ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে তড়িঘড়ি করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি সম্পন্ন করেছিল অন্তর্বর্তী সরকার। সেই চুক্তির আলোকেই সম্প্রতি মার্কিন কোম্পানি ‘বোয়িং’ থেকে ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা দিয়ে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি সই করেছে বিএনপি সরকার। এ নিয়ে নানা মহলে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তি বাংলাদেশকে পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ করবে। বাংলাদেশ চাইলেও স্বাধীনভাবে অন্য কোনও দেশ থেকে কিছু কিনতে পারবে না। এর ফলে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে আমেরিকার একটি উপনিবেশে পরিণত হবে। দ্রুত বাংলাদেশের সব রাজনৈতিক দল আলোচনা করে এই চুক্তি থেকে সরে দাঁড়াতে হবে। নয়তো ভবিষ্যতে বাংলাদেশের জন্য বড় ধরনের বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্যচুক্তিকে ‘দাসত্বের চুক্তি’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ। বাংলা ট্রিবিউনকে তিনি বলেন, ‘গত বছর থেকে আমরা এই চুক্তির বিরোধিতা করে আসছি। এই চুক্তি দাসত্বের চুক্তি। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের একটি উপনিবেশ হিসেবে গড়ে উঠবে। অন্তর্বর্তী সরকারের এ ধরনের চুক্তি করার কোনো এখতিয়ার ছিল না। বাণিজ্যচুক্তির নামে বাস্তবে আমেরিকার সঙ্গে তাদের স্বার্থে প্রতিরক্ষা চুক্তি করা হয়েছে।’
অন্তর্বর্তী সরকার গোপনে এই চুক্তি সম্পাদন করে করেছে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘এই চুক্তির বিষয়ে ফেসবুকে স্ট্যাটাস দেওয়ার জন্য এনবিআরের এক কর্মকর্তা জেলে পর্যন্ত গেছে। এই চুক্তির মধ্য দিয়ে আমরা পরাধীনতার শৃঙ্খলে আবদ্ধ হয়েছি। বিএনপি সরকার যে এই চুক্তির আলোকে বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে, তার কোনও দরকার ছিল না। আমাদের দেশের বিশেষজ্ঞরা বারবার বলেছে, কিন্তু বিএনপি সরকার তা আমলে নেয়নি। ৪৫ হাজার কোটি টাকার এই চুক্তি দেশের কল্যাণে নয়, কিছু ব্যক্তির স্বার্থে হয়েছে। অনতিবিলম্বে এই চুক্তি বাতিল করতে হবে।’
বাংলাদেশ ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্যচুক্তিতে এমন সব শর্ত দেওয়া হয়েছে, স্বাধীনভাবে অন্য কোনও দেশের সঙ্গে কোনও বাণিজ্যচুক্তি করতে পারবে না। এমনকি কোনও প্রতিরক্ষা সরঞ্জাম বা কোনও সামরিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও কোনও চুক্তি বাংলাদেশ করতে পারবে না। চুক্তির মধ্যে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র যদি কোনও কিছু ঝুঁকিপূর্ণ মনে করে, তাহলে বাংলাদেশ সেটা করতে পারবে না।’
উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘এই চুক্তির কারণে এখন পারমাণবিক কোনও প্রকল্পের সরঞ্জামও রাশিয়া থেকে বাংলাদেশ আমদানি করতে পারবে না। বাংলাদেশ যদি চীন রাশিয়া অথবা অন্য যেকোনও দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে চায়, আমেরিকা যদি মনে করে এটা তার বাণিজ্যিক স্বার্থ বা নিরাপত্তার স্বার্থের পরিপন্থী তাহলে বাংলাদেশ ওটা করতে পারবে না।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে খারাপ’ চুক্তি হিসেবে আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, ‘গত ৫৫ বছরে এর চেয়ে খারাপ কোনও চুক্তি বাংলাদেশ আর কোনও দেশের সঙ্গে সই করেনি। সরকারের উচিত হবে এই চুক্তিকে সংসদের উত্থাপন করে পর্যালোচনা করা। দলমত নির্বিশেষে সবাইকে আস্থার মধ্যে নিয়ে চুক্তিটা বাতিল করার উদ্যোগ নেওয়া।’
সবার আগে বাংলাদেশ নাকি যুক্তরাষ্ট্র
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের এই চুক্তি বিএনপি সরকার দেশের স্বার্থে বিবেচনা করবেন বলে অনেক রাজনীতিবিদ ধারণা করেছিলেন। কিন্তু বোয়িং উড়োজাহাজ কেনার চুক্তির পরে অনেকেই বলছেন, ‘বিএনপি শুধু স্লোগানেই বলে— সবার আগে বাংলাদেশ। কিন্তু তাদের কাজকর্মে প্রতীয়মান যে সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র।’
সম্প্রতি ‘বিএনপি সরকারের আড়াই মাস: পর্যালোচনা, উদ্বেগ ও দাবিনামা’ শীর্ষক এক আলোচনা সভায় যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাণিজ্যচুক্তির বিরোধিতা করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক আনু মুহাম্মদ বলেছেন, ‘‘বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সবসময় বলছেন—সবার আগে বাংলাদেশ। বাংলাদেশে এসে প্রথম দিনই তিনি এই স্লোগান দিয়েছেন। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি দেখাচ্ছে যে ‘সবার আগে যুক্তরাষ্ট্র’ নীতিতে চলছে সরকার।’’
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সই করা অন্যায়, অন্যায্য ও জাতীয় স্বার্থবিরোধী বাণিজ্যচুক্তি থেকে বিএনপি সরকারকে বেরিয়ে আসতে হবে। দেশপ্রেমের বড় পরীক্ষায় বিএনপি সরকারকে ১০০–তে ১০০ নম্বর পেতে হলে অবশ্যই এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। শিগগিরই রাজনৈতিক দল ও জনগণকে সঙ্গে নিয়ে এ বিপজ্জনক বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের উদ্যোগ নিতে হবে।’
ড. ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার মার্কিনীদের সঙ্গে এই চুক্তি করার পরিকল্পনা আগেই করেছে বলেও অভিযোগ করেন এই রাজনীতিক। তাঁর মতে, অন্তর্বর্তী সরকারের পররাষ্ট্র উপদেষ্টা, বাণিজ্য উপদেষ্টাসহ কয়েকজন উপদেষ্টার ‘অতি উৎসাহে’ ও প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের ‘প্রণোদনায়’ মূলত ‘মার্কিন স্বার্থকে নিশ্চিত করতে’ এই চুক্তি করা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘কোনও স্বাধীন, সার্বভৌম দেশ এত পরাধীনতামূলক কোনও চুক্তি অপর দেশের সঙ্গে সই করতে পারে না। দেশের বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক এবং সামরিক নিরাপত্ত; সব দিক থেকেই আমাদের জন্য বিপদজনক।’
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই চুক্তির ফলে ‘বাণিজ্যিক বৈষম্য বাড়বে’ বলে মনে করেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) গবেষণা পরিচালক খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম। তিনি বলেন, ‘এই চুক্তি অনুসারে বাংলাদেশকে বেশি দাম দিয়ে মার্কিন পণ্য কিনতে হবে। বাংলাদেশের বাণিজ্যিক বৈষম্য আরও বাড়বে। এই চুক্তি বহাল থাকলে বাংলাদেশ স্বাধীনভাবে অন্য দেশের সঙ্গে চুক্তি করতে পারবে না। যেটা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।’
চুক্তি রিভিউয়ের সময় আছে এক সপ্তাহ
বাংলাদেশ চাইলে ৯ মে এর মধ্যে এই চুক্তি বাতিলের জন্য রিভিউ করার সুযোগ রয়েছে উল্লেখ করে বাসদের সাধারণ সম্পাদক বজলুর রশিদ ফিরোজ তিনি বলেন, ‘জনগণের স্বার্থে অন্তর্বর্তী সরকারের পাপের দায়ভার কোনোভাবেই এই সরকারের কাঁধে নেওয়া উচিত হবে না। সরকার চাইলেই আগামী ৯ মের মধ্যে এই চুক্তি রিভিউ করতে পারবে। কালক্ষেপণ না করে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার জন্য সেটাই করা উচিত।’
একইরকম দাবি জানান আর ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হকও। তিনি বলেন, ‘সরকার যদি একা দায়িত্ব নিতে বিব্রতবোধ করে, তাহলে তাদের উচিত হবে পার্লামেন্টের সব দলকে সঙ্গে নিয়ে এবং পার্লামেন্টের বাইরে রাজনৈতিক দল এবং যারা উদ্যোক্তা ব্যবসায়ী সংশ্লিষ্ট সবাইকে আস্থার মধ্যে নিয়ে একটা জাতীয় কনসেন্সাস তৈরি করে এই চুক্তি থেকে বেরিয়ে আসা।’
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বাজার ধরে রাখা জরুরি উল্লেখ করে সাইফুল হক বলেন, ‘তবে সেই বাজারটা হবে আমাদের ন্যায্যতা ও সমতার ভিত্তিতে, মর্যাদার ভিত্তিতে। কিন্তু চুক্তির বিনিময়ে বাস্তবে বাংলাদেশকে অধীনতামূলক, বশ্যতামূলক একটা দেশে পর্যবেশিত করা হচ্ছে। আমরা অন্যদের সঙ্গে যেভাবে চুক্তি করি, সেভাবে পারস্পরিক স্বার্থের কথা বিবেচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে চুক্তি করবো।’ উৎস: বাংলাট্রিবিউন।