শিরোনাম
◈ এলপিজির কৃত্রিম সংকট হলে ব্যবস্থা, ডিসিদের জ্বালানিমন্ত্রীর নির্দেশ ◈ নিউইয়র্ক সফরের সাফল্য আড়ালে ‘পরিকল্পিত ঘটনা’: অভিযোগ প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিবের ◈ জাতিসংঘে জাইমা রহমানের নিয়োগে সরকারের ন্যূনতম সম্পৃক্ততা নেই: মাহদী আমিন ◈ ফার্নেস অয়েলের দাম বাড়ল লিটারে প্রায় ১২ টাকা, রাত থেকেই কার্যকর ◈ প্রবীণদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করবে সরকার : প্রধানমন্ত্রী ◈ সীমান্তের দুই মুখ : এপার থেকে মানুষ পাচারের ফাঁদ, ওপার থেকে ঢুকছে মাদক ◈ সালমান মুক্তাদিরের স্টুডিওতে হামলা: অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল গ্রেপ্তার ◈ চাকরি ও দক্ষ কর্মীর খোঁজ মিলবে এক জায়গায়, উদ্যোগ সরকারের ◈ মিরপুরে উচ্ছেদ অভিযানে সমন্বয়ের ঘাটতি, তদন্তের নির্দেশ: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ◈ ৫০৭ কোটি টাকা বিদ্যুৎ বিল আসা গ্রাহককে মন্ত্রীর দুঃখ প্রকাশ, জিএম বরখাস্ত

প্রকাশিত : ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৪৬ বিকাল
আপডেট : ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬, ০৭:৫৯ বিকাল

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

বায়ু থেকে ২৯ কোটি ৮২ লাখ ইউনিট বিদ্যুৎ : জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় কক্সবাজারের বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র নতুন সম্ভাবনা

সরওয়ার আজম মানিক, কক্সবাজার : উপকূলীয় এলাকার সামুদ্রিক বাতাসকে কাজে লাগিয়ে দেশের প্রথম বৃহৎ বাণিজ্যিক বায়ু বিদ্যুৎ প্রকল্প থেকেজাতীয় গ্রিডে প্রায় ২৯ কোটি ৮২ লাখ কিলোওয়াট-ঘণ্টা বিদ্যুৎ সরবরাহ । কক্সবাজারের বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র টিনবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবেলায় এ কেন্দ্রটি নতুন সম্ভাবনা দেখাচ্ছে। পুরো উপকূলকে কাজে লাগাতে পারলে ৩০ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।

কক্সবাজার সদর উপজেলার খুরুশকুল, পিএমখালী, পোকখালী ও চৌফলদণ্ডী ইউনিয়নের উপকূলীয় এলাকায় স্থাপিত ২২টি বায়ু টারবাইন নিয়ে গড়ে ওঠা ৬০ মেগাওয়াট ক্ষমতার এই কেন্দ্র থেকে এ পর্যন্ত জাতীয় গ্রিডে নিয়মিত বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।

প্রকল্পসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৫ মে কেন্দ্রটি জাতীয় গ্রিডের সঙ্গে যুক্ত হয়। এরপর পরীক্ষামূলকভাবে বিদ্যুৎ সরবরাহের কার্যক্রম চলে। ২০২৪ সালের ৮ মার্চ কেন্দ্রটির বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু হয়।

প্রকল্প সমন্বয়কারী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপক এনামুল হক জানান,প্রকল্পের ২২টি টারবাইনের প্রতিটির উৎপাদন ক্ষমতা ৩ মেগাওয়াট। খুরুশকুলে ৮ টি, পিএমখালীতে ২ টি, চৌফলদণ্ডীতে ৭ টি এবং পোকখালীতে ৫ টি টারবাইন স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিটি টারবাইনের জন্য প্রায় ২০ শতক জমি ব্যবহার করা হয়েছে। চীনে তৈরি টারবাইনগুলোর টাওয়ারের উচ্চতা প্রায় ৯০ মিটার এবং প্রতিটি ব্লেডের দৈর্ঘ্য প্রায় ৬০ মিটার।

advertisement

 কক্সবাজার বিদ্যুৎ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আব্দুল কাদের গনি জানান, বাতাসের গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে তিন মিটারের বেশি হলে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়। সর্বোচ্চ উৎপাদনে যেতে বাতাসের গতিবেগ প্রতি সেকেন্ডে নয় মিটারের বেশি প্রয়োজন। বাতাসের গতিবেগের ওপর নির্ভর করে কেন্দ্রটি থেকে ১৫ মেগাওয়াট থেকে সর্বোচ্চ ৬০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা সম্ভব।

কমছে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা

বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবচেয়ে বড় পরিবেশগত সুবিধা হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনে কয়লা, ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, এলএনজি বা প্রাকৃতিক গ্যাস পোড়াতে হয় না। ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে সরাসরি জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কার্বন নিঃসরণ তৈরি হয় না।

প্রকল্প ব্যবস্থাপক এনামুল হক বলেন,এই প্রকল্পের পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী বছরে প্রায় ১ লাখ ৯ হাজার ২০০ টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনা রয়েছে । একই হিসাবে বছরে প্রায় ৪৪ হাজার ৬০০ টন কয়লার ব্যবহার এড়ানো সম্ভব।

এনামুল হকের মতে কক্সবাজারের উপকূলে বয়ে যাওয়া প্রাকৃতিক বাতাসকে কাজে লাগিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প একটি উৎস হিসেবে যুক্ত হচ্ছে। এতে একদিকে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হচ্ছে, অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণ কমানোর সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে।

জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে উপকূল, সেখানেই নবায়নযোগ্য জ্বালানি

জলবায়ু বিশেষজ্ঞ এস এম তাসলিম রেজা বলেন,সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, লবণাক্ততা ও উপকূলীয় ভাঙনের মতো ঝুঁকিতে থাকা কক্সবাজারে নবায়নযোগ্য জ্বালানির এই প্রকল্পের আলাদা গুরুত্ব রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূলীয় মানুষের জীবন-জীবিকা যখন ক্রমেই ঝুঁকির মুখে পড়ছে, তখন জীবাশ্ম জ্বালানির পরিবর্তে বাতাস ও সূর্যের মতো নবায়নযোগ্য উৎসকে কাজে লাগানো জলবায়ু সহনশীল উন্নয়নের অংশ হতে পারে।

এ বিশেষজ্ঞদের মতে, বায়ু বিদ্যুৎ একদিকে বিদ্যুৎ উৎপাদনে কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করতে পারে, অন্যদিকে আমদানি করা জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি নিরাপত্তা বাড়াতে পারে। কক্সবাজারের উপকূলীয় অঞ্চলে বায়ু প্রবাহের সম্ভাবনা কাজে লাগিয়ে এ ধরনের আরও প্রকল্প নেওয়া গেলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির অংশ বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।

নবায়নযোগ্য জ্বালানি বিশেষজ্ঞ এস এম দেলওয়ার হোসাইন বলছেন, বাংলাদেশের ২০ হাজার কিলোমিটারের মতো উপকূল এলাকা আছে। সেখানে ৩০ হাজার মেগাওয়াটের মতো বায়ুবিদ্যুৎ উৎপাদন করার সম্ভাবনা রয়েছে। সরকার চাইলে এ সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে আরো প্রকল্প গ্রহণ করতে পারে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশে জীবাশ্ম জ্বালানির ব্যবহার কমিয়ে একটি পরিকল্পিত ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তরের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। কারণ একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন শুধু বিদ্যুতের চাহিদা পূরণের ওপর নির্ভর করে না; পরিবেশ সুরক্ষা, জনস্বাস্থ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের অধিকারও এর সঙ্গে জড়িত।

‎‎দেলওয়ার হোসাইন আরও বলেন, সূর্য, বাতাস, পানি ও বায়োমাসের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকৃতির নিজস্ব শক্তির উৎস, যা পুনরায় ব্যবহারযোগ্য এবং জীবাশ্ম জ্বালানির তুলনায় কার্বন নিঃসরণ অনেক কমাতে পারে। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো দেশে সৌরবিদ্যুতের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। বাড়ির ছাদ, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, সরকারি ভবন, চরাঞ্চল ও অনাবাদি জমিতে পরিকল্পিতভাবে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সুযোগ রয়েছে।

পরিবেশ রক্ষায় ভবিষ্যতের করণীয়

পরিবেশবাদীর সংগঠন ধরিত্রী রক্ষায় আমরা ধরা এর কক্সবাজার জেলা শাখার সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, শুধু বায়ু বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করলেই জলবায়ু ও পরিবেশ সুরক্ষা নিশ্চিত হবে না। উপকূলীয় এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়ে টারবাইনের আশপাশের জীববৈচিত্র্য, পাখির চলাচল, মাটি, পানি ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর প্রভাব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাসের মতো দুর্যোগে টারবাইন ও অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জলবায়ু সহনশীল রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।

প্রকল্প সমন্বয়কারী কর্মকর্তা ও ব্যবস্থাপক এনামুল হক বলেন, “বর্তমান প্রেক্ষাপটে এবং চলমান জ্বালানি সংকটে ভবিষ্যতের চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় নবায়নযোগ্য জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিনিয়োগকারীদের মূলধন ফেরতের নিশ্চয়তা রেখে জ্বালানি নীতিমালা করা প্রয়োজন। পরিবেশবান্ধব নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্পের অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা হলে দেশে বৈদেশিক বিনিয়োগ বাড়বে। এর পাশাপাশি কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও জ্বালানি সংকট মোকাবিলায়ও ভূমিকা রাখা সম্ভব।”

তিনি বলেন, প্রায় ১২০ মিলিয়ন মার্কিন ডলার ব্যয় করে গড়ে তোলা “আমাদের প্রকল্পে ডিজেল, পেট্রোল, এলএনজি বা প্রাকৃতিক গ্যাসের প্রয়োজন হয় না। প্রাকৃতিক বাতাস প্রবাহিত থাকলে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করে জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করা যায়। বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সংকট ও জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তবতায় ভবিষ্যতে বায়ু ও সৌরবিদ্যুতের মতো নবায়নযোগ্য জ্বালানির গুরুত্ব আরও বাড়বে।”

কক্সবাজারের উপকূলীয় বাতাসকে বিদ্যুতে রূপান্তরের এই উদ্যোগ শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকল্প নয়,দীর্ঘমেয়াদে জীবাশ্ম জ্বালানির বিকল্প তৈরি, কার্বন নিঃসরণ কমানো, বৈদেশিক জ্বালানি আমদানির ওপর নির্ভরতা কমানো এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোর একটি সম্ভাবনাময় দৃষ্টান্তও হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

  • সর্বশেষ