শিরোনাম
◈ কুমিল্লায় মহাসড়কে ৫ কিলোমিটার যানজট, ভোগান্তিতে যাত্রীরা ◈ সাঁড়াশি অভিযানেও অধরা ডেভিড ইমন, কোথায় আছেন তিনি? ◈ ভারত এবার ইংল্যান্ডের কা‌ছে ওয়ানডে সি‌রিজ হার‌লো  ◈ অস্ট্রেলিয়া সিরিজের আগে দুশ্চিন্তা বাড়‌লো বাংলা‌দেশ শি‌বি‌রে, লিটনের পর এখন অনিশ্চিত তারকা পেসার না‌হিদ ◈ মাত্র ১০ ডলারের চশমায় বদলে যাচ্ছে বাংলাদেশের পোশাকশিল্প ◈ তীব্র তাপদাহে বাংলাদেশের মানুষের দ্বিমুখী সংকট: কমছে আয়, বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয় ◈ মেসি নন, বিশ্বকাপের গোল্ডেন বল রদ্রির হাতে ◈ বিশ্বকাপ ফুটবল: আর্জেন্টিনাকে কাঁদিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন স্পেন ◈ কাজের আশ্বাস, শেষে ডান্স ক্লাব ও যৌ.ন শোষণের ফাঁদ ◈ পেরুতে ৫.৫ মাত্রার শক্তিশালী ভূমিকম্প, নিহত ৫

প্রকাশিত : ১৯ জুলাই, ২০২৬, ০৮:২৮ রাত
আপডেট : ২০ জুলাই, ২০২৬, ১১:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

মাদকের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক যুদ্ধ : ডিএনসির হাতে অস্ত্র, আসছে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল

এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, সিনিয়র স্টাফ রিপোর্টার : দেশে মাদকের বিস্তার এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার সমস্যা নয়, এটি জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। সরকারি ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত। একই সঙ্গে অনলাইন জুয়ার সঙ্গে সম্পৃক্ত রয়েছে আরও প্রায় ৫০ লাখ মানুষ। তরুণ সমাজের একটি বড় অংশ সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদকের ভয়াবহ জালে আটকে পড়ায় উদ্বেগ বাড়ছে নীতিনির্ধারকদের মধ্যে।

এ পরিস্থিতিতে মাদক কারবারিদের আন্তর্জাতিক ও দেশীয় নেটওয়ার্ক গুঁড়িয়ে দিতে নজিরবিহীন কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। আইন সংশোধন, দ্রুত বিচার, সশস্ত্র অভিযান, ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলককরণ এবং পুনর্বাসন কার্যক্রম—সব মিলিয়ে একটি সমন্বিত কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।দেশে ৮২ লাখ মাদকাসক্ত, অনলাইন জুয়ার ফাঁদে আরও ৫০ লাখ মানুষ      মাদকের ভয়াবহ ছোবল থেকে দেশের তরুণ প্রজন্মকে রক্ষা এবং মাদক কারবারিদের আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে নজিরবিহীন কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। দেশে বর্তমানে প্রায় ৮২ লাখ মানুষ বিভিন্ন ধরনের মাদকে আসক্ত বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। এর বড় একটি অংশ সিনথেটিক ও সেমি-সিনথেটিক মাদকের মরণফাঁদে আটকে রয়েছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার কেবল অভিযাননির্ভর পদক্ষেপে সীমাবদ্ধ না থেকে আইনি কাঠামো, বিচার প্রক্রিয়া এবং মাঠপর্যায়ের অভিযানিক সক্ষমতায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনছে। এর অংশ হিসেবে প্রথমবারের মতো মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) কর্মকর্তাদের হাতে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র তুলে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন এবং মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, দীর্ঘদিন ধরে ডিএনসির সদস্যরা নিরস্ত্র অবস্থায় ঝুঁকিপূর্ণ অভিযান পরিচালনা করে আসছিলেন। ফলে সশস্ত্র মাদক কারবারিদের হামলার মুখে তাদের নিরাপত্তা ছিল চরম ঝুঁকিপূর্ণ। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, মাদকবিরোধী অভিযানে গত কয়েক বছরে ডিএনসির অন্তত ১২৫ জন সদস্য আহত হয়েছেন এবং দুজন সদস্য প্রাণ হারিয়েছেন।

সম্প্রতি রাজধানীর সায়দাবাদ এলাকায় অভিযানে গিয়ে পরিদর্শক সিদ্দিকুর রহমান গুলিবিদ্ধ হওয়ার ঘটনায় বিষয়টি নতুন করে গুরুত্ব পায়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ডিএনসি কর্মকর্তাদের জন্য ৯ এমএম আধা-স্বয়ংক্রিয় পিস্তল ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ইতোমধ্যে রাজশাহীর সারদা পুলিশ একাডেমিতে ৩৫ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণের মাধ্যমে ২৬০ জন কর্মকর্তাকে অস্ত্র ব্যবহারে দক্ষ করে তোলা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ২৭৫টি পিস্তল কেনার প্রক্রিয়াও সম্পন্ন হয়েছে।

তবে অস্ত্র ব্যবহারের ক্ষেত্রে কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন করা হয়েছে। নীতিমালায় বলা হয়েছে, আগ্নেয়াস্ত্র হবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের সর্বশেষ উপায়। প্রথমে লাঠিচার্জ বা ন্যূনতম বলপ্রয়োগ, পরে সতর্কতামূলক ফাঁকা গুলি এবং সবশেষে আত্মরক্ষার্থে প্রয়োজন হলে কোমরের নিচে লক্ষ্য করে গুলি চালানো যাবে। প্রতিটি গুলিবর্ষণের ঘটনার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে জবাবদিহি করতে হবে।

এদিকে বিচারিক দীর্ঘসূত্রতা কাটাতে সরকার বিশেষ মাদক ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে। বর্তমানে শুধু ঢাকাতেই প্রায় ৮০ হাজার মাদকসংক্রান্ত মামলা বিচারাধীন রয়েছে। দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে বিশেষ আদালত গঠনের প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রায় ৩ কোটি ৬১ লাখ ইয়াবা, ২৫০ কেজি হেরোইন, ২২ কেজি কোকেন এবং বিপুল পরিমাণ ফেনসিডিল ও গাঁজা জব্দ করা হয়েছে। একই সময়ে দায়ের হয়েছে ২ লাখ ৭৪ হাজারের বেশি মামলা। কিন্তু বিচার প্রক্রিয়ার ধীরগতির কারণে অনেক ক্ষেত্রে মূল হোতারা শাস্তির বাইরে থেকে যাচ্ছে।

মাদক নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি পুনর্বাসন কার্যক্রমেও গুরুত্ব দিচ্ছে সরকার। দেশের সাতটি বিভাগীয় শহরে ১ হাজার ৪১৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ২০০ শয্যাবিশিষ্ট আধুনিক মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র নির্মাণের কাজ শুরু হয়েছে। পাশাপাশি ৭৩টি বেসরকারি নিরাময় কেন্দ্রকে সরকারি অনুদান দেওয়া হচ্ছে।

মাদক ও জুয়া প্রতিরোধে সরকারের নতুন রোডম্যাপের অংশ হিসেবে সরকারি, আধা-সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে চাকরির ক্ষেত্রে ডোপ টেস্ট বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, ডোপ টেস্টে মাদকাসক্তি শনাক্ত হলে চাকরিপ্রার্থী অযোগ্য বিবেচিত হবেন এবং কর্মরত ব্যক্তির ক্ষেত্রে তা অসদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে।

এছাড়া অনুমোদনবিহীন ‘সিসা লাউঞ্জ’ বন্ধে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় এসব প্রতিষ্ঠানের আড়ালে মাদক সেবন ও বেচাকেনার অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে কঠোর অভিযান ও বিশেষ টাস্কফোর্স গঠনের দাবি উঠেছে।

অন্যদিকে অনলাইন জুয়াও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, দেশে প্রায় ৫০ লাখ মানুষ অনলাইন জুয়ার সঙ্গে জড়িত। সিআইডি ইতোমধ্যে হাজারের বেশি ব্যক্তি ও মোবাইল ব্যাংকিং এজেন্টকে জুয়া লেনদেনের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার প্রমাণ পেয়েছে। সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ অনুযায়ী অনলাইন জুয়া পরিচালনা, প্রচার বা অংশগ্রহণ শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক সমস্যা এখন শুধু আইনশৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি জনস্বাস্থ্য ও জাতীয় নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। তাই অস্ত্রসজ্জিত ডিএনসি, বিশেষ ট্রাইব্যুনাল, কঠোর আইন এবং পুনর্বাসন কার্যক্রমের পাশাপাশি সীমান্তপথে মাদকের প্রবেশ বন্ধ করা গেলে একটি মাদকমুক্ত সমাজ গঠন সম্ভব হবে।

  • সর্বশেষ
  • জনপ্রিয়