আকাশছোঁয়া নির্মাণ ব্যয়ের চাপে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ি বানানো এখন অনেকের জন্য কঠিন হয়ে উঠেছে। এই বাস্তবতায় নতুন এক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, অনেক আমেরিকান সরাসরি চীন থেকে বাড়ির সরঞ্জাম আমদানি করছেন, কেউ কেউ পুরো বাড়ির উপকরণই বিদেশ থেকে কিনে আনছেন।
বাল্টিমোরের বাসিন্দা, পেশায় ইঞ্জিনিয়ার গেন্নাদি সিগান এই প্রবণতার একটি আলোচিত উদাহরণ। নিজের স্বপ্নের বাড়ি নির্মাণে তিনি প্রায় সব ধরনের সরঞ্জামই চীনের বিভিন্ন কারখানা থেকে সংগ্রহ করেছেন। ২০২৪ সালে নিজেই চীন সফরে গিয়ে পছন্দমতো উপকরণ বেছে আনেন।
তার বাড়ির গঠনশৈলী কিছুটা শিল্পকারখানার মতো হলেও আধুনিক সুবিধায় ভরপুর। ধূসর ফাইবার সিমেন্টের দেয়াল, মেঝে থেকে ছাদ পর্যন্ত বড় জানালা, ওপেন কিচেন, শব্দহীন ম্যাগনেটিক লকযুক্ত দরজা এবং ইউরোপীয় ধাঁচের জানালা বাড়িটিকে আলাদা করেছে। খুব শিগগিরই বাড়িটি লিড সনদ পেতে যাচ্ছে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
সিগানের ভাষায়, বাড়ি নির্মাণ তার কাছে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প এবং একই সঙ্গে এক ধরনের অ্যাডভেঞ্চার। এই ভাবনা থেকেই তিনি চীন থেকে সরঞ্জাম আনার সিদ্ধান্ত নেন। তার হিসাবে, এভাবে প্রায় ১ লাখ ডলার পর্যন্ত সাশ্রয় হয়েছে। তবে প্রতি কনটেইনার সরঞ্জাম আনতে গড়ে ১৩ হাজার ডলার খরচ করতে হয়েছে।
শুধু সিগান নন, যুক্তরাষ্ট্রের অনেক বাড়ির মালিক এখন সরাসরি চীনা সরবরাহকারীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। ন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন অভ হোম বিল্ডার্স জানায়, গত বছরের তুলনায় নির্মাণসামগ্রীর দাম বেড়েছে ৩ শতাংশ। ২০২৩ সালে ব্যবহৃত নির্মাণসামগ্রীর ২৭ শতাংশই এসেছে চীন থেকে। ফলে অনেকেই স্থানীয় মধ্যস্থতাকারী এড়িয়ে সরাসরি আমদানির পথ বেছে নিচ্ছেন।
সোশ্যাল মিডিয়াতেও এই প্রবণতা ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এক নারী স্থানীয় বাজারে ৫০ হাজার ডলারের ক্যাবিনেট না কিনে চীন থেকে আমদানি করার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে ব্যাপক সাড়া পেয়েছেন। অনেক ব্যবহারকারী চীনা বিক্রেতাদের তালিকাও শেয়ার করছেন।
এই সুযোগ কাজে লাগাতে চীনা প্রস্তুতকারকেরাও সক্রিয়। তারা সরাসরি ক্রেতাদের কাছে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে এবং ক্যাবিনেট, টাইলসসহ বিভিন্ন পণ্য সরাসরি বাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। অনেকে এটিকে চীনা পণ্যের প্রতি বাড়তি ঝোঁক বা চায়নাম্যাক্সিং প্রবণতার সঙ্গে তুলনা করছেন।
তবে সবকিছু এত সহজ নয়। আমদানি শুল্ক, ভাষাগত সমস্যা, বিশেষজ্ঞ শ্রমিকের প্রয়োজন এবং পণ্য পেতে দীর্ঘ সময় লাগার মতো নানা জটিলতা রয়েছে। কিছু সময় শুল্ক ১৪৫ শতাংশ পর্যন্তও পৌঁছেছে, যা বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়।
অর্থনীতিবিদ রবার্ট ডিয়েটজ জানান, এক বছরে মেটাল মোল্ডিংয়ের দাম ৪৫ শতাংশ এবং কাঠের দাম ৮ শতাংশ বেড়েছে। একই সঙ্গে বাণিজ্য ও শুল্ক নীতির কারণে অ্যালুমিনিয়ামের দামও বেড়েছে। ফলে বাড়ি নির্মাণ ব্যয়ের বড় অংশই এখন উপকরণে খরচ হচ্ছে।
আয়রনগেট বিল্ডার্সের উইল মুয়েলার বলেন, মোট খরচের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই চলে যায় নির্মাণসামগ্রী কিনতে। বাকি অংশ শ্রমিকদের মজুরি। সিগানের ব্যবহৃত অনেক উপকরণ যুক্তরাষ্ট্রে কয়েকগুণ বেশি দামে বিক্রি হয় বলেও জানান তিনি।
চীনের ফোসান শহর এই বাজারের বড় কেন্দ্র। এখানকার কারখানাগুলো এখন নতুন বাজার খুঁজছে, কারণ দেশটির স্থানীয় আবাসন খাত মন্দায় রয়েছে। ফলে তারা আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের দিকে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে।
সোর্সিং এজেন্টদের দাবি, প্রতি মাসে শত শত ক্রেতা চীনা সরঞ্জাম কিনতে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। অনেকেই সরাসরি চীনে গিয়ে পণ্য নির্বাচন করছেন।
তবে এই প্রক্রিয়ায় ঝুঁকিও কম নয়। পণ্যের মান যাচাই, পরিমাপের পার্থক্য, নির্দেশিকা অনুবাদ এবং ফেরত দেওয়ার জটিলতা ক্রেতাদের ভোগাতে পারে। সিগান নিজেই বলেছেন, পুরো প্রক্রিয়াটি শুরুতে অনেকটা অন্ধভাবে এগোনোর মতো ছিল।
সবকিছু মিলিয়ে কম খরচে বাড়ি নির্মাণের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হলেও, এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে নানা বাস্তব চ্যালেঞ্জ। তবুও উচ্চ ব্যয়ের চাপে বিকল্প খুঁজতে গিয়ে অনেক আমেরিকান এখন চীনের দিকেই ঝুঁকছেন।
সিএনএন