শিরোনাম
◈ ব্যবসায়ী থেকে তিন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী: কে এই শেখ রবিউল আলম? ◈ গণতন্ত্রের অগ্রযাত্রাকে সুসংহত করতে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ : প্রধানমন্ত্রী ◈ সংরক্ষিত নারী আসনে এমপি পদে আলোচনায় যেসব বিএনপি নেত্রী ◈ ৮ উপদেষ্টার দপ্তর বণ্টন, জানা গেল কে কোন দায়িত্বে? ◈ ফুটবল বিশ্বকাপ দেখতে আবেদন পড়েছে ৫০ কো‌টি ৮০ লাখ ◈ শেখ হাসিনা কি নেতাকর্মী‌দের ৩২ নম্ব‌রে যাতায়ত ও আওয়ামী লীগের কার্যালয় খোলার নির্দেশ দিয়েছেন?  ◈ দুই মাস পর ভারতীয় নাগরিকদের ভিসা দেওয়া শুরু করল বাংলাদেশ ◈ রমজানে নিত্যপণ্যের দাম বাড়বে না, আশ্বাস দিলেন ধর্মমন্ত্রী ◈ এলডিসি উত্তরণ: তিন বছর স্থগিত চেয়ে জাতিসংঘে চিঠি দিলো বাংলাদেশ ◈ অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে এখনো বিতর্ক কেন?

প্রকাশিত : ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৪:৫৪ দুপুর
আপডেট : ২০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ০৯:০০ রাত

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ের বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে এখনো বিতর্ক কেন?

বিবিসি বাংলার প্রতিবেদন।। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রধানমন্ত্রী পদে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমানকে অভিনন্দন জানিয়ে এক চিঠিতে লিখেছেন, 'আপনার মেয়াদ শুরুর এই সময়ে আমি আশা করি, আমাদের পারস্পরিক বাণিজ্য চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে বাণিজ্যিক সম্পর্কের দারুণ গতি ধরে রাখতে আপনি আমাকে সাহায্য করবেন। এই চুক্তিতে আমাদের উভয় দেশের কৃষক ও শ্রমিকেরা সুবিধা পাবেন'।

সম্প্রতি বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে 'অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড' নামে একটি বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। তবে চুক্তিটি জাতীয় নির্বাচনের ঠিক আগে এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের শেষ সময়ে সই হওয়ায় বিষয়টি ঘিরে নানা সমালোচনা দেখা দিয়েছে।

প্রশ্ন উঠছে, নির্বাচনের কয়েকদিন আগে এই চুক্তি স্বাক্ষর কেন করতে হলো?

যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এই বাণিজ্য চুক্তি নিয়ে আলোচনা চলছিল নয় মাস ধরে। কিন্তু গোপনীয়তার শর্তের কারণে তখন এর বিস্তারিত প্রকাশ করেনি কোনো পক্ষ। এখন চুক্তি প্রকাশ হওয়ার পর বাংলাদেশের অর্থনীতিবিদদের অনেকেই বলছেন, এই চুক্তির পুনর্মূল্যায়ন হওয়া দরকার।

চুক্তির খুঁটিনাটি বিষয়ের দিকে নজর দিয়ে এটাও বলা হচ্ছে যে, চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষিত হয়নি, বরং প্রাধান্য পেয়েছে আমেরিকার ইচ্ছা। ফলে অর্থনীতিবিদদের কেউ কেউ বলছেন, বাংলাদেশের নির্বাচিত সরকারের উচিত চুক্তি পরীক্ষা করে দেখা।

উল্লেখ্য, গত বছর, অর্থাৎ ২০২৫ সালের ২ এপ্রিল, ডোনাল্ড ট্রাম্পের এক নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের ওপর বিভিন্ন হারে 'রেসিপ্রোকাল ট্যারিফ' বা পাল্টা শুল্ক আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। সে সিদ্ধান্ত বিশ্ব অর্থনীতিতে একধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছিল।

বাংলাদেশের উপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করা হয় ৩৫ শতাংশ।

সেসময় বাংলাদেশ সরকার যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যোগাযোগ করে শুল্ক প্রত্যাহার বা কমানোর অনুরোধ করে। পরে সেই শুল্ক হার কমিয়ে ২০ শতাংশে নামিয়ে আনা হয়।

তবে শুল্ক নিয়ে চূড়ান্ত মতে পৌঁছাতে দুই দেশের মধ্যে আলোচনাও চলতে থাকে। গত নয় মাস ধরে বিভিন্ন বৈঠক ও ধারাবাহিক আলোচনা হয়েছে।

শেষ পর্যন্ত দরকষাকষি শেষে উভয় পক্ষ 'অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড' নামে এই বাণিজ্য চুক্তিতে স্বাক্ষর করে। নতুন চুক্তির পর বাংলাদেশের উপর মার্কিন পাল্টা শুল্ক এখন ১৯ শতাংশ।

চুক্তিতে উভয় দেশের বিভিন্ন পণ্য শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার পেয়েছে।

কিন্তু শেষপর্যন্ত যা হয়েছে, তাতে বাংলাদেশের নেগোসিয়েশনে 'দুর্বলতা' দেখতে পেয়েছেন অর্থনীতি ও বাণিজ্য বিশ্লেষকরা।

বাণিজ্য চুক্তি কার পক্ষে গেল?

যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদার। যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশ–এর মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ৮০০ কোটি ডলার। তবে এ বাণিজ্যে বাংলাদেশ রপ্তানি বেশি করে, আমদানি তুলনামূলক কম।

ডলারের হিসেবে বাংলাদেশ বছরে যুক্তরাষ্ট্রে প্রায় ৬০০ কোটি ডলারের পণ্য রপ্তানি করে। বিপরীতে আমদানি করে প্রায় ২০০ কোটি ডলারের পণ্য। অর্থাৎ যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশ থেকে বছরে প্রায় ৪০০ কোটি ডলারের পণ্য বেশি কেনে।

এই বাণিজ্য ভারসাম্যহীনতার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র এখন বলছে, বাংলাদেশকে তাদের কাছ থেকে কেনাকাটা বাড়াতে হবে। এ লক্ষ্যে দেশটি শাস্তিমূলক শুল্কও আরোপ করে।

এই পরিস্থিতির সমাধানেই দুই দেশের মধ্যে সাম্প্রতিক চুক্তি। যুক্তরাষ্ট্র একই কৌশলে চাপ প্রয়োগ করে ১০০টিরও বেশি দেশের সঙ্গে চুক্তিতে গিয়েছে বা যাচ্ছে।

তবে সামগ্রিকভাবে এই চুক্তিতে বাংলাদেশের তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রই বেশি লাভবান হয়েছে বলে মত দিয়েছেন সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, 'এই চুক্তি আমেরিকার পক্ষে গেছে।'

তার ভাষ্য, 'চুক্তিতে অবশ্যই মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অনেক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তারা কী করবে, আমরা কী করবো—এই বিষয়গুলোতে যে চারগুণ বেশি আমাদের বাধ্যতামূলকভাবে করার ক্লজগুলো আছে, সেখান থেকেও বোঝা যায় (আমেরিকার প্রাধান্য)। আর সাধারণভাবেও এটার যে সাবস্টান্স, সেখান থেকেও বোঝা যায় যে, এটা তাদের পক্ষে গেছে।'

তাহলে এই চুক্তি থেকে বাংলাদেশ কী অর্জন করল—এমন প্রশ্নে তৈরি পোশাক খাতের প্রসঙ্গ তোলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়–এর ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের অধ্যাপক আবু হেনা রেজা হাসান।

তবে একই সঙ্গে তিনি মনে করেন, চুক্তির পেছনে সরকার মূলত অর্থনৈতিক অর্জনের চেয়ে রাজনৈতিক দিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছে।

তিনি বলেন, 'আমি যদি বলি বাংলাদেশ এখানে যেটা অর্জন করতে চেয়েছে, সেটা হলো, আমেরিকান পলিটিক্যাল ফেইভার (রাজনৈতিক অনুগ্রহ)। ইকোনমিক ফেইভার চেয়ে পলিটিক্যাল ফেইভার। আমরা পলিটিক্যালি তোমাদের (আমেরিকা) সঙ্গে অ্যালাইনড। সুতরাং আমাদেরকে রক্ষা করো। আর গার্মেন্টসকে রক্ষা করো। এটাই ছিল বাংলাদেশের মেইন বেনেফিট।'

অন্যদিকে, অধ্যাপক আবু হেনা রেজা হাসানের মতে, 'আমেরিকা পলিটিক্যাল বেনেফিটের সঙ্গে সঙ্গে তাদের ইকোনমিক বেনেফিটও নিশ্চিত করে নিয়েছে।'

চুক্তির কোন বিষয়গুলো নিয়ে প্রশ্ন?

চুক্তির শেষের দিকে সেকশন ছয়ে 'কমার্শিয়াল কনসিডারেশন' শিরোনামে মূলত কিছু কেনাকাটার বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলনামূলক কম আমদানি করছে—এ ঘাটতি পুষিয়ে নিতে ভবিষ্যতে কোন কোন পণ্যের ক্রয় বাড়ানো হবে, তা সেখানে তুলে ধরা হয়েছে।

সেকশনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে ১৪টি বোয়িং উড়োজাহাজ কিনবে, আগামী ১৫ বছরে ১৫শ কোটি ডলারের জ্বালানি আমদানি করবে এবং প্রতিবছর সাড়ে তিনশো কোটি ডলারের কৃষিপণ্য কিনবে।

তবে এসব প্রতিশ্রুতি ঘিরে প্রশ্ন উঠছে—এত বড় অঙ্কের কেনাকাটা কেবল আমদানি বাড়ানোর উদ্দেশ্যে, নাকি প্রকৃত চাহিদার ভিত্তিতে? বিশ্লেষকদের মতে, চাহিদা যাচাই ছাড়া এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া হলে অর্থনৈতিক ক্ষতির ঝুঁকি থেকেই যায়।

এ প্রসঙ্গে আবু হেনা রেজা হাসান বলেন, 'এই যে এয়ারক্রাফটগুলো, এগুলোর কি বাংলাদেশের দরকার আছে? আমরা যেগুলো কিনছি, সেগুলো কী ধরনের এয়ারক্রাফট—আমরা জানি না। শুধু বলা হচ্ছে, ১৪টা কিনবো। এগুলো নিয়ে এসে আমরা কি আমাদের এয়ারলাইন্সটাকে লসের দিকে ঠেলে দিচ্ছি? এগুলোও কিন্তু ভাবতে হবে।'

অন্যদিকে সংখ্যা বা নির্দিষ্ট অঙ্ক ধরে কেনার প্রতিশ্রুতিতে ঝুঁকি দেখছেন সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি)-এর ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, 'এগুলো একেবারে কংক্রিট নাম্বার দিয়ে বলা হয়েছে। আবার পরে কোনো সময় যদি প্রয়োজন দেখা দেয়, তখন এসব ক্রয় পেছানো দুরূহ হয়ে যাবে। তখন পেছাতে গেলেই বলা হতে পারে, পাল্টা শুল্ক—যেটা প্রথমে ৩৭ শতাংশ ছিল—সেটিতে ফিরে যাওয়া হবে।'

বিশ্লেষকেরা নেগোসিয়েশন প্রক্রিয়ায় আরেকটি দুর্বলতার কথাও উল্লেখ করেছেন। তাঁদের মতে, বিমান বা গমের মতো কিছু আমদানি সরকারিভাবে সম্পন্ন হলেও অন্যান্য কৃষিপণ্য, তুলা ও তেলের মতো পণ্য বেসরকারিভাবে আমদানি করবে দেশীয় কোম্পানিগুলো।

কিন্তু বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশের বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো ভারত, পাকিস্তান বা চীন থেকে তুলনামূলক কম সময় ও কম খরচে পণ্য আমদানি করতে পারে। সেখানে যুক্তরাষ্ট্র থেকে একই পণ্য আনতে গেলে ব্যয় ও সময়—দুটিই বাড়ার আশঙ্কা থাকে।

এ বিষয়ে মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, 'কোম্পানিগুলো তো সরকারের আমদানি ঘাটতি মেটাতে নিজেদের আর্থিক ক্ষতি করে ভারত বা পাকিস্তানের পরিবর্তে আমেরিকা থেকে আনতে যাবে না। অথবা সেটি করতে গেলে সরকারের কাছে বাড়তি কোনো সুবিধা বা ভর্তুকি চাইতে পারে। সরকার কি চুক্তির সময় এই কস্টিং করেছে?'

ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্কেও টানাপড়েন হতে পারে

'অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড' নামে এই চুক্তিতে উভয় দেশই বহু পণ্যে শুল্ক ছাড় পাবে। যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ৬ হাজার ৭১০টি পণ্য এবং বাংলাদেশের ১ হাজার ৬৩৮টি পণ্য রয়েছে।

কোনো কোনো পণ্য শুরু থেকেই আবার ধাপে ধাপে শুল্কমুক্ত সুবিধার আওতায় আসবে। তবে এতে বাংলাদেশের রাজস্ব আয় কমার আশঙ্কা আছে।

এর পাশাপাশি সম্ভাব্য আর্থিক ক্ষতির বাইরেও কিছু বিষয় আছে, যা চীন-রাশিয়ার মতো দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ককেও প্রভাবিত করতে পারে। চুক্তির শেষাংশে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্র থেকে সামরিক সরঞ্জাম ক্রয় বাড়ানোর চেষ্টা করবে এবং নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে কেনাকাটা সীমিত করার চেষ্টা করবে। যদিও কোন দেশ থেকে সামরিক সরঞ্জাম কমাতে হবে, তা নির্দিষ্ট করা হয়নি। বর্তমানে বাংলাদেশ প্রধানত চীনের কাছ থেকে এসব সরঞ্জাম কেনে।

চুক্তির চতুর্থ সেকশনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থের সংঘাত আছে এমন দেশ থেকে পারমাণবিক রিঅ্যাক্টর, ফুয়েল রড বা সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম কেনা যাবে না। তবে একটি ব্যতিক্রম রয়েছে—যদি বিকল্প সরবরাহকারী বা প্রযুক্তি না থাকে, অথবা চুক্তি কার্যকর হওয়ার আগেই বিদ্যমান চুল্লির জন্য উপকরণ কেনার চুক্তি হয়ে থাকে, তবে তা নিষেধাজ্ঞার আওতামুক্ত থাকবে।

অর্থাৎ রাশিয়ার প্রযুক্তি সহায়তায় নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য জ্বালানি সরবরাহ অব্যাহত থাকতে পারে, কিন্তু ভবিষ্যতের প্রকল্পে যুক্তরাষ্ট্রের নজর থাকবে।

বিশ্লেষকদের মতে, এই ধারাগুলো চীন-রাশিয়ার সঙ্গে বাংলাদেশের সামরিক ও জ্বালানি সম্পর্ককে চাপে ফেলতে পারে। কারণ চুক্তি বাংলাদেশকে ধাপে ধাপে আমেরিকামুখী করে তুলবে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আবু হেনা রেজা হাসান বলেন, 'বাংলাদেশ ডিফেন্সে আর কতটুকুই বা কিনবে। কিন্তু আমাদের ডিফেন্স যখন ওদের সিস্টেমের সঙ্গে ইন্টিগ্রেট হয়ে যাবে, তখন আমাদের ডিফেন্স স্ট্রাটেজি তাদের স্ট্রাটেজির বাইরে যেতে পারবে না।'

অন্য দেশের সঙ্গে সম্পর্ক খারাপ হতে পারে এমন আরও বিষয়ও আছে। সেকশন চার অনুযায়ী, যদি যুক্তরাষ্ট্র তার জাতীয় স্বার্থ ও অর্থনৈতিক বিবেচনায় সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করে, তাহলে বাংলাদেশকেও তা অনুসরণ করতে হবে।

এছাড়া তৃতীয় কোনো দেশের কোম্পানি বাংলাদেশে বাজারমূল্যের চেয়ে কমদামে পণ্য বিক্রি বা রপ্তানি করতে পারবে না, যার ফলে আমেরিকার পণ্যের বিক্রি কমে যেতে পারে।

সিপিডির ডিস্টিংগুইশড ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বিবিসি বাংলাকে বলেন, 'বাজারমূল্যের চেয়ে কমদামে পণ্য বিক্রির বিষয়টি চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সমস্যা তৈরি করতে পারে। কারণ দেশীয় ব্যবসায়ী বা ভোক্তা চীন থেকে কম দামে পণ্য কেনে। এটি স্বাভাবিক।'

তিনি আরও বলেন, 'সরকারিভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানকে ভর্তুকি দিলে, সেই প্রতিষ্ঠান অনেক সময় কম মূল্যে পণ্য বিক্রি করার সক্ষমতা অর্জন করে। এটি আন্তর্জাতিক আইনের ব্যত্যয়। আমেরিকা তাদের বাজারমূল্যের বিষয়টি দিয়ে সেই জায়গায় বেশি নজর রাখবে যেখানে মার্কিন বাণিজ্য স্বার্থ হুমকিতে রয়েছে। চীনের পক্ষ থেকে বলা হবে, আমি কোনো ভর্তুকি দেই না। এভাবে নানা ঝুঁকি তৈরি হবে, যেখানে অর্থনীতি ও ভূরাজনীতি—উভয়ই জড়িয়ে আছে। ব্যবসায়ীরা যেখান থেকে কমে পণ্য পাবেন, সেখান থেকেই আনবেন।'

এমন চুক্তি কেন করা হলো?

চুক্তিতে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ, ই-কমার্সসহ আরও বিষয় রয়েছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল বিজনেস বিভাগের অধ্যাপক আবু হেনা রেজা হাসান বলছেন, 'মান নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে মার্কিন প্রতিষ্ঠানগুলোর অনুমোদন, মেধাস্বত্ব আইন ইত্যাদির মাধ্যমে বাংলাদেশের উপর একধরনের নিয়ন্ত্রণ আরোপ হয়েছে। পাল্টা শুল্কের কথা বলে তারা আমাদের অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ ও লিগ্যাল সিস্টেমকে চাপিয়ে দিয়েছে। আমরা কোনো নন-ট্যারিফ বাধা বা কারিগরি মান নিয়ে মার্কিন পণ্যে বাধা দিতে পারব না, কিন্তু তারা পারবে। আমাদের কারিগরি মান বিশ্বব্যাপী গৃহীত নয়, আমরা পিছিয়ে আছি।'

সদ্য সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস দায়িত্ব ছাড়ার আগে বলেন, চুক্তি বাণিজ্য ও আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে বাংলাদেশের জন্য শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে।

তিনি উল্লেখ করেন, 'চুক্তির ফলে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে বাংলাদেশের জন্য প্রযোজ্য পারস্পরিক শুল্ক ৩৭ শতাংশ থেকে ১৯ শতাংশে কমেছে। যুক্তরাষ্ট্রে উৎপাদিত তুলা ও কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করে তৈরি পোশাক পণ্যে শূন্য পারস্পরিক শুল্ক সুবিধা এসেছে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশি পোশাক আরও কম দামে মার্কিন বাজারে প্রবেশ করবে।'

তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পাল্টা শুল্ক কমলেও, তৈরি পোশাকের বাজার ঠিক থাকলেও, এর জন্য যেসব ছাড় দিতে হয়েছে তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র থেকে তুলা আমদানি করলে খরচ বেশি হলে শূন্য শুল্ক সুবিধা থাকলেও লাভ কমতে পারে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হচ্ছে, দেশের অর্থনীতি ও বহির্বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জড়িত এমন স্পর্শকাতর চুক্তি কেন শেষ সময়ে সই করা হলো? নতুন নির্বাচিত সরকারের জন্য কেন রাখা হলো না?

চুক্তি ইতোমধ্যেই সই হয়ে গেছে।

এখন প্রশ্ন, বিএনপির নবগঠিত সরকার এই চুক্তি নিয়ে কী করবে। নতুন সরকারের কেউ আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করেননি।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা খলিলুর রহমান নতুন সরকারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন।

সবমিলিয়ে চুক্তি থেকে সরে আসার সুযোগ থাকলেও, বাংলাদেশের জন্য তা করা কঠিন হবে বলে মনে হচ্ছে। নতুন ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকার এখনই সেই ঝুঁকি নেবে কি না—এটিও এখন প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

 

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়