এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার: মাত্র ২৩৫ ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার। অথচ বিলের পরিশোধযোগ্য অর্থের ঘরে লেখা—৫০৬ কোটি ৮০ লাখ ১১ হাজার ৯৫৯ টাকা! মাগুরার শালিখা উপজেলার আড়পাড়া জোনাল অফিসের এমন অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিল নিয়ে শুধু চাঞ্চল্যই নয়, প্রশ্ন উঠেছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বিল তৈরির প্রক্রিয়া ও তদারকি ব্যবস্থা নিয়েও।
মাগুরা সদর উপজেলার কেচুয়াডুবি গ্রামের বাসিন্দা মোছা. আলেয়া খাতুনের নামে সেপ্টেম্বর মাসের বিদ্যুৎ বিলে এই অস্বাভাবিক অঙ্ক দেখা যায়। বিলে বিদ্যুৎ ব্যবহারের পরিমাণ দেখানো হয়েছে ২৩৫ ইউনিট। অথচ একই বিলে পরিশোধযোগ্য অর্থ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে ৫০৬ কোটি ৮০ লাখ ১১ হাজার ৯৫৯ টাকা।
একজন সাধারণ গ্রাহকের হাতে এমন একটি বিল কীভাবে পৌঁছাল—এ প্রশ্নই এখন সামনে এসেছে। কারণ, বিদ্যুৎ ব্যবহারের ইউনিট এবং বিলের অঙ্কের মধ্যে ছিল বিশাল অসামঞ্জস্য। এত বড় অঙ্কের বিল তৈরির পরও সেটি গ্রাহকের কাছে যাওয়ার আগে কোনো পর্যায়ে তা শনাক্ত হয়নি।
অস্বাভাবিক বিল হাতে পাওয়ার পর বিষয়টি নিয়ে এলাকায় আলোচনা শুরু হলে মঙ্গলবার (২৯ সেপ্টেম্বর) আলেয়া খাতুন আড়পাড়া জোনাল কার্যালয়ে অভিযোগ করেন। এরপর পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির কর্মকর্তারা বিলটি যাচাই করে ভুল শনাক্ত করেন এবং সংশোধন করেন। সংশোধিত বিলে তার প্রকৃত পরিশোধযোগ্য অর্থ নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৯৩৮ টাকা। পরে ওই অর্থই পরিশোধ করেন তিনি।
একটি টাইপিং ভুল, নাকি যাচাই ব্যবস্থার ব্যর্থতা?
মাগুরা পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির জেনারেল ম্যানেজার (জিএম) মহিতুল ইসলাম জানিয়েছেন, কয়েকদিন আগে ওই গ্রাহকের মিটার পরিবর্তন করা হয়েছিল। বিল প্রস্তুতের সময় ডিমান্ড চার্জের ঘরে নতুন মিটারের সিল নম্বর বসে যাওয়ার কারণে অস্বাভাবিক বিলটি তৈরি হয়। তার ভাষ্য অনুযায়ী, কম্পিউটার টাইপিংয়ের ভুলেই এ ঘটনা ঘটেছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—কম্পিউটারে একটি ভুল ইনপুট দেওয়ার পরও সেটি বিল তৈরির পরবর্তী ধাপে ধরা পড়ল না কেন? ২৩৫ ইউনিটের বিপরীতে ৫০৬ কোটি টাকার বিলের মতো অস্বাভাবিক তথ্য কোনো স্বয়ংক্রিয় যাচাই বা দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নজরে আসার কথা কি না—এ নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
বিশেষ করে, বিলের ব্যবহৃত ইউনিট ও পরিশোধযোগ্য অর্থের মধ্যে এত বড় ব্যবধান থাকার পরও যদি সেটি যাচাই ছাড়াই গ্রাহকের কাছে চলে যায়, তাহলে বিলিং প্রক্রিয়ার তদারকি কতটা কার্যকর—এ প্রশ্ন এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই।
দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগে ৪ জনকে শোকজ
ঘটনাটিকে শুধু ‘কম্পিউটার টাইপিংয়ের ভুল’ হিসেবে শেষ না করে সংশ্লিষ্টদের দায়িত্বের বিষয়টিও খতিয়ে দেখছে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি। দায়িত্ব পালনে সতর্কতার ঘাটতির অভিযোগে আড়পাড়া জোনাল অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার (ডিজিএম) মো. রেজাউল করিম, বিলিং সুপারভাইজার সীমা রানী, বিলিং সহকারী সুমা রানী ঘোষ এবং মিটার রিডার কাম ম্যাসেঞ্জার তোরাব আলীকে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
নোটিশপ্রাপ্তদের আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে জবাব দিতে বলা হয়েছে।
এতে স্পষ্ট হচ্ছে, পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি ঘটনাটিকে দায়িত্ব পালনের ঘাটতি হিসেবেও দেখছে। তবে শোকজের জবাব ও পরবর্তী তদন্তে কার কী ধরনের দায়িত্বে ত্রুটি ছিল, তা আরও স্পষ্ট হবে।
গ্রাহকের হাতে বিল যাওয়ার আগে যাচাই কতটা কার্যকর?
বিদ্যুৎ বিল একটি নিয়মিত আর্থিক নথি। সাধারণত মিটার রিডিং, ইউনিট ব্যবহার, বিভিন্ন চার্জ ও মোট বিলের অঙ্কের সমন্বয়ের ভিত্তিতেই এটি তৈরি হয়। ফলে ব্যবহারের পরিমাণের সঙ্গে বিলের অঙ্কে অস্বাভাবিক পার্থক্য থাকলে তা শনাক্ত করার জন্য কার্যকর যাচাই ব্যবস্থা থাকা জরুরি।
মাগুরার এ ঘটনায় স্থানীয়দের প্রশ্ন, ২৩৫ ইউনিটের বিপরীতে ৫০৬ কোটি টাকার বিল তৈরির মতো বড় অসঙ্গতি যদি গ্রাহকের অভিযোগের পর ধরা পড়ে, তাহলে বিলটি প্রস্তুত ও অনুমোদনের আগের ধাপগুলোতে কী ধরনের যাচাই হয়েছিল?
তবে পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনাটি কোনো অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যবহার বা প্রকৃত আর্থিক দায় নয়; কম্পিউটার টাইপিংয়ের ভুলের কারণে তৈরি হওয়া একটি অস্বাভাবিক বিল। অভিযোগ পাওয়ার পর সেটি সংশোধনও করা হয়েছে।
আস্থা ফেরাতে দরকার জবাবদিহি
ভুলটি সংশোধন করে গ্রাহকের প্রকৃত বিল নির্ধারণ করা হলেও এ ঘটনা বিদ্যুৎ বিল প্রস্তুত ব্যবস্থার ওপর গ্রাহকদের আস্থার প্রশ্ন সামনে এনেছে। বিশেষ করে একজন গ্রাহকের নামে শত শত কোটি টাকার বিল তৈরি হওয়ার পর সেটি গ্রাহকের হাতে পৌঁছে যাওয়া দেখিয়ে দিয়েছে—ডিজিটাল বিলিং ব্যবস্থায় শুধু তথ্য ইনপুটই নয়, পরবর্তী যাচাই ও তদারকিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
স্থানীয় গ্রাহকদের প্রত্যাশা, শোকজের জবাব ও তদন্তের মাধ্যমে ভুলটির সুনির্দিষ্ট কারণ চিহ্নিত করা হবে এবং ভবিষ্যতে এমন অস্বাভাবিক বিল গ্রাহকের হাতে পৌঁছানোর আগেই শনাক্ত করার ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা হবে।
কারণ, ২৩৫ ইউনিটের বিল ৫০৬ কোটি টাকা হওয়া শুধু একটি সংখ্যাগত ভুল নয়—এটি বিল তৈরির প্রতিটি ধাপে যাচাই ও জবাবদিহির প্রয়োজনীয়তাকেও সামনে এনেছে।