হারুন-অর-রশীদ, ফরিদপুর প্রতিনিধি: জন্মের মাত্র ২১ দিনের মাথায় মা হারানো, আর দুই বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই বাবাকেও হারাতে হলো—নির্মম জনতার পিটুনিতে। এমন হৃদয়বিদারক বাস্তবতার মুখোমুখি এখন ফরিদপুরের ছোট্ট শিশু মুসলিমা ইসলাম (২৫ মাস)। মা-বাবাহীন এই শিশুটির আশ্রয় এখন শুধু বৃদ্ধ দাদা-দাদী, যাদের চোখে শোকের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ নিয়ে গভীর অনিশ্চয়তা।
রবিবার (০৩ মে) বিকেলে ফরিদপুরের বোয়ালমারী উপজেলার সাতৈর ইউনিয়নের সাতৈর গ্রামে নিহত ট্রাকচালক হান্নান শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় শোকের মাতম। স্বজনদের কান্না আর ভিড়ের মাঝেই কিছু না বুঝে কখনো দাদীর কোলে, কখনো অন্যের কোলে ঘুরছে ছোট্ট মুসলিমা। কখনো ফিডারে দুধ খাচ্ছে, আবার হঠাৎ অঝোরে কেঁদে উঠছে—যেন তার অজান্তেই জীবনের নির্মমতা তাকে ছুঁয়ে যাচ্ছে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, মুসলিমার মা আরিফা বেগম তার জন্মের ২১ দিনের মাথায় স্বামীকে ডিভোর্স দিয়ে অন্যত্র চলে যান। এরপর থেকেই দাদা শাহিদ শেখ ও দাদী নার্গিস বেগমের স্নেহেই বড় হচ্ছিল শিশুটি। কিন্তু হঠাৎ করেই সেই আশ্রয়ের বড় ভরসাটুকুও হারিয়ে গেল।
দাদী নার্গিস বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন,“মা জন্মের ২১ দিনেই চলে গেছে, এখন বাবাও নাই। এই বাচ্চাটার আর কেউ রইল না। আমি মরে গেলে ওর কী হবে?”
নিহতের বাবা শাহিদ শেখ বলেন, “আমার ছেলে সংসারের একমাত্র উপার্জনকারী ছিল। যদি কোনো অপরাধ করে থাকে, আইন আছে। কিন্তু গুজব ছড়িয়ে এভাবে পিটিয়ে মেরে ফেলা—এটা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। এখন এই এতিম বাচ্চাটার ভবিষ্যৎ কে দেখবে?”
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার (০১ মে) রাত সাড়ে ৮টার দিকে নগরকান্দা উপজেলার তালমা ইউনিয়নের বিলনালিয়া এলাকায় একটি দ্রুতগতির ট্রাক কয়েকজন পথচারীকে ধাক্কা দেয়—এমন অভিযোগ ছড়িয়ে পড়ে। এরই মধ্যে “ট্রাকটি ২০ জনকে চাপা দিয়েছে” এমন গুজব দ্রুত ছড়িয়ে পড়লে এলাকায় উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেলে স্থানীয়রা সড়কে ইট-ব্লক ফেলে অবরোধ সৃষ্টি করে ট্রাকটি থামায়। পরে চালক হান্নান শেখকে নামিয়ে বেধড়ক মারধর করা হয়। গুরুতর আহত অবস্থায় তাকে ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এ ঘটনায় ট্রাকের দুই হেলপার—নাঈম (২২) ও আল-আমিন (২৫)—আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। এছাড়া স্থানীয় অন্তত সাতজন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে।
নগরকান্দা সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মাহমুদুল হাসান জানান, “পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
এদিকে স্থানীয়দের একাংশের দাবি, বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চালানোর কারণে জনরোষ তৈরি হয়। তবে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার এই প্রবণতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সচেতন মহল। তারা বলছেন, গুজবের ভিত্তিতে এমন সহিংসতা সমাজের জন্য মারাত্মক হুমকি এবং এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
সবচেয়ে বেশি অসহায় হয়ে পড়েছে ছোট্ট মুসলিমা। জীবনের শুরুতেই মা-বাবাহীন হয়ে পড়া এই শিশুটির ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চয়তায় ঘেরা। বৃদ্ধ দাদা-দাদীর পক্ষে কতদিন তার দায়িত্ব বহন করা সম্ভব—সেই প্রশ্নও বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, এতিম এই শিশুটির জন্য সরকারি সহায়তা, সমাজসেবামূলক সংস্থার নজরদারি এবং দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন ব্যবস্থা জরুরি। পাশাপাশি গুজব ও গণপিটুনির মতো ঘটনাগুলো রোধে প্রশাসনের আরও কঠোর ও কার্যকর ভূমিকার আহ্বান জানিয়েছেন তারা।