শিরোনাম
◈ পাহাড়ি আম-আনারসসহ কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বড় সম্ভাবনা, চাঁদাবাজি বন্ধে গুরুত্ব সরকারের ◈ পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ঢাকা-রিয়াদ-ঢাকা রুটের ফ্লাইট স্থগিত করল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ◈ ২০২৭ সালের পবিত্র রমজান রমজান ও ঈদুল ফিতরের সম্ভাব্য তারিখ জানাল আরব আমিরাত ◈ দিল্লি পুলিশের হেফাজত থেকে মুক্ত কেজরিওয়াল-মমতা, আটককে ‘অপহরণ’ বললেন তৃণমূল নেত্রী ◈ সৌদি আরবের রিয়াদ বিমানবন্দরে ক্ষেপণাস্ত্র হামলা, আহত বহু যাত্রী; বাতিল বহু ফ্লাইট ◈ আবুধাবি টেস্ট, বাংলা‌দে‌শের বিরু‌দ্ধে লড়‌ছে আফগা‌নিস্তান, এখ‌নো ১৩৫ রানে পিছিয়ে ◈ যুক্তরাষ্ট্রে পেনসিলভানিয়ায় বন্দুকধারীর এলোপাতাড়ি গুলি, শিশুসহ নিহত ৯ ◈ ফেসবুকে পরিচয় কে এই রাজু, ১৭ দিনের সম্পর্কের পর কক্সবাজার থেকে ফেরার পথে কী ঘটেছিল স্কুলছাত্রীর সঙ্গে ◈ চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি চুক্তি: বাংলাদেশের লাভ কতটা, ঝুঁকি কোথায়? ◈ কোনো দেশের মুখাপেক্ষী নয়, সমমর্যাদার অংশীদার হতে চায় বাংলাদেশ : পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী

প্রকাশিত : ০৪ মে, ২০২৬, ১১:১১ দুপুর
আপডেট : ১৬ আগস্ট, ২০২৬, ০৭:০০ সকাল

প্রতিবেদক : মহসিন কবির

রাজধানীতে নতুন আতঙ্ক ছিনতাই

মহসিন কবির: রাজধানীতে নতুন আতঙ্ক ছিনতাই। বিভিন্ন এলাকায় ধারালো অস্ত্র (চাপাতি/সামুরাই) ঠেকিয়ে মোবাইল, টাকা ও সর্বস্ব লুট করছে অপরাধীরা। সন্ধ্যার পর থেকে ভোর রাত পর্যন্ত রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় পথচারী, শ্রমজীবী মানুষ, ব্যক্তিগত গাড়ির চালকসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ পড়ছেন সংঘবদ্ধ ছিনতাইকারীদের কবলে। ধরা পড়েছে, সাজাও দেওয়া হচ্ছে, তারপরও কমছে ছিনতাই।

গত ৬ মাসে ঢাকার বিভিন্ন এলাকা থেকে অন্তত ১২০০ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব-পুলিশ। কিন্তু গ্রেপ্তারের কিছুদিন পরই তারা আদালত থেকে জামিন নিয়ে ফের ছিনতাইয়ে নামছে। এমন প্রেক্ষাপটে ঢাকা মহানগর পুলিশ গত ৬ মাসে ১৬৫ ছিনতাইকারীকে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটকাদেশের প্রস্তাব করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে। পরে তাদের আটকাদেশ কার্যকর হয়; কিন্তু আটকাদেশ দিয়েও রাজধানীতে ছিনতাই থামানো যাচ্ছে না। গত বৃহস্পতি ও শুক্রবার রাজধানীর তিন এলাকায় তিনটি বড় ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় ছয়জন ছিনতাইকারীর হামলায় আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন।

ঢাকা মহানগর পুলিশের যুগ্ম কমিশনার (ক্রাইম) মো. ফারুক হোসেন গণমাধ্যমকে বলেছেন, গত ৬ মাসে প্রায় ১২০০ ছিনতাইকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা থেকে। কিন্তু গ্রেপ্তারের

কিছুদিন পরই তারা জামিনে ছাড়া পেয়ে আবার ছিনতাইয়ে যুক্ত হচ্ছে। বাধ্য হয়ে দুর্ধর্ষ প্রকৃতির ছিনতাইকারীদের বিশেষ ক্ষমতা আইনে আটকাদেশ দেওয়ার প্রস্তাব করা হচ্ছে। সে অনুযায়ী জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আটকাদেশ প্রদান করেন।

Advertisement

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, ছিনতাইয়ের পেছনে মূলত কিশোর গ্যাং বা সংগঠিত অপরাধচক্র সক্রিয়, যারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার ও অর্থ আদায়ের জন্য ছিনতাইকে নিয়মিত হাতিয়ার হিসেবে এখন ব্যবহার করছে।

পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রাজধানীর মোহাম্মদপুর, আদাবর, যাত্রাবাড়ী, মালিবাগ, আগারগাঁওসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় বেশি ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। ছিনতাইয়ের ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। আগে একক বা ছোট আকারের ছিনতাই বেশি দেখা গেলেও এখন তা সংঘবদ্ধ রূপ নিয়েছে। সাধারণত নির্জন সড়ক, অলিগলি, বাসস্ট্যান্ড বা রেলগেট এলাকায় তারা অবস্থান নেয়। একা পথচারী বা দুর্বল লক্ষ্যবস্তু দেখলেই কয়েকজন মিলে ঘিরে ধরে। সন্ধ্যার পর থেকে ভোর পর্যন্ত সময়টা মোক্ষম হিসেবে বেছে নিচ্ছে ছিনতাইকারীরা।

ছিনতাইকারীরা ধারালো অস্ত্র বিশেষ করে ছুরি বা চাপাতি ব্যবহার করে ভয় দেখিয়ে টাকা, মোবাইল ফোন ও মূল্যবানসামগ্রী ছিনিয়ে নেয়। অনেক ক্ষেত্রে বাধা দিলে বা প্রতিরোধ করলে ভুক্তভোগীকে আঘাতও করা হচ্ছে।

ঢাকা মহানগর পুলিশের অপরাধ পরিসংখ্যান বলছে, ছিনতাই, ডাকাতি ও দস্যুতার ঘটনায় গত ফেব্রুয়ারি মাসে রাজধানীতে তিনটি ডাকাতি, ২২টি দস্যুতা এবং চারটি দ্রুত বিচার আইনে মামলা করা হয়। মার্চ মাসে পাঁচটি ডাকাতি, ২৪টি দস্যুতা এবং সাতটি দ্রুত বিচার আইনে মামলা করা হয়। ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ডাকাতি তিনটি, দস্যুতা ৩৮টি এবং দ্রুত বিচার আইনে ১২টি মামলা করা হয়; কিন্তু পুলিশের এ পরিসংখ্যানই রাজধানীতে ছিনতাই ও ডাকাতির প্রকৃত চিত্র নয়। অধিকাংশ ছিনতাইয়ের ঘটনায় ভুক্তভোগীরা মামলা করতে অনীহা প্রকাশ করেন। তারা বেশিরভাগ ঘটনাতে জিডি করেন। আবার কেউ কেউ ছিনতাইয়ের শিকার হওয়ার পর পুলিশকে বিষয়টি অবহিত করেন না। ফলে সংশ্লিষ্ট ঘটনাটি পুলিশের রেকর্ডে আসে না।

ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের লালবাগ বিভাগের উপপুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেছেন, উঠান বৈঠক এবং ওপেন হাউস ডে’র মাধ্যমে ছিনতাইকারীদের বিষয়ে স্থানীয় নগরবাসীকে সচেতন করা হচ্ছে। এ ছাড়া ছিনতাইপ্রবণ এলাকাগুলোয় নজরদারি করা হচ্ছে। ছিনতাইকারীদের হালনাগাদ তালিকা তৈরির পাশাপাশি চিহ্নিত ছিনতাইকারীদের ধরতে বিশেষ অভিযানও পরিচালিত হচ্ছে।

১ মে রাতে রাজধানীর মালিবাগ রেলগেট এলাকার ইবনে সিনা হাসপাতালসংলগ্ন সড়কে তিন পোশাকশ্রমিক ছিনতাইকারীদের ছুরিকাঘাতে আহত হন। আহত করিমন, নবী ও রিফাত ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

আহতদের স্বজন মাহফুজুর রহমান জানান, শ্রমিক দিবস উপলক্ষে কারখানা বন্ধ থাকায় তারা একসঙ্গে ঘুরতে বের হন। মালিবাগ রেলগেট এলাকায় কয়েকজন ছিনতাইকারী করিমনকে সুইচ গিয়ার দিয়ে আঘাত করে তার মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়। এ সময় তার চিৎকারে আশপাশের লোকজন এক ছিনতাইকারীকে আটক করে। এ সময় ছিনতাইকারীরা সংঘদ্ধ হয়ে অপর দুই শ্রমিককে ছুরিকাঘাত করে আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং আটক সঙ্গীকে ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। পরে রক্তাক্ত অবস্থায় তিনজনকে প্রথমে মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখান থেকে ঢামেক হাসপাতালে স্থানান্তর করা হয়।

১ মে ভোরে শেরেবাংলা নগর থানাধীন আগারগাঁও নির্বাচন কমিশন অফিসের সামনের রাস্তায় ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন শিল্পী বেগম (৪০) নামে এক গৃহবধূ। শাশুড়ির চিকিৎসার টাকা নিয়ে হাসপাতালে যাওয়ার পথে ছিনতাইকারীরা তাকে কুপিয়ে ২৫ হাজার টাকা ও দুটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয়।

আহত শিল্পী বেগমকে উদ্ধার করে প্রথমে স্থানীয় ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে এবং পরে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়।

আহতের স্বামী ব্যবসায়ী আবদুল হক জানান, ‘তার মা মরিয়ম বেগম (৯৫) হঠাৎ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে আগারগাঁও নিউরোসায়েন্স হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। হাসপাতালে মায়ের চিকিৎসার জন্য জরুরি টাকার প্রয়োজন হওয়ায় তিনি স্ত্রীকে ফোন করে বাসা থেকে টাকা নিয়ে আসতে বলেন।’

স্বামীর ফোন পেয়ে ভোর সাড়ে ৪টার দিকে কাফরুলের ইব্রাহিমপুর এলাকার বাসা থেকে ২৫ হাজার টাকা ও দুটি মোবাইল ফোন নিয়ে ব্যাটারিচালিত রিকশায় হাসপাতালের উদ্দেশে রওনা হন শিল্পী বেগম। রিকশাটি নির্বাচন কমিশন অফিসের সামনের রাস্তায় পৌঁছালে পাঁচ-ছয়জনের একটি সশস্ত্র ছিনতাইকারী দল গতিরোধ করে। ?ছিনতাইকারীরা শিল্পীর হাতে ও পায়ে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে জখম করে এবং সঙ্গে থাকা টাকা ও মোবাইল ফোন দুটি ছিনতাই করে পালিয়ে যায়।

এ ঘটনার আগের দিন বৃহস্পতিবার ভোরে রাজধানীর শাহবাগ শিশুপার্কের সামনে ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে এক দম্পতি আহত হন। আহতরা হলেন- মো. জামাল উদ্দিন (৫৯) ও মোছা. সামছুন্নাহার (৫৫)। পরে আহত অবস্থায় তাদের উদ্ধার করে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে আনা হয়।

তাদের ছেলে সামিউল আরাফাত বলেন, ভোরের দিকে বাবা-মা অটোরিকশায় শাহবাগের শিশুপার্কের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় হঠাৎ তিন-চারজন ছিনতাইকারী তাদের গতিরোধ করে। তারা আমার বাবা ও মায়ের ডান হাতে ছুরিকাঘাত করে মোবাইল নিয়ে পালিয়ে যায়।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীসহ একাধিক সূত্রে জানা গেছে, ঢাকায় ছিনতাইয়ের সঙ্গে তিন ধরনের অপরাধী জড়িত। একদল পেশাদার ছিনতাইকারী। এরা সংঘবদ্ধভাবে ছিনতাই করে। এদের প্রত্যেক গ্রুপে চার থেকে পাঁচজন সদস্য থাকে। নির্দিষ্ট স্পটে অবস্থান করে ছিনতাইয়ের পাশাপাশি সিএনজি অটোরিকশা কিংবা প্রাইভেটকার নিয়ে রাতে ঘুরে ঘুরে ছিনতাই করে। 

আরেক ধরনের ছিনতাইকারী মাদকের টাকা জোগান দিতে ছিনতাই করে। এদের অধিকাংশই ভাসমান কিংবা বস্তির বাসিন্দা। এরা রাস্তাঘাটে ওতপেতে থাকে। বিভিন্ন পরিবহনের যাত্রী কিংবা পথচারীর মোবাইল ফোন, কানের দুল, ভ্যানিটি ব্যাগ ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়। আরেক ধরনের ছিনতাইকারী রয়েছে, যারা শৌখিন হিসাবে পরিচিত। এদের মধ্যে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের বখে যাওয়া শিক্ষার্থীও আছেন। তারা শখের বসে ছিনতাইয়ে নামে। দামি মোটরসাইকেলে ঘুরে বেড়ানো এসব অপরাধী ল্যাপটপ কিংবা দামি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নিয়ে পালিয়ে যায়।

  • সর্বশেষ