শিরোনাম
◈ কুমিল্লায় কাস্টমস কর্মকর্তা রহস্যজনক হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আটক ৫ ◈ রাশিয়া যা পারল না তা করে দেখাল চিন: তাইঝৌ ডেস্ট্রয়ারের পুনর্জন্ম, মিনিটে ছুড়বে ৩০ ক্ষেপণাস্ত্র ◈ “চীনের বিজ্ঞানীদের নতুন আবিষ্কার: সমুদ্র থেকে ইউরেনিয়াম শিকারে ‘প্রিডেটর’ ম্যাটেরিয়াল” ◈ বিএনপি ছেড়ে নেতাদের স্রোত, দুই মাসেই চাপে সরকার, রাজপথে সক্রিয় বিরোধীরা ◈ জামিন পেলেন খালেদা জিয়ার গাড়িবহরে হামলার আসামি নিষিদ্ধ ছাত্রলীগ নেতা লাভলু ◈ গত ১৮ মাস যে আরামে ছিলেন, সেই আরাম এখন আর হচ্ছে না: বিরোধী দলকে প্রতিমন্ত্রী (ভিডিও) ◈ এবার রাজশাহীর সরকারি কলেজের জুতাপেটার ঘটনায় সেই নারী শিক্ষক বরখাস্ত ◈ প্রণোদনার ওপর কর প্রত্যাহারের দাবি বিটিএমএ’র ◈ ক্রীড়াঙ্গনকে রাজনীতি মুক্ত রাখার ঘোষণা ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আ‌মিনুল হ‌কের ◈ ৮০ লাখ ব্যক্তি রিটার্ন দেয়নি, তালিকা করে ডিজিটাল পদ্ধতিতে নোটিশ যাবে

প্রকাশিত : ২৬ এপ্রিল, ২০২৬, ১০:৩৬ রাত
আপডেট : ২৭ এপ্রিল, ২০২৬, ১২:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

রাশিয়া যা পারল না তা করে দেখাল চিন: তাইঝৌ ডেস্ট্রয়ারের পুনর্জন্ম, মিনিটে ছুড়বে ৩০ ক্ষেপণাস্ত্র

আর্মি রিকগনেশন: ২০২৬ সালের এপ্রিলে চিনা নৌবাহিনীর ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে এক চাঞ্চল্যকর পরিবর্তনের চিত্র ফুটে উঠেছে। এক সময়ের রুশ শক্তির প্রতীক 'সোভরোমেনি' ক্লাসের 'তাইঝৌ' ডেস্ট্রয়ার এখন সম্পূর্ণ চিনা প্রযুক্তিতে সজ্জিত। আধুনিকায়নের এই প্রক্রিয়াটি কেবল একটি জাহাজের খোলস পরিবর্তনের গল্প নয়, বরং এটি চিনের নিজস্ব প্রতিরক্ষা প্রযুক্তির উৎকর্ষ এবং সমুদ্রে তাদের ক্রমবর্ধমান আধিপত্যের এক জীবন্ত দলিল। রুশ সমরাস্ত্রের সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে তাইঝৌ এখন এক বহুমুখী মারণাস্ত্রে রূপান্তরিত হয়েছে, যা আগের চেয়ে অনেক বেশি ক্ষিপ্র এবং দূরপাল্লার আক্রমণে সক্ষম।

তাইঝৌ ডেস্ট্রয়ারটি ২০০৬ সালে রাশিয়া থেকে সংগ্রহ করা হয়েছিল। সে সময় এটি মূলত স্বল্প পাল্লার আক্রমণ এবং সীমিত আত্মরক্ষার জন্য ডিজাইন করা হয়েছিল। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে আধুনিক নৌ-যুদ্ধের ধরন বদলেছে। রুশ 'মস্কিত' ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা ছিল সীমিত এবং তাদের উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা ছিল ধীরগতির যান্ত্রিক কাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। এই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে উঠতে চিন তাদের নিজস্ব আধুনিক সেন্সর, ক্ষেপণাস্ত্র এবং নেটওয়ার্ক ব্যবস্থা ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেয়। এর ফলে জাহাজটির আয়ু যেমন বেড়েছে, তেমনি এর যুদ্ধক্ষমতা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এই আধুনিকায়নের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো ৪৮-সেলের খাড়া উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা বা 'ভার্টিক্যাল লঞ্চ সিস্টেম'। জাহাজের সামনের অংশে ৩২টি এবং পেছনের অংশে ১৬টি সেল বসানো হয়েছে।

আগে যেখানে রুশ প্রযুক্তিতে একটি ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়ার পর পরবর্তী ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রস্তুত করতে ১০ থেকে ১৫ সেকেন্ড সময় লাগত, এখন সেখানে প্রতি সেকেন্ডে একটি করে ক্ষেপণাস্ত্র ছোড়া সম্ভব।

এই ব্যবস্থার মাধ্যমে 'এইচকিউ-১৬' এর মতো মাঝারি পাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে একটি বিশাল এলাকা জুড়ে আকাশ প্রতিরক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এটি আগে এই জাহাজের পক্ষে অসম্ভব ছিল।

জাহাজ বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের ক্ষেত্রে চিন তাদের নিজস্ব 'ওয়াইজে-১২' ব্যবহার শুরু করেছে। এটি রুশ 'মস্কিত' ক্ষেপণাস্ত্রের সরাসরি উত্তরসূরি হলেও দক্ষতায় অনেক এগিয়ে। রুশ ক্ষেপণাস্ত্রের পাল্লা যেখানে ১২০ থেকে ২৪০ কিলোমিটার ছিল, সেখানে ওয়াইজে-১২ ক্ষেপণাস্ত্র ৪০০ থেকে ৫০০ কিলোমিটার দূরের লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে পারে।

শব্দের চেয়ে তিন থেকে চার গুণ দ্রুত গতিতে চলা এই ক্ষেপণাস্ত্রটি প্রতিপক্ষের রাডার ফাঁকি দিতে অত্যন্ত দক্ষ। দীর্ঘ পাল্লার কারণে এই জাহাজটি এখন সরাসরি লক্ষ্যবস্তু না দেখেও কৃত্রিম উপগ্রহ বা ড্রোনের দেওয়া তথ্যের ওপর ভিত্তি করে দিগন্তের ওপারে থাকা শত্রুকে ধ্বংস করতে পারে।

আগে এই জাহাজে রুশ 'কাস্তান' ব্যবস্থা ছিল যা কামান ও ক্ষেপণাস্ত্রের মিশ্রণে তৈরি। কিন্তু আধুনিক যুদ্ধে এটি ধীরগতির ছিল। চিন একে সরিয়ে দুটি অত্যন্ত শক্তিশালী ব্যবস্থা যুক্ত করেছে।

এতে যুক্ত করা গ্যাটলিং গান প্রতি মিনিটে ১০,০০০ থেকে ১১,০০০ রাউন্ড গুলি ছুড়তে পারে, যা আগত যে কোনো ক্ষেপণাস্ত্রকে আকাশেই গুঁড়িয়ে দিতে সক্ষম। দ্বিতীয়ত;১০ কিলোমিটার পাল্লার 'এইচকিউ-১০এ' ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে যা তাপ ও রাডার উভয় সংকেত ব্যবহার করে নিখুঁতভাবে লক্ষ্যবস্তু ধ্বংস করে।

পানির নিচে অজেয় প্রতিরক্ষা (এএসডব্লিউ)

তাইঝৌ কেবল আকাশ বা জলতলে নয়, পানির নিচের শত্রুর জন্য এখন যমদূত। এর সাবমেরিন বিধ্বংসী ব্যবস্থাকে তিনটি স্তরে সাজানো হয়েছে।

দীর্ঘ পাল্লা: খাড়া উৎক্ষেপণ ব্যবস্থা থেকে নিক্ষিপ্ত রকেটচালিত টর্পেডো যা ৫০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত আঘাত করতে পারে।

মাঝারি পাল্লা: জাহাজে থাকা শক্তিশালী হেলিকপ্টার যা গভীর সমুদ্রের সাবমেরিন খুঁজে বের করে ধ্বংস করতে পারে।

স্বল্প পাল্লা: জাহাজের দুই পাশে থাকা অত্যাধুনিক টর্পেডো টিউব এবং রকেট লঞ্চার যা কাছাকাছি আসা যে কোনো হুমকি মোকাবিলা করতে সক্ষম।

পুরানো রুশ রাডার সরিয়ে সেখানে বসানো হয়েছে চিনের নিজস্ব 'থ্রি-ডি' রাডার এবং ফেসড-অ্যারে রাডার। এই নতুন রাডারগুলো একই সাথে অনেকগুলো লক্ষ্যবস্তুকে অনুসরণ করতে পারে।

তাছাড়া, জাহাজে ৯৬টি নলের একটি নতুন প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে। এটি শত্রু ক্ষেপণাস্ত্রের রাডারকে বিভ্রান্ত করতে আকাশে বিশেষ ধরনের ধোঁয়া বা সংকেত তৈরি করে, যা জাহাজের টিকে থাকার সম্ভাবনা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

মজার ব্যাপার হলো, চিন জাহাজের ইঞ্জিন ব্যবস্থাটি আগের মতোই রেখেছে। উচ্চ-চাপের বয়লার ও বাষ্পীয় টারবাইন বিশিষ্ট এই ইঞ্জিনটি জাহাজটিকে ৩২ নট বা প্রায় ৬০ কিলোমিটার প্রতি ঘণ্টা গতিতে চালাতে সক্ষম। রাশিয়া যেখানে এই মডেলের জাহাজগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বসিয়ে দিচ্ছে, চিন সেখানে নিজস্ব খুচরা যন্ত্রাংশ ও মেধা ব্যবহার করে সেগুলোকে আধুনিক নৌ-বাহিনীর মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত করেছে।

বর্তমানে তাইঝৌ এবং এর সহোদর জাহাজগুলো চিনের পূর্ব সাগরীয় নৌবহরে অন্তর্ভুক্ত। আধুনিকায়নের ফলে এই জাহাজগুলো এখন চিনের বিমানবাহী রণতরী বহরের সাথে সমন্বয় করে কাজ করতে পারবে। এটি ওই অঞ্চলে চিনের সমুদ্রসীমা রক্ষা এবং শক্তি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে এক বিশাল মাইলফলক।

তাইঝৌ ডেস্ট্রয়ারের এই রূপান্তর বিশ্ববাসীকে একটি পরিষ্কার বার্তা দিচ্ছে—চিন এখন আর বিদেশী প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীল নয়। তারা পুরানো যুদ্ধজাহাজকেও আধুনিক সমরাস্ত্র ও ডিজিটাল নেটওয়ার্কের মাধ্যমে বর্তমান সময়ের সবচেয়ে আধুনিক মারণাস্ত্রে পরিণত করতে সক্ষম। রুশ নকশা আর চিনা প্রযুক্তির এই মিশেল তাইঝৌ-কে সমুদ্রে এক অপ্রতিদ্বন্দ্বী যোদ্ধা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। চিনা নৌবাহিনীর এই সাহসী পদক্ষেপ ভবিষ্যতে তাদের সমুদ্রসীমার নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক নৌ-রাজনীতিতেও তাদের প্রভাব বহুগুণ বৃদ্ধি করবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়