বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার আবার চালু করতে চলমান সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছে ঢাকা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের মালয়েশিয়া সফরের সময় এ প্রস্তাব দেওয়া হয়।
বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বরে শেষ হবে। দ্রুত সংশোধন করা না হলে নতুন করে সমঝোতা স্মারক সই করতে হবে, যা সময়সাপেক্ষ হতে পারে।
অবশ্য দুই দেশই মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমাতে নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং সাশ্রয়ী করতে একমত হয়েছে। এতে কর্মীদের অভিবাসন ব্যয় কমে আসবে। তবে এসব প্রক্রিয়া শেষ করে বাংলাদেশিদের জন্য মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার খুলতে সময় লাগবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গত রোববার মালয়েশিয়া সফরে যান। পরদিন সোমবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠক শেষে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে ওয়ার্কিং গ্রুপ (জেডব্লিউজি) গঠনের কথা বলা হয়। ওয়ার্কিং গ্রুপ বিদ্যমান সমঝোতা স্মারকটি (এমওইউ) পর্যালোচনা করবে এবং বর্তমান বাস্তবতা ও দুই দেশের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) প্রণয়নের ভিত্তি তৈরি করবে। তবে দ্রুত শ্রমবাজার খুলতে বাংলাদেশ চায় সমঝোতা স্মারকের সংশোধন।
জনশক্তি রপ্তানিকারকরা সমকালকে বলেন, নতুন করে সমঝোতা স্মারক সই করার প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ। চলমান সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করতে দুই বছর ধরে আলোচনা করতে হয়েছে। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে পাঁচ বছরের জন্য তা স্বাক্ষরিত হয়।
যদিও প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী গতকাল মঙ্গলবার সংসদে জানিয়েছেন, সরকার মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে কাজ করছে। আশা করা যায়, দ্রুত দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মী পাঠানোর পথ সুগম হবে।
প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী নুরুল হক নুর সমকালকে বলেন, ‘মালয়েশিয়ার সঙ্গে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।’
গত সোমবার মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী আনোয়ার ইব্রাহিমের সঙ্গে বৈঠকে তারেক রহমান বাংলাদেশিদের জন্য শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার অনুরোধ জানান। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘আরও বেশি বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগের বিষয়টি বিবেচনা এবং যত দ্রুত সম্ভব শ্রমবাজার উন্মুক্ত করার অনুরোধ জানিয়েছি মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীকে। আমরা একমত হয়েছি, নিয়োগ প্রক্রিয়া স্বচ্ছ, ন্যায্য এবং সাশ্রয়ী হতে হবে, যাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা কমে এবং কর্মীদের খরচ হ্রাস পায়।’
বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে প্রতারণা, প্রতিশ্রুত চাকরি ও বেতন না দেওয়া এবং অমানবিক পরিবেশে কাজ করতে বাধ্য করায় মালয়েশিয়া বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার সমালোচনার মুখে রয়েছে। যৌথ সংবাদ সম্মেলনে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেছেন, বাংলাদেশি কর্মীদের শোষণ, তাদের সঙ্গে খারাপ আচরণ বা শুধু কোম্পানির লাভের জন্য তাদের ব্যবহার করা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না। কর্মী নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া ন্যায্য ও মানবিক করা এবং শ্রমিক ও তাদের পরিবারের স্বার্থ রক্ষায় জোর দিয়েছেন আনোয়ার ইব্রাহিম।
মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বন্ধ থাকে বেশি
জনশক্তি রপ্তানিকারকদের সংগঠন বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম সমকালকে বলেন, বিদ্যমান সমঝোতা স্মারক সংশোধন করে দ্রুত শ্রমবাজার উন্মুক্ত করা সম্ভব। নতুন সমঝোতা স্মারক সই করতে সময় লাগবে। সে ক্ষেত্রে শিগগিরই কর্মী পাঠানো যাবে না।
বায়রার সাবেক মহাসচিব শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান গুরুত্ব দিচ্ছেন শ্রমবাজার যেন টেকসই হয়। তিনি বলেন, নব্বইয়ের দশক থেকেই মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশিদের জন্য যতদিন খোলা থাকে; বন্ধ থাকে এর চেয়ে বেশি। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানো ২০০৯ সালে বন্ধ হয়। এরপর ২০১৫ সালে সমঝোতা স্মারক সই হলে ২০১৬ সালে কর্মী পাঠানো শুরু হয়। ২০১৮ সালে কর্মী পাঠানো আবার বন্ধ হয়ে যায়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে আবার সমঝোতা স্মারক হয়। ২০২২ সালের আগস্টে কর্মী পাঠানো শুরু হয়ে ২০২৪ সালের মে মাসে আবার বন্ধ হয়। কর্মী পাঠানো এখনও বন্ধ আছে। তিনি বলেন, সর্বশেষ সমঝোতা স্মারকের মেয়াদ আগামী ডিসেম্বর মাসে শেষ হবে। তাই এমন একটি পদ্ধতি নির্ধারণ করা হোক, যখন অন্যান্য দেশ থেকে মালয়েশিয়া কর্মী নেবে, তখন বাংলাদেশ থেকেও নিয়োগ দেবে।
জনশক্তি ব্যবসায়ীরা জানান, ১৪টি দেশ থেকে কর্মী নিয়োগ করে মালয়েশিয়া। বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ থাকলেও বাকি ১৩ দেশ থেকে কর্মী নিয়োগ চালু থাকে। শুধু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে কখনও খোলা, কখনও বন্ধ থাকে। এর কারণ দুদেশের জনশক্তি রপ্তানির সঙ্গে যুক্ত ব্যবসায়ী ও আমলাদের সিন্ডিকেট।
২০২১ সালে স্বাক্ষরিত সমঝোতার স্মারকের বর্ধিতাংশের ৫, ৬ ও ৭ ধারা অনুযায়ী, বাংলাদেশ সব বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা মালয়েশিয়ায় পাঠাবে। মালয়েশিয়া সরকার সেখান থেকে ঠিক করবে কোন কোন এজেন্সি কর্মী পাঠাতে পারবে।
২০২২ সালে বাংলাদেশ দেড় হাজার রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা দিয়েছিল। মালয়েশিয়ার তৎকালীন সরকার ২৫ এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দিয়েছিল। কীসের ভিত্তিতে এসব প্রতিষ্ঠানকে বাছাই করা হয়েছিল, তা কখনও ব্যাখ্যা করেনি তারা। এই ২৫ প্রতিষ্ঠানকে তখন ‘সিন্ডিকেট’ বলা শুরু হয়। ২০১৫ সালেও সিন্ডিকেট নামে পরিচিতি পাওয়া ১০ এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দেওয়া হয়। তৎকালীন ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টির এমপি, মন্ত্রী, নেতারা ছিলেন অধিকাংশ এজেন্সির মালিক।
এবার কী হবে
শ্রমবাজার খোলার আলোচনা করতে আগামী মাসে মালয়েশিয়ার মানব সম্পদমন্ত্রী আর. রামানান ঢাকা সফরে আসতে পারেন। তিনি সোমবার এক বিবৃতিতে বলেছেন, কর্মী নিয়োগ প্রক্রিয়াকে শোষণ, বৈষম্য ও আর্থিক লেনদেনমুক্ত রাখতে মালয়েশিয়া ও বাংলাদেশের যৌথ অঙ্গীকারের অংশ হিসেবে এ উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। সুশাসন, শ্রমিক কল্যাণ এবং নৈতিক নিয়োগ ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন, যা উভয় দেশের জন্যই উপকারী হবে।
ঢাকার জনশক্তি রপ্তানিকারকদের দাবি, কর্মী নিয়োগের সিন্ডিকেটের ‘গোড়া’ মালয়েশিয়া। সে দেশের সরকারের প্রভাবশালী অংশ এর নিয়ন্ত্রক। বাংলাদেশে থাকা প্রভাবশালীরা তাদের সহযোগী। তারেক রহমান মালয়েশিয়া সফরে সে দেশের প্রধানমন্ত্রী ছাড়াও সর্বোচ্চ পর্যায়ে শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে কথা বলেছেন। শ্রমবাজার নিয়ন্ত্রণে এদের অনেকের প্রভাব থাকে।
বিভিন্ন সূত্র সমকালকে জানায়, মালয়েশিয়ায় বিদেশি কর্মী নিয়োগে কাজ করে ফরেন ওয়ার্কার্স সেন্ট্রালাইজড ম্যানেজমেন্ট সিস্টেমের (এফডব্লিউসিএমএস) নিয়ন্ত্রক প্রতিষ্ঠান বেস্টিনেট। এর মালিক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত মালয় নাগরিক আমিনুল ইসলাম নুর। তিনি বাংলাদেশের ব্যবসায়ীদের নিয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন বলে অভিযোগ আছে। বাংলাদেশ অংশে এর নেতৃত্বে ছিলেন ২৫ এজেন্সির ‘সমন্বয় করা’ ক্যাথারসিস ইন্টারন্যাশনালের মালিক রুহুল আমিন স্বপন।
২০২২ সালের আগস্টে নিয়োগের সময় প্রত্যেক কর্মীর ব্যয় নির্ধারণ করা হয়েছিল ৭৮ হাজার ৯৯০ টাকা। কিন্তু মালয় শ্রমিক ইউনিয়নের গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রত্যেক কর্মীর কাছ থেকে ৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা আদায় করা হয়। হাজারো কর্মী এত টাকা খরচ করে মালয়েশিয়া গিয়েও প্রতিশ্রুত চাকরি পাননি। অনেককে ভুয়া চাকরির চাহিদাপত্র দিয়ে নেওয়া হয়।
সমকালে ওই সময় প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, সেবার সিন্ডিকেটে থাকা এজেন্সিগুলোকে কর্মীপ্রতি দেড় লাখ টাকা দিতে হয়েছিল বেস্টিনেটকে। প্রত্যেক কর্মীর চাহিদাপত্রের জন্য মালয়েশিয়ায় থাকা মধ্যস্বত্বভোগীকে দিতে হয় ছয় হাজার রিঙ্গিত, যা ওই সময়ের বিনিময় মূল্যে দেড় লাখ টাকা। এ ছাড়া ঢাকায় সিন্ডিকেটে প্রবেশের চাঁদা ছিল কর্মীপ্রতি এক লাখ সাত হাজার টাকা।
নিয়োগকারীদের দেওয়া চাহিদাপত্র এফডব্লিউসিএমএসে ‘অটো রোটেশন’-এর মাধ্যমে বণ্টন করা হয়েছিল। এমপি-মন্ত্রীদের প্রতিষ্ঠান অটো রোটেশনে পাওয়া চাহিদাপত্র ‘বিক্রি’ করে কোটি টাকা কামিয়ে নেয় বলেও অভিযোগ ওঠে।
এসব অনিয়ম বন্ধ করতে বিদ্যমান এমওইউ সংশোধন করে এজেন্সি বাছাই ও অটো রোটেশনের শর্ত বাতিল করলে সিন্ডিকেট সমস্যার সমাধান হবে বলে মনে করেন জনশক্তি ব্যবসায়ীরা।
সূত্র: সমকাল