মনজুর এ আজিজ: দেশের ব্যাংক খাতে শৃঙ্খলা ও সুশাসন জোরদারে অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোনো ব্যাংক আইন, নীতিমালা বা নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা লঙ্ঘন করলে আর নমনীয়তা দেখানো হবে না বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান। অনিয়ম, জালিয়াতি কিংবা বিধিবহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশও দেওয়া হয়েছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকে অনুষ্ঠিত তদারকি-সংশ্লিষ্ট একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে এ নির্দেশনা দেওয়া হয়। বৈঠকে তদারকি কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বিভিন্ন বিভাগের পরিচালক, নির্বাহী পরিচালক এবং সংশ্লিষ্ট ডেপুটি গভর্নররা অংশ নেন। সেখানে ব্যাংক খাতে জবাবদিহি বাড়ানো, নিয়ম মেনে কার্যক্রম পরিচালনা নিশ্চিত করা এবং অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করা হয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে অনেক ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর ছোট-বড় বিভিন্ন অনিয়মের ঘটনায় সতর্কবার্তা দিয়ে দায় শেষ করা হয়েছে। কোথাও জরিমানার বিধান থাকলেও অনেক সময় ন্যূনতম শাস্তি প্রয়োগ করা হয়েছে। তবে এখন থেকে আইন যেটুকু সুযোগ দেয়, তার সর্বোচ্চ সীমা পর্যন্ত শাস্তি ও আর্থিক জরিমানা আরোপের নীতি অনুসরণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মতে, শাস্তির বিধানে নির্ধারিত অর্থদণ্ডের পরিমাণ বিভিন্ন ক্ষেত্রে ভিন্ন হলেও এতদিন অধিকাংশ ঘটনায় সর্বনিম্ন ব্যবস্থা নেওয়ার প্রবণতা ছিল। নতুন নির্দেশনার ফলে অনিয়মের মাত্রা ও গুরুত্ব বিবেচনায় সর্বোচ্চ জরিমানা আরোপের পথ আরও সক্রিয় হতে পারে। একই সঙ্গে কোনো ধরনের প্রভাব, সুপারিশ বা তদবিরকে গুরুত্ব না দেওয়ার বিষয়েও কঠোর অবস্থান জানানো হয়েছে।
ব্যাংক খাতে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ঋণ জালিয়াতি, তথ্য গোপন, ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ বিতরণ, দুর্বল করপোরেট সুশাসন এবং নিয়ন্ত্রক নির্দেশনা অমান্যের মতো নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব কারণে আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগও বেড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অনিয়মের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তি নিশ্চিত না হলে ব্যাংক ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা কঠিন হয়ে পড়ে। তাই নিয়ন্ত্রক সংস্থার কঠোর অবস্থান বাজারে ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংক চলতি বছরের শুরু থেকে তদারকি ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এনেছে। প্রচলিত পরিদর্শন পদ্ধতির পাশাপাশি তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণের ভিত্তিতে ঝুঁকিভিত্তিক তদারকি কার্যক্রম চালু করা হয়েছে। এই ব্যবস্থায় কোনো প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থান, ঋণ ঝুঁকি, মূলধন পরিস্থিতি এবং পরিচালনাগত দুর্বলতা আগেভাগেই শনাক্ত করার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে সমস্যা বড় আকার নেওয়ার আগেই প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু জরিমানা নয়, প্রয়োজনে দায়ী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক এবং আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা গেলে ব্যাংক খাতে জবাবদিহি আরও শক্তিশালী হবে। একই সঙ্গে সুশাসন প্রতিষ্ঠা, আমানতকারীদের আস্থা পুনরুদ্ধার এবং আর্থিক খাতের স্থিতিশীলতা রক্ষায় কঠোর তদারকি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নতুন বার্তা থেকে স্পষ্ট যে, ব্যাংকিং খাতে নিয়ম লঙ্ঘনের ঘটনায় আগের তুলনায় আরও কঠোর নজরদারি ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা দেখা যেতে পারে। এর মাধ্যমে আর্থিক খাতে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি এবং অনিয়ম নিরুৎসাহিত করার লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করা হচ্ছে।