনৈতিক উত্থান যেভাবে ◈ মন্ত্রিসভায় রদবদলের প্রজ্ঞাপন জারি: কে কোন মন্ত্রণালয়ে ◈ শনিবার টানা ১১ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকবে না যেসব এলাকায় ◈ শ‌নিবার শুরু দ্বিতীয় টেস্ট, জিত‌লে ইতিহাস গড়বে  বাংলাদেশ, অস্ট্রেলিয়ার লক্ষ্য হোয়াইটওয়াশ এড়ানো

প্রকাশিত : ২৪ জুন, ২০২৬, ১১:২৫ দুপুর
আপডেট : ১৩ আগস্ট, ২০২৬, ১১:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : মনজুর এ আজিজ

এলডিসি উত্তরণের পর ৯২ পণ্যে সুরক্ষা নিয়ে উদ্বেগ

মনজুর এ আজিজ: স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) মর্যাদা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশের বাণিজ্যনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন আসতে যাচ্ছে। এত দিন দেশীয় শিল্পকে বিদেশি প্রতিযোগিতা থেকে সুরক্ষা দিতে আমদানি পণ্যের ওপর বিভিন্ন ধরনের অতিরিক্ত কর ও শুল্ক আরোপ করা হলেও ভবিষ্যতে সেই সুযোগ আর থাকবে না। ফলে স্থানীয় শিল্প রক্ষায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ট্রেড রেমেডি ব্যবস্থার ওপর নির্ভরতা বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছেন গবেষকেরা।

বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) জন্য বাংলাদেশ ফরেন ট্রেড ইনস্টিটিউট (বিএফটিআই) পরিচালিত এক গবেষণায় এ সুপারিশ করা হয়েছে। জরিপ, সাক্ষাৎকার, ফোকাস গ্রুপ আলোচনা এবং অর্থনৈতিক বিশ্লেষণের ভিত্তিতে তৈরি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বর্তমান বাণিজ্য সুরক্ষাব্যবস্থা, ভবিষ্যৎ ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য করণীয় তুলে ধরা হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, এলডিসি সুবিধা হারানোর পর দেশীয় শিল্পকে রক্ষার জন্য নিয়ন্ত্রণমূলক শুল্ক, সম্পূরক শুল্ক, ন্যূনতম শুল্কমূল্য কিংবা অগ্রিম আয়করের মতো প্যারা ট্যারিফ ব্যবস্থাগুলো আর আগের মতো ব্যবহার করা যাবে না। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নিয়মের মধ্যে থেকে বিকল্প সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন দেখা দেবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে উন্মুক্ত বাজার ব্যবস্থায় দেশীয় শিল্প ও রপ্তানি খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বজায় রাখা। শুধু শুল্ক সুরক্ষার ওপর নির্ভর না করে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ একটি কার্যকর ট্রেড রেমেডি কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় কম দামে বা ভর্তুকিপ্রাপ্ত বিদেশি পণ্যের চাপে অনেক দেশীয় শিল্প ক্ষতির মুখে পড়তে পারে। ট্রেড রেমেডি হলো আন্তর্জাতিকভাবে অনুমোদিত এমন একটি প্রতিরক্ষাব্যবস্থা, যার মাধ্যমে কোনো দেশ অন্যায্য আমদানি প্রতিযোগিতা থেকে নিজস্ব শিল্পকে সুরক্ষা দিতে পারে।

যদি কোনো বিদেশি প্রতিষ্ঠান উৎপাদন খরচের চেয়েও কম দামে পণ্য বিক্রি করে, সরকারি ভর্তুকির সুবিধা নিয়ে কম মূল্যে রপ্তানি করে অথবা হঠাৎ বিপুল পরিমাণ পণ্য বাজারে সরবরাহ করে স্থানীয় শিল্পকে ক্ষতিগ্রস্ত করে, তাহলে সংশ্লিষ্ট দেশ ট্রেড রেমেডি ব্যবস্থা নিতে পারে। এই ব্যবস্থার প্রধান তিনটি অংশ হলো অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক, কাউন্টারভেইলিং শুল্ক এবং সেফগার্ড ব্যবস্থা।

ডাম্পিংয়ের মাধ্যমে বাজারে অস্বাভাবিক কম দামে পণ্য প্রবেশ করলে অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করা যায়। একইভাবে বিদেশি সরকারের ভর্তুকিপ্রাপ্ত পণ্যের ক্ষেত্রে কাউন্টারভেইলিং শুল্ক প্রয়োগের সুযোগ রয়েছে। আবার আমদানি হঠাৎ বেড়ে গিয়ে স্থানীয় শিল্পের ক্ষতি হলে সাময়িক সুরক্ষা হিসেবে সেফগার্ড ব্যবস্থা নেওয়া যায়। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের তথ্য বিশ্লেষণ করে গবেষকেরা দেখেছেন, এইচএস চার অঙ্কের শ্রেণিবিন্যাসে অন্তত ৯২টি পণ্য ভবিষ্যতে সুরক্ষার প্রয়োজন হতে পারে। এর মধ্যে ১৫টি পণ্যের ক্ষেত্রে ডাম্পিংয়ের ঝুঁকি রয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

ঝুঁকিপূর্ণ পণ্যের তালিকায় রয়েছে শুকনা ফল, চিনিজাত মিষ্টান্ন, সংরক্ষিত ফল ও বাদাম, মোটরযানের রাবার টায়ার, স্প্লিট শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র এবং খেলনা। পাশাপাশি বিভিন্ন ধরনের বস্ত্রপণ্যও ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। গবেষণায় বলা হয়েছে, তুলার কাপড়, কৃত্রিম তন্তুর কাপড়, পাইল ও শেনিল কাপড়, টিউল ও জালজাতীয় কাপড়, প্রলেপযুক্ত বস্ত্র এবং নিট কাপড়ের ক্ষেত্রে দেশীয় উৎপাদকরা বাড়তি প্রতিযোগিতার মুখে পড়তে পারেন। বর্তমানে এসব পণ্য ন্যূনতম শুল্কমূল্যের আওতায় থাকলেও এলডিসি উত্তরণের পর বিকল্প সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন হবে।

প্রতিবেদনে ভারত ও চীনের বিভিন্ন সরকারি ভর্তুকি কর্মসূচির আওতায় উৎপাদিত ১২টি পণ্যের বিরুদ্ধে কাউন্টারভেইলিং শুল্ক আরোপের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ভারত থেকে আমদানি হওয়া পেঁয়াজ, রং ও রঞ্জক, তুলার সুতা, কৃত্রিম বস্ত্র, স্টিল বিলেট, স্টেইনলেস স্টিলজাত পণ্য এবং ইলেকট্রনিক সমন্বিত বর্তনীর ক্ষেত্রে উৎপাদন-সংযুক্ত প্রণোদনা, মূলধনি ভর্তুকি ও বিশেষ সহায়তার তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

অন্যদিকে চীনের কৃষিযন্ত্রের যন্ত্রাংশ, লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি এবং সৌর প্যানেল উৎপাদনে সরকারি অনুদান, কর ছাড় ও মূল্য সংযোজন কর সুবিধার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। গবেষকদের মতে, এসব সহায়তা উৎপাদন ব্যয় কমিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারে কৃত্রিম মূল্য সুবিধা তৈরি করতে পারে। তবে কোনো ধরনের শুল্ক আরোপের আগে যথাযথ তদন্ত ও ক্ষতির প্রমাণ উপস্থাপন করতে হবে।

পাট, হাইড্রোজেন পার–অক্সাইড, বস্ত্র ও গ্লাভসসহ বিভিন্ন খাতের বিরুদ্ধে বিদেশে হওয়া অ্যান্টি-ডাম্পিং ও কাউন্টারভেইলিং তদন্ত বিশ্লেষণ করে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠানগুলো প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহ, আইনি লড়াই এবং কারিগরি প্রস্তুতির ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে। গবেষকদের মতে, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, তথ্যপ্রাপ্তির ঘাটতি এবং দীর্ঘসূত্রতা রপ্তানিকারকদের জন্য বড় বাধা হয়ে আছে। বিদেশি তদন্তের জবাব দেওয়ার ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ এখনো যথেষ্ট প্রস্তুত নয়।

প্রতিবেদনে ভারত, পাকিস্তান, চীন, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য, মালয়েশিয়া, ভিয়েতনাম, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল ও আর্জেন্টিনার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। এসব দেশে ডিজিটাল নজরদারি, আগাম সতর্কতাব্যবস্থা, দ্রুত তদন্ত, বিশেষজ্ঞ জনবল এবং শক্তিশালী তথ্যভান্ডারের মাধ্যমে ট্রেড রেমেডি ব্যবস্থাকে কার্যকর করা হয়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও এইচএস ছয় অঙ্কভিত্তিক আগাম সতর্কতাব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে, যাতে সম্ভাব্য ঝুঁকি আগে থেকেই শনাক্ত করা যায়।

গবেষণা প্রতিবেদনের সুপারিশ প্রসঙ্গে বাণিজ্যসচিব আতাউর রহমান খান বলেছেন, এলডিসি উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য বাংলাদেশ আবেদন করেছে। অতিরিক্ত সময় পাওয়া গেলে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ বাড়বে। তবে কম সময় পেলেও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণে সরকার প্রস্তুত রয়েছে। তিনি জানান, গবেষণার সুপারিশগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে। বাংলাদেশ নিট পোশাক উৎপাদক ও রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ হাতেমের মতে, এলডিসি-পরবর্তী বাস্তবতা মোকাবিলায় এখনই একটি সুস্পষ্ট পথনকশা তৈরি করা প্রয়োজন।

এ কাজে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর পাশাপাশি বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। গবেষণায় এশিয়া ও মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে রপ্তানি সম্প্রসারণের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি বন্দর ব্যবস্থাপনা, পরিবহন অবকাঠামো এবং বাণিজ্য সহায়তাব্যবস্থা উন্নত করে পরিবহন ব্যয় কমানোর সুপারিশ করা হয়েছে। এ ছাড়া পণ্যের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি, মানোন্নয়ন, দ্বিপক্ষীয় ও আঞ্চলিক মুক্তবাণিজ্য চুক্তিতে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং অর্থনৈতিক কূটনীতি জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।

প্রতিবেদনে বিটিটিসির অধীনে বিশেষায়িত ট্রেড রেমেডি ইউনিট গঠন, আগাম সতর্কতা ড্যাশবোর্ড চালু, রপ্তানিকারকদের জন্য প্রতিরক্ষা সেল প্রতিষ্ঠা এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বয় বাড়ানোর সুপারিশও করা হয়েছে। একই সঙ্গে ছয় মাস মেয়াদি স্বল্পমেয়াদি এবং তিন থেকে পাঁচ বছর মেয়াদি দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা তৈরির পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। বাণিজ্যবিশেষজ্ঞ ও বিটিটিসির সাবেক সদস্য মোস্তফা আবিদ খানের মতে, এলডিসি উত্তরণের সময় দ্রুত এগিয়ে আসছে এবং প্যারা ট্যারিফ বজায় রাখার সুযোগ আর থাকবে না। তাই সরকারি ও বেসরকারি উভয় খাতের সক্ষমতা বৃদ্ধি, উৎপাদন ও আমদানি তথ্য সহজলভ্য করা এবং প্রতিকার চাওয়ার প্রাতিষ্ঠানিক দক্ষতা গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়