এ ভূখণ্ডের মানুষের রসনাবিলাসে ‘দেশি মুরগি’র কদর চিরন্তন। কিন্তু ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার চাপে দেশীয় মুরগির সীমিত উৎপাদন একসময় বাজারে বিশাল শূন্যতা তৈরি করে। এই শূন্যতা পূরণে এবং দেশীয় মুরগির স্বাদ ও বাণিজ্যিক ব্রয়লারের উচ্চ ফলনশীলতার মধ্যে মেলবন্ধন ঘটাতে আশির দশকের শেষভাগে জন্ম নেয় ‘সোনালি’ মুরগি। গ্রামীণ দারিদ্র্য বিমোচনের হাতিয়ার হিসেবে আসা এই মুরগি খুব দ্রুতই জয় করে নেয় ভোক্তার মন। চাহিদার এই আকাশচুম্বী গ্রাফই কাল হলো জাতটির জন্য। বর্তমানে রাজধানীসহ দেশের বাজারগুলোতে আসল সোনালির আড়ালে চলছে এক অভিনব প্রতারণা, যার পোশাকি নাম ‘কালার বার্ড’।
ঢাকার কারওয়ান বাজারসহ দেশের বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা যায় এক অদ্ভুত চিত্র; যেখানে সাধারণ ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ২০০-২২০ টাকা কেজিতে, সেখানে সোনালির দাম হাঁকানো হচ্ছে ৩৪০ থেকে ৩৮০ টাকা। প্রতি কেজিতে প্রায় ১৫০ টাকার এই বিশাল ফারাকই অসাধু ব্যবসায়ীদের প্রলুব্ধ করছে। তারা আসল সোনালির বদলে প্রায় একই রকম দেখতে দ্রুত বর্ধনশীল ‘কালার বার্ড’ বা ‘হাইব্রিড সোনালি’ ক্রেতার ব্যাগে ঢুকিয়ে দিচ্ছেন। কারওয়ান বাজারের এক বিক্রেতা অকপটেই স্বীকার করলেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী আসল সোনালি সব সময় মেলে না, তাই অন্য জাতকেই সোনালি বলে চালাতে হয়।’
সোনালি মুরগির ইতিহাস বেশ গৌরবের। মিসরীয় ফাউমি ও আমেরিকান রোড আইল্যান্ড রেডের সফল সংকরায়নে এর জন্ম। একটি বিশুদ্ধ সোনালি মুরগি বছরে ১৫০ থেকে ২০০টি ডিম দেয় এবং এর মাংসের গঠন অনেকটাই দেশি মুরগির মতো। কিন্তু হ্যাচারি মালিকদের বিজ্ঞানভিত্তিক প্রজননের অভাব এবং দ্রুত মুনাফার লোভে এই জাত আজ হুমকির মুখে।
খামারিদের দ্রুত লাভের আকাঙ্ক্ষাকে পুঁজি করে অসাধু ব্রিডাররা সোনালির সঙ্গে ফরাসি জাত ‘স্যাসো’ বা ‘টাইগার’-এর মতো বাণিজ্যিক ব্রয়লারের সংকরায়ন ঘটাচ্ছে। এতে জন্ম নিচ্ছে ‘কালার বার্ড’। মাত্র ৬০ দিনে এরা ৯০০ গ্রাম ওজন ছাড়িয়ে যায়, যা আসল সোনালির ক্ষেত্রে অসম্ভব। নারায়ণগঞ্জের এক খামারির কথাতে এর সত্যতা মেলে, যিনি ব্রয়লারের মতো কম সময়ে বেড়ে ওঠা কালার বার্ডকেই সোনালি নামে বাজারজাত করছেন।
এই হাইব্রিড মুরগির পালকে সোনালির মতো একক গাঢ় বাদামি রঙ থাকে না; থাকে লাল, কালো বা হলুদের এলোমেলো ছোপ। তবে প্রতারণার সবচেয়ে বড় প্রমাণ মেলে রান্নাঘরে। আসল সোনালি মুরগির মাংস হয় শক্ত ও আঁশযুক্ত। অন্যদিকে কালার বার্ড রান্না করলে ব্রয়লারের মতোই দ্রুত গলে যায়, স্বাদে লাগে পানসে। রান্নার পর ওজনেও কমে যায় অনেকটা। কারওয়ান বাজারের এক ক্ষুব্ধ ক্রেতার ভাষায়, ‘সোনালি ভেবে কিনেছিলাম, কিন্তু খাওয়ার পর মনে হলো স্বাদটা একদম ব্রয়লারের মতো!’
শুধু স্বাদেই নয়, পুষ্টিগুণেও আসল সোনালি অনেক এগিয়ে। গবেষণায় দেখা গেছে, সোনালির মাংস রক্তে কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইড কমাতে সহায়ক, যা ব্রয়লার বা কালার বার্ডে অনুপস্থিত। কালার বার্ডের মাংসে ফ্যাটি এসিডের পরিমাণ বেশি থাকায় তা দ্রুত সতেজতা হারায়।
খোলা বাজারে এই ব্যাপক প্রতারণার কারণে তৈরি হয়েছে আস্থার সংকট। এই সুযোগটিই নিচ্ছে সুপারশপগুলো। তারা ‘ক্ল্যাসিক সোনালি’ নামে সরাসরি খামার থেকে সংগ্রহ করা মুরগি বিক্রি করছে, যার দাম সাধারণ বাজারের চেয়ে বেশি। প্রতারণা থেকে বাঁচতে ক্রেতারা বাধ্য হয়ে এই বাড়তি দাম বা ‘ট্রাস্ট প্রিমিয়াম’ পরিশোধ করছেন। এতে করে তৈরি হচ্ছে এক নতুন বৈষম্য; শুধু উচ্চবিত্তরাই পাচ্ছেন আসল সোনালি মুরগির স্বাদ, আর সাধারণ ক্রেতারা প্রতিনিয়ত ঠকছেন খোলা বাজারে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ লেলিন চৌধুরীর মতে, ‘এটি সরাসরি স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর না হলেও খাদ্যের গুণগত মান ও আর্থিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি সাধারণ মানুষের সঙ্গে এক বড় ধরনের প্রতারণা।’
সোনালি মুরগির উদ্ভাবন হয়েছিল প্রান্তিক মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর জন্য। নজরদারির অভাবে এবং অতি মুনাফার লোভে সেই সোনালি আজ নিজেই তার পরিচয় হারাতে বসেছে। সাধারণ মানুষের পুষ্টির অধিকার নিশ্চিত করতে হলে পোলট্রি বাজারে এই প্রতারণা বন্ধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর তদারকির কোনো বিকল্প নেই।
সূত্র: সমকাল