শিরোনাম
◈ তারেক রহমানের চীন সফর: দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন সমীকরণ দেখছে ভারতীয় গণমাধ্যম ◈ চুক্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই লেবাননে ইসরাইলের ড্রোন হামলা ◈ ‘জনবান্ধব নয়, গরিবের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টিকারী বাজেট: সংসদে রফিকুল ইসলাম খান ◈ আসিয়ান সদস্যপদে মালয়েশিয়ার সমর্থন, তিস্তায় সর্বোচ্চ সহযোগিতা করবে চীন: পররাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ কৃষি ও খাদ্য নিরাপত্তায় বাংলাদেশের পাশে বিশ্বব্যাংক, সহায়তা ১১০ কোটি ডলার ◈ দেশের স্বার্থ রক্ষাই আমাদের দায়িত্ব, চীন-মালয়েশিয়া সফরের সব অর্জন জনগণের: সংসদে প্রধানমন্ত্রী ◈ বিদেশি নাগরিকদের জরুরি সতর্কবার্তা দিলো মার্কিন দূতাবাস ◈ আমরা সবাই চাই, আমাদের রিলেশন হবে মিউচুয়াল রেসপেক্ট এবং ইকুইটির ভিত্তিতে: মির্জা ফখরুল ◈ জাতীয় পরিচয়পত্র ১৫ বছর পূর্ণ হলেই নবায়ন বাধ্যতামূলক করতে ভাবছে নির্বাচন কমিশন! (ভিডিও) ◈ ক্রীড়াবিদদের সুযোগ দিলে বিশ্বে বাংলাদেশের মর্যাদা আরও বাড়বে: সেনাপ্রধান

প্রকাশিত : ২৭ জুন, ২০২৬, ০৬:০৮ বিকাল
আপডেট : ২৭ জুন, ২০২৬, ০৭:০০ বিকাল

প্রতিবেদক : মনিরুল ইসলাম

‘জনবান্ধব নয়, গরিবের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টিকারী বাজেট: সংসদে রফিকুল ইসলাম খান

মনিরুল ইসলাম : প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটকে ‘জনবান্ধব নয়’ এবং ‘গরিবের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টিকারী’ বলে দাবি করেছেন বিরোধী দলের সংসদ সদস্য মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান। সিরাজগঞ্জ-৪ (উল্লাপাড়া-সলঙ্গা) আসন থেকে নির্বাচিত জামায়াতের এই সংসদ সদস্য বলেন, নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্যবৃদ্ধি, ভ্যাটের বিস্তার, অবাস্তব প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা, উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নে ধীরগতি, ব্যাংক খাতের ভয়াবহ খেলাপি ঋণ, আইন-শৃঙ্খলার অবনতি এবং অর্থ পাচার—সব মিলিয়ে সরকারের অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনায় গভীর সংকটের প্রতিফলন ঘটেছে এবারের বাজেটে।

আজ শনিবার বিকেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনের ১৬তম দিনে প্রস্তাবিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের ওপর সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল।

রফিকুল ইসলাম খান বলেন, সাধারণ মানুষের নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। চাল, ডিম, মুরগি, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় অসহনীয় হয়ে উঠেছে। একই সঙ্গে মুদি পণ্যে ভ্যাট আরোপের কারণে দরিদ্র মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হয়েছে। এমনকি ভিক্ষা করে জীবিকা নির্বাহকারী মানুষও বাজার থেকে পণ্য কিনতে গিয়ে ভ্যাট দিচ্ছেন বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

অর্থমন্ত্রীর বাজেট-পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য তুলে ধরে তিনি বলেন, অর্থমন্ত্রী নিজেই বলেছেন দেশের অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়াতে চতুর্থ বছর পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে। এতে স্পষ্ট হয়, বর্তমান বাজেট তাৎক্ষণিকভাবে অর্থনীতিকে পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম নয় এবং আগামী তিন বছর দেশের মানুষকে কষ্টের মধ্য দিয়েই চলতে হবে।

তিনি বলেন, বাজেটে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হলেও আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পূর্বাভাস তার চেয়ে অনেক কম। একইভাবে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যও বাস্তবসম্মত নয়, কারণ সাম্প্রতিক সময়ে মূল্যস্ফীতি ইতোমধ্যে ৯ শতাংশের বেশি রয়েছে।

উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়নের চিত্র তুলে ধরে তিনি বলেন, অর্থবছরের ১১ মাসে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) মাত্র ৪৮ শতাংশের কিছু বেশি বাস্তবায়িত হয়েছে। অথচ বাকি বিপুল অর্থ এক মাসে ব্যয় করতে হলে তা অনিয়ম ও লুটপাটের ঝুঁকি বাড়াবে। কয়েকটি মন্ত্রণালয় বরাদ্দের এক-তৃতীয়াংশও ব্যয় করতে পারেনি বলেও তিনি উল্লেখ করেন। তার মতে, বছরের শেষ মাসে বিপুল অর্থ ব্যয়ের চাপ সৃষ্টি হওয়ায় উন্নয়ন প্রকল্পে অপচয় ও দুর্নীতির আশঙ্কা বেড়ে যায়।

ব্যাংকিং খাতের অবস্থা তুলে ধরে তিনি বলেন, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী খেলাপি ঋণের পরিমাণ প্রায় ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায় পৌঁছেছে, যা মোট ঋণের প্রায় ৩২ শতাংশ। অথচ ২০০৯ সালের শুরুতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল মাত্র ২২ হাজার ৪৮১ কোটি টাকা। খেলাপি ঋণের লাগামহীন বৃদ্ধির কারণে দেশের ব্যাংকিং খাত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় পৌঁছেছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। একই সঙ্গে তিনি বলেন, সরকার বিদেশি ঋণ পরিশোধেও নতুন ঋণের ওপর নির্ভর করছে এবং আগামী কয়েক বছরে প্রায় ৪ লাখ কোটি টাকা বৈদেশিক ঋণ পরিশোধের চাপ তৈরি হবে, যা বাংলাদেশের মতো অর্থনীতির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ।

আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির অভিযোগ এনে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, সাম্প্রতিক ১০০ দিনে শত শত হত্যাকাণ্ড ও অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। সরকারদলীয় নেতাকর্মীরাও হত্যার শিকার হয়েছেন, যা নিরাপত্তা পরিস্থিতির ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরে। লক্ষ্মীপুরে মা ও তিন মেয়েকে হত্যার ঘটনা, ধর্ষণসহ বিভিন্ন সহিংসতার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে তিনি বলেন, মানুষের জানমাল ও সম্ভ্রম রক্ষায় আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা রাখতে পারছে না। তিনি এ জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন তোলেন।

মাদকের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, দেশে প্রায় ৮৩ লাখ মাদকসেবী রয়েছে। মাদকের বিরুদ্ধে নতুন আইন প্রণয়নকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, শুধু আইন করলেই হবে না, মাদকের উৎস এবং সীমান্ত দিয়ে এর প্রবেশ বন্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। তাহলেই দেশের যুবসমাজকে মাদকের ভয়াল থাবা থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে।

তিনি বলেন, জনগণের দেয়া গণভোটের রায় বাস্তবায়ন করা সরকারের নৈতিক দায়িত্ব। অতীতেও বিভিন্ন সময়ে গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে, তাই এটিকে অসাংবিধানিক বলার সুযোগ নেই। সংস্কার প্রশ্নে জনগণের মতামতকে সম্মান জানিয়ে দ্রুত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

রফিকুল ইসলাম খান কওমি মাদ্রাসার ১২ থেকে ১৪ লাখ শিক্ষার্থীর উন্নয়নে বাজেটে বিশেষ বরাদ্দ রাখার দাবি জানান। একই সঙ্গে ইমাম, মুয়াজ্জিন এবং অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের জন্য সম্মানজনক ভাতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জুলাইয়ের শহীদ পরিবারের পাশাপাশি গত ১৬ বছরে রাজনৈতিক সহিংসতা, গুম, অপহরণ ও নির্যাতনের শিকার পরিবারগুলোর জন্যও পুনর্বাসন ও ভাতার ব্যবস্থা করা উচিত। পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষাকে আরও শক্তিশালী করার দাবিও জানান।

প্রশাসনে দলীয়করণের অভিযোগ তুলে তিনি বলেন, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও জনপ্রশাসনসহ বিভিন্ন খাতে অতীতে নির্যাতিত কর্মকর্তাদের এখনও বঞ্চিত করা হচ্ছে, অন্যদিকে বিতর্কিত ব্যক্তিরা গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন। এ ধরনের দলীয়করণ বন্ধে সরকারের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেন তিনি।

পতিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং বিদেশে অবস্থানরত অন্য মামলার আসামিদের দেশে ফিরিয়ে এনে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার আহ্বান জানান রফিকুল ইসলাম খান। একই সঙ্গে আলোচিত বিভিন্ন হত্যাকাণ্ডের আসামিদেরও দেশে ফিরিয়ে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

দুর্নীতি দমন কমিশন ও মানবাধিকার কমিশনের কার্যকারিতা জোরদারে পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে দৃশ্যমান ব্যবস্থা না নেয়ায় জনগণের আস্থা কমছে।

তিনি অভিযোগ করেন, গত এক বছরে সুইস ব্যাংকে বাংলাদেশ থেকে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি অর্থ পাচার হয়েছে। পাশাপাশি বিভিন্ন ব্যাংক থেকে বিপুল অর্থ লুটপাটের অভিযোগ তুলে পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে বিশেষ উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান। তিনি বলেন, বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৩০ লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার হয়েছে বলে বিভিন্ন মহলে যে আলোচনা রয়েছে, সেই অর্থ ফেরত আনতে সরকারকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংক লুটপাটে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা এবং অবৈধভাবে নিয়োগ পাওয়া ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণেরও দাবি জানান।

বক্তব্যের শেষদিকে রফিকুল ইসলাম খান বলেন, দুর্নীতিবাজ কোনো দলের নয়, তারা দেশের শত্রু। তাই দলমত নির্বিশেষে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। সন্ত্রাস, দুর্নীতি ও অর্থ পাচারমুক্ত আধুনিক বাংলাদেশ গড়ে তুলতে সরকার ও সব রাজনৈতিক দলের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়