ক্যালেন্ডার অনুযায়ী বাংলাদেশে আমের মূল মৌসুম শেষ হয় সাধারণত আগস্টে। কিন্তু চাঁপাইনবাবগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এখনো পাওয়া যাচ্ছে সোনালি রঙের কাটিমন আম।
দুই-তিন বছর আগে এই আম প্রতি কেজি ৩০০-৪০০ টাকা দরে বিক্রি হলেও এ বছর দাম ১৫০-১৮০ টাকা, যা আমদানিকৃত যেকোনো রসালো ফলের মূল্যের প্রায় অর্ধেক।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ১১টায় চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার কানসাট বাজারে গিয়ে দেখা যায়, শত শত ভ্যান আম নিয়ে বসে আছেন কৃষক ও স্থানীয় মৌসুমি ব্যবসায়ীরা। শ্রমিকরা সেই আম আড়তে নিয়ে যাওয়ার কাজে ব্যস্ত। স্থানীয় আড়তদারের গুদামে যাওয়ার পর সেই আম বাছাই করে পাঠানো হচ্ছে ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন জেলায়।
অসময়ে আমের চাহিদা থাকায় কৃষকদের খুব বেশি অপেক্ষা করতে হচ্ছে না। দৃশ্যটি দেখলে মনে হবে—যেন এখনো আমের মূল মৌসুমই চলছে।
কানসাট বাজারের চায়ের দোকানদার রফিকুল ইসলাম দ্য ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘গত কয়েক বছর আগেও কানসাট বাজারে এই সময় কোনো আম বিক্রি হতো না। এখন শত শত ভ্যান পাকা আম বাজারে আসছে প্রতিদিন। আগে এমন দৃশ্য কখনো কেউ কল্পনাও করতে পারেনি।’
গত ১৯ সেপ্টেম্বর কানসাট বাজারে ৭ থেকে সাড়ে ৭ হাজার টাকা মণ দরে বারোমাসি কাটিমন আম বিক্রি হয়েছে। ব্যানানা ম্যাঙ্গো বিক্রি হয়েছে মণপ্রতি ১৭-১৮ হাজার টাকা এবং আশ্বিনা ৫ থেকে ৬ হাজার টাকা। আরও এক সপ্তাহ আগে ক্ষীরশাপাতি আম বিক্রি হয়েছে প্রায় ২৮ থেকে ৩০ হাজার টাকা মণ। এছাড়া বারি-১১ আম বিক্রি হয়েছে প্রতি মণ ৮-১০ হাজার টাকায়।
স্থানীয় কৃষক ও ব্যবসায়ীরা বলছেন, মূল মৌসুমে এসব আম বিক্রি হয়েছে ১ হাজার ২০০ থেকে শুরু করে ৩ হাজার টাকা মণ দরে। এখন বিক্রিতে দাম প্রায় তিন থেকে ১০ গুণ পর্যন্ত বেশি পাওয়া যাচ্ছে।
ক্ষীরশাপাতি, ব্যানানা ও আশ্বিনা আমের মৌসুম আরও দুই-আড়াই মাস আগেই শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু কৃষকরা ভিন্ন পদ্ধতি প্রয়োগ করে সেই আম এখনো ফলাচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষক ও কৃষিবিদরা।
চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নয়ন মিয়া গত ২০ সেপ্টেম্বর ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘বর্তমানে কানসাট বাজারে প্রতিদিন ৪৫০ থেকে ৫০০ টন কাটিমন আম বিক্রি হচ্ছে, যার গড় বাজার মূল্য ৬-৭ কোটি টাকা। এই অবস্থা আগামী আরও একমাস থাকবে। তারপরে কাটিমন আমের সরবরাহ কমে আসবে। তবে এখন সারা বছরই বাজারে কাটিমন আম পাওয়া যায়।’
নওগাঁর সাপাহার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. মনিরুজ্জামান জানান, বর্তমানে প্রতিদিন সাপাহার বাজারে ৫০-৬০ মণ আম বিক্রি হচ্ছে।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রেসিডেন্ট এবং বাংলাদেশ ম্যাঙ্গো প্রোডিউসার্স মার্চেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আব্দুল ওয়াহেদ ডেইলি স্টারকে বলেন, আমের মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জে ৪ থেকে ৫ হাজার কোটি টাকার আম বিক্রি হয়। মৌসুমের বাইরে গত কয়েক বছর ধরেই বার্ষিক ৩০০-৪০০ কোটি টাকার কাটিমন আম বিক্রি হচ্ছে।
‘প্রতিবছর আমের মূল মৌসুমের বাইরে, মানে অফ-সিজনে ফলন ১০-১৫ শতাংশ বাড়ছে। চলতি বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ৫০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার আম বিক্রি হবে বলে আমরা আশা করছি’, বলেন তিনি।
যেভাবে বিপ্লব ঘটাচ্ছেন কৃষকরা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্যমতে, ২০১৪ সালে রাজশাহী, নাটোর, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় কাটিমন আমের চাষ হয়েছিল ১ হেক্টরেরও কম জমিতে। কিন্তু ২০২৫-২৬ মৌসুমে এই চার জেলায় কাটিমন আমের চাষ হয়েছে মোট ৪ হাজার ৭৫৭ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে শুধু চাঁপাইনবাবগঞ্জেই ৪ হাজার ৪৬২ হেক্টর জমিতে চাষ হয়েছে।
বাংলাদেশে কাটিমন আমের যাত্রা শুরু ২০১৪ সালে বছরব্যাপী ফল উৎপাদন ও পুষ্টি উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে। এই প্রকল্পের পরিচালক ছিলেন মেহেদী মাসুদ। বর্তমানে তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের টিস্যু কালচার ল্যাবরেটরি কাম হর্টিকালচার সেন্টার স্থাপন ও উন্নয়ন প্রকল্পের পরামর্শক হিসেবে কাজ করছেন।
মেহেদী মাসুদ ডেইলি স্টারকে বলেন, কাটিমন থাইল্যান্ডের একটি বারোমাসি জাত। ২০১৪ সালে দুই হাজার গাছের চারা হর্টিকালচার সেন্টারের মাধ্যমে সারাদেশে বিতরণ করা হয়েছিল। ওই সময় শিবগঞ্জে গিয়ে আমরা কৃষকদের শিখিয়েছিলাম কীভাবে সারা বছর গাছে আম ফলাতে হয়।
‘ওই সময় অনেকে সমালোচনা করে বলেছিলেন যে, এই গাছে কোনো আম হবে না, গাছ কেটে ফেলতে হবে। কিন্তু সেই কাটিমন আম এখন সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে’, যোগ করেন তিনি।
মেহেদী মাসুদ আরও বলেন, এই জাত সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন কৃষকরা। তারাই সত্যিকারের রূপকার। বর্তমানে কৃষকরা টপ ওয়ার্কিংয়ের (গ্রাফটিং) মাধ্যমে একটি গাছে ৫-৬টি সায়নের পরিবর্তে ৫০০ থেকে এক হাজার সায়ন লাগাচ্ছে। ফলে এখন দেশের মানুষ সারাবছর এই আম খেতে পারছেন। এই কৃতিত্ব কৃষকদেরই।
গত ১৯ সেপ্টেম্বর শিবগঞ্জ উপজেলার কয়েকটি বড় আম বাগানে গিয়ে দেখা যায়, অনেক গাছজুড়ে আছে বারোমাসি কাটিমন আম। কিছু গাছে দেখা গেছে ব্যানানা ম্যাঙ্গো, কিছু গাছে আশ্বিনা, আর কিছু গাছে অল্প পরিমাণে লক্ষ্মণভোগ আম।
এছাড়া গুটি, ফজলি, আশ্বিনা, লক্ষ্মণভোগ আমের বড় বড় বাগানে গ্রাফটিং করে কাটিমন আমের সায়ন লাগাচ্ছেন কৃষকরা।
কানসাট বাজারের কৃষক হাসান আলী ১২ বিঘা জমিতে আম চাষ করেছেন। বাগানটিতে বর্তমানে অর্ধেক কাটিমন আম দেখা যায়।
জানতে চাইলে হাসান আলী ডেইলি স্টারকে বলেন, ‘ফজলি, আশ্বিনা ও গুটি আমে এখন আর লাভ হয় না। সেই কারণে এসব গাছে কাটিমনের সায়ন লাগানো হয়েছে। এতে করে দাম একটু ভালো পাওয়া যাচ্ছে। কৃষকরাও লাভবান হচ্ছি।’
সেপ্টেম্বরে কানসাট বাজারে শুধু কাটিমন নয়, পাওয়া গেছে আশ্বিনা, লক্ষ্মণভোগ, ক্ষীরশাপাতি, বারি-১১ ও ব্যানানা জাতের আম, যদিও দেড়-দুই মাস আগে এগুলোর মৌসুম শেষ হয়ে গেছে।
অসময়ে কীভাবে এসব আম পাওয়া যাচ্ছে, জানতে চাইলে শিবগঞ্জ উপজেলার মোবারকপুর এলাকার কৃষক মো. আব্দুর রাকিব ডেইলি স্টারকে বলেন, আমরা যদি ক্ষীরশাপাতির গাছে কাটিমন জাতের সায়ন লাগাই এবং কাটিমানের পরিচর্যা করি, তাহলে মাতৃগাছ ও কলম করা শাখাতে একইসঙ্গে মুকুল আসে। ফলে কাটিমন ও ক্ষীরশাপাতি উভয় জাতের আমের মিশ্র ফলন পাওয়া যায়, যা আমাদের মুনাফা বাড়িয়েছে।
শিবগঞ্জ উপজেলার দড়িচক বিল এলাকার কৃষক হাশেম আলী বলেন, মূল মৌসুমের সময় ব্যানানা আম গাছে প্রথম যে ফুল আসে, সেই ফুল আমরা ভেঙে ফেলে দিই। এরপরে পরিচর্যা করলে দুইমাস পরে আবার একই গাছে ফুল আসে। এভাবে আমরা অফ-সিজনে ব্যানানা আম পাচ্ছি।
একই কথা বলেন চাঁপাইনবাবগঞ্জের আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের (আম গবেষণা কেন্দ্র নামে পরিচিত) মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শরফ উদ্দিন।
ডেইলি স্টারকে তিনি বলেন, বর্তমানে আম নিয়ে চাষিদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়েছে। তারা আমের মুকুল ভাঙছে, বেশি বেশি পরিচর্যা করছে এবং ফুল আসার আগে এক ধরনের হরমোন প্রয়োগ করছে। এর ফলে তাদের কিছু সফলতাও আছে। আমরা দেখছি বর্তমানে বাজারে কেউ লক্ষ্মণভোগ, কেউ ক্ষীরশাপাতি, কেউ কল্যাণভোগ নিয়ে আসছে।
‘তবে কৃষকদেরকে আমরা পরামর্শ দেবো, সবাই যেন এই কাজ না করে। একই কাজ করে সবাই যে সফল হবে, তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। অনেক সময় মৌসুমে গাছের মুকুল ভেঙে দিলে পরে সেই গাছে আর ফুল নাও আসতে পারে। তবে যেসব আম জেনিটিক্যালি দেরিতে আসে, সেসব গাছে কৃষক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।’
ভবিষ্যতে নাবি জাতের যেসব আম বাজারে আসবে
আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যে বাজারে আরও চারটি লেট ভ্যারাইটি বা নাবি জাতের আম আসতে পারে বলে জানিয়েছেন কৃষিবিদ ও গবেষকরা।
এর মধ্যে আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্র দুইটি জাত নিয়ে কাজ করছে। বাকি দুইটি নিয়ে কাজ করছে চাঁপাইনবাবগঞ্জের হর্টিকালচার সেন্টার।
আঞ্চলিক উদ্যানতত্ত্ব গবেষণা কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. শরফ উদ্দিন বলেন, আমরা হাইব্রিড জাতের বারি আম-১৯ নিয়ে দীর্ঘদিন কাজ করেছি। বর্তমানে এই জাত অবমুক্তির পর্যায়ে আছে। এই আম বারি আম-৩ ও বারি আম-৪ থেকে উদ্ভাবন করা হয়েছে। এর আকার ভালো। এটি খেতে বেশ মিষ্টি। এর বোঁটা অনেক শক্ত। ফলে ঝড়-তুফানে ক্ষতির পরিমাণও কম হবে। ফলে আমের এই জাতের বাণিজ্যিকভাবে সফল হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। সাধারণত এই আম বাজারে আসবে জুলাইয়ে ১৫ তারিখ থেকে আগস্টের মাঝামাঝি সময়ে।
‘এছাড়া আমরা আরও একটি ভালো হাইব্রিড জাত পেয়েছি, যেটা হয়তো বারি আম-২০ হিসেবে বাজারে আসতে পারে। এই জাতটি আম্রপালি ও ল্যাংড়া জাতের আম থেকে উদ্ভাবন করা হয়েছে। এই আমের প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো দেখতে ও খেতে অবিকল ল্যাংড়া আমের মতো। এই আমটি আগস্ট ও সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি পর্যন্ত বাজারে থাকবে। এছাড়া এই আমও খেতে বেশ মিষ্টি। এটি চাষে কৃষকরা লাভবান হবে।’
আগামী এক বছরে বারি আম-১৯ ও বারী আম-২০ অবমুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানান এই গবেষক।
শরফ উদ্দিন আরও বলেন, ‘এছাড়া আমরা বারোমাসি আরও কিছু জাতের সন্ধান পেয়েছি। অনেক উদ্যোক্তারা ব্যক্তিগতভাবে এসব আম নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। সেগুলো ভবিষ্যতে বাজারে এলে বাংলাদেশের মানুষ সারাবছর ভালো জাতের আম খেতে পারবেন।’
অন্যদিকে চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, তারাও দুইটি লেট ভ্যারাইটির সন্ধান পেয়েছেন। জাত দুইটি ভারতে কাননভোগ ও লেট আম্রপালি নামে পরিচিত।
হর্টিকালচার সেন্টারের উপ-পরিচালক মো. খালেদুর রহমান বলেন, চাষিরা লাভবান হওয়ার জন্য বিশেষভাবে নাবি জাত বা লেট ভ্যারাইটির দিকে ঝুঁকে পড়ছেন। আমরাও দুটি নাবি জাতের আমের চারা নিয়ে কাজ করছি। আমরা আগামী দুই-তিন বছর এই গাছটিকে পর্যবেক্ষণ করব। যদি এলাকার মাটি ও আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খায়, তাহলে আগামীতে আমরা এই জাত দুটিকে প্রোমোট করব।
সূত্র: দ্য ডেইলি স্টার