মনজুর এ আজিজ: ভোলা থেকে এলএনজি না এনে ৯৩০০ কোটি টাকা সাশ্রয়ের বিকল্প প্রস্তাব দিলেন বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। বিকল্প প্রস্তাব গৃহীত হলে বছরে ৯৩০ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। মঙ্গলবার (২৭ জানুয়ারি) ভোলার প্রস্তাবিত এলএনজির দাম নির্ধারনের বিইআরসি আয়োজিত গণশুনানিতে এমন প্রস্তাব তুলে ধরেন বিপিডিবি অতিরিক্ত পরিচালক (অর্থ পরিদপ্তর) সৈয়দ জুলফিকার আলী। তিনি বলেন, ১ ঘনমিটার গ্যাস দিয়ে ৪ থেকে ৫ ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব। সেই বিদ্যুৎ সঞ্চালন করে ঢাকায় আনতে খরচ পড়বে ১.২৪ টাকা। এতে কোনো বিনিয়োগের প্রয়োজন নেই।
জুলফিকার আলী বলেন, ভোলা থেকে এলএনজি আকারে গ্যাস আনার প্রস্তাবে প্রতি ঘনমিটারের পরিবহন খরচ প্রস্তাব করা হয়েছে ২৯.৯০ টাকা। প্রস্তাবিত ৩০ মিলিয়ন এলএনজি পরিবহনে বছরে খরচ হবে ৯৩০ কোটি টোকা। দশ বছরের চুক্তির বিপরীতে ৯৩০০ কোটি টাকা পরিশোধ করতে হবে। রাষ্ট্রের এই টাকা অপচয় না করে ভোলায় ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের অনুমোদন দেওয়া হোক। দুই বছরের পরিবহন খরচ হলেই বিদ্যুৎকেন্দ্র হয়ে যাবে। বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন রয়েছে যে কারণে পরিবহনে কোনো খরচ যোগ হচ্ছে না।
রাজধানী ও তার আশপাশের এলাকার গ্যাস সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ২০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎকেন্দ্রে গ্যাস প্রয়োজন হবে ৪৫ মিলিয়ন ঘনফুট। ঢাকা এলাকায় আমাদের সেই পরিমাণ গ্যাস কমিয়ে দেওয়া যেতে পারে। এতে ঢাকা এলাকায় সংকট দূর হবে, আবার আমাদের বিদ্যুতের সংকটও দূর হবে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিপিডিবির মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান আশুগঞ্জ পাওয়ার স্টেশন কোম্পানি অনেকদিন ধরেই গ্যাসের নিশ্চয়তার জন্য ঘুরছে। গ্যাসের সংযোগ পেতে ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব বরাবর আবেদন দিয়ে রেখেছে। আরও একাধিক আলোচক ভোলা থেকে বিপুল পরিবহন খরচ দিয়ে এলএনজি আনার বিপক্ষে মতামত তুলে ধরেন।
গণশুনানিতে বিইআরসি টেকনিক্যাল কমিটি তাদের রিপোর্টে উল্লেখ করেন, এলএনজি আকারে আনার বিষয়টি যেহেতু নতুন, তাই হিসাব করে সুনির্দিষ্ট খরচ বের করা কঠিন। আমরা মনে করি ২৯.৯০ টাকা ঊর্ধ্বসীমা করা যেতে পারে। এলএনজি আনার জন্য দরপত্র আহ্বান করার পর যে প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হবে। তাদেরকে বিইআরসি লাইসেন্স নিতে হবে, তারপর গণশুনানি করে দর চূড়ান্ত করা যেতে পারে।
গণশুনানিতে পেট্রোবাংলার পক্ষ থেকে বলা হয়, ভোলা থেকে এখন সিএনজি আকারে গ্যাস আনা হচ্ছে। সেই গ্যাসের পরিবহন খরচ নির্বাহী আদেশে ২৯.৯০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই গ্যাসের দামসহ ভোক্তাকে দিতে হচ্ছে ৪৭.৫০ টাকা। আগের সরকারের নির্বাহী আদেশে নির্ধারিত গ্যাসের দামের সমান এলএনজির দামও নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিইআরসি টেকনিক্যাল কমিটিও নির্বাহী আদেশের গেজেট ধরে ৪৭.৫০ টাকা প্রস্তাব করার বক্তারা কঠোর সমালোচনা করেন। তারা বলেন, সেই সময়ে একটি বিশেষ কোম্পানিকে সুবিধা দিতে ওই গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। এখন বিইআরসির সুযোগ এসেছে, আগের পরিবহন খরচ যথাযথ কি-না যাচাইয়ের। তারা যাচাই না করে এলএনজির প্রস্তাব করাটা আপত্তিকর।
শুনানি শেষে বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ বলেন, আমরা সকলের মতামত শুনেছি, নোটও করেছি। আরও কারও কোন রকম মতামত থাকলে ২ ফেব্রুয়ারির মধ্যে লিখিত মতামত দিতে পারবেন। তারপর সবকিছু যাচাই-বাছাই করে সিদ্ধান্ত জানানো হবে।
এলএনজির আকারে না এনে পাইপলাইনে করে আনা সংক্রান্ত বক্তব্যের জবাবে জালাল আহমেদ বলেন, পাইপলাইন লাগবেই, এটা পরবেক্ষণে উল্লেখ থাকবে। ভোলা-বরিশাল পাইপলাইনের প্রাক সমীক্ষা শেষ হয়েছে। আমি মনে করি ভোলা-বরিশাল পাইপলাইন আগে করা যেতে পারে। কারণ এখন সময় খুবই গুরত্বপূর্ণ।
শুনানিতে পেট্রোবাংলা, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড, সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড, বাপেক্স, জিটিসিএল, আরপিজিসিএলসহ ব্যবসায়ী সংগঠনের নেতৃবৃন্দ আলোচনায় অংশ নেন।
দেশে চলছে ভয়াবহ গ্যাস সংকট, এলএনজি আমদানি করেও ঘাটতি সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। তেমন সময়ে দ্বীপ জেলা ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস পড়ে রয়েছে চাহিদা না থাকায় দৈনিক মাত্র ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে, আবার পাইপলাইন না থাকায় জাতীয় গ্রিডে দেওয়া যাচ্ছে না। ভোলাতে ৩টি গ্যাস ফিল্ড আবিষ্কৃত হয়েছে। ৯টি কূপ খনন করা হয়েছে, যেগুলোর দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে ১৯০ মিলিয়ন ঘনফুট। চাহিদা না থাকায় কমবেশি ৭০ মিলিয়ন ঘনফুট উত্তোলন করা হচ্ছে। পাশাপাশি আরও ১৫টি কূপ খননের লক্ষ্যে কাজ করছে পেট্রোবাংলা। পাইপলাইন বাস্তবায়ন ও প্রস্তাবিত কূপগুলো খনন শেষ করলে সেখান থেকে ৩০০ থেকে ৪০০ মিলিয়ন উৎপাদন বাড়ানো সম্ভব মনে করছে বাপেক্স।
ভোলার উদ্বৃত্ত গ্যাস আনতে পাইপলাইন স্থাপনের বিষয়ে কয়েক দশক ধরেই আলোচনা চলে আসছে। ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইনের পরিকল্পনা থাকলেও রুট পরিবর্তন করে ভোলা-বরিশাল-ঢাকা করা হয়েছে। ভোলা-বরিশাল পাইপলাইনের সম্ভাব্যতা যাচাই শেষ হয়েছে, বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইনের সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলমান রয়েছে। বলা যায়, অর্থায়ন ইস্যু নিয়েই বিষয়টি এতদিন ঝুলে রয়েছে।