শিরোনাম
◈ সৌদি-হুতি সংঘাতে পাকিস্তান-তুরস্কের সেনা, কতটা জড়াবে ইয়েমেন যুদ্ধে আর কতদিন থাকতে পারবে পাকিস্তান? ◈ বিশ্বজুড়ে কোথায় কোথায় মার্কিন বোমারু বিমান মোতায়েন থাকে? যা জানাগেল ◈ তিন বছর পর ফের বৈঠকে বাংলাদেশ-ভারত, দিল্লি যাচ্ছেন ১০ কর্মকর্তা: বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদারে নতুন উদ্যোগ ◈ বাংলাদেশে গাড়ি কারখানা করবে টয়োটা, ২০২৭ সালে শুরু হবে নির্মাণকাজ ◈ কিউ-ক্যাশে সেবা ব্যাহত: ৩০ ব্যাংকের কার্ড ও ডিজিটাল সেবা দ্রুত চালুর নির্দেশ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক ◈ ৫০ বছরের কম বয়সীদের মধ্যে ৭ ধরনের ক্যানসার বাড়ছে, গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য ◈ মেসির বিদায়ী ম্যাচেও কেলেঙ্কারি, এএফএর বিরুদ্ধে ‘অর্থলোভী’ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ! ◈ বাজারে সিন্ডিকেটের প্রভাব বিস্তার করতে দেওয়া হবে নাঃখাদ্যমন্ত্রী ◈ এক বছরে নতুন করে দরিদ্র বেড়েছে প্রায় ২১ লাখ বাংলাদেশি, চাকরি হারাচ্ছেন নারীরা ◈ সরকারি কলেজের বিসিএস শিক্ষা ক্যাডারের বদলি-পদায়ন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত, জারি নতুন নির্দেশনা

প্রকাশিত : ২০ জুলাই, ২০২৬, ০৯:১৭ সকাল
আপডেট : ১৮ আগস্ট, ২০২৬, ০৩:০০ দুপুর

প্রতিবেদক : নিউজ ডেস্ক

তীব্র তাপদাহে বাংলাদেশের মানুষের দ্বিমুখী সংকট: কমছে আয়, বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ কেবল আরও উষ্ণই হয়ে উঠছে না, বরং তা কোটি কোটি পরিবারকে চরম আর্থিক সংকটের দিকেও ঠেলে দিচ্ছে। তীব্র তাপদাহ একদিকে যেমন শ্রমিকদের আয় কমিয়ে দিচ্ছে, অন্যদিকে বাড়িয়ে দিচ্ছে স্বাস্থ্যসেবার খরচ।

আজ রোববার (১৯ জুলাই) প্রকাশিত অ্যাডেলফি গ্লোবাল-এর একটি বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই উদ্বেগজনক চিত্র উঠে এসেছে।

"হিট, হেলথ অ্যান্ড দ্য ইনক্রিজিং কস্টস অব লিভিং – এ কল ফর অ্যাকশন" শীর্ষক এই প্রতিবেদনে বাংলাদেশকে জলবায়ুজনিত চরম তাপদাহের সম্মিলিত অর্থনৈতিক প্রভাবে—বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত এবং নাইজেরিয়াকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় রাখা হয়েছে; যার মূল কারণ—এই দেশগুলোতে অনানুষ্ঠানিকখাতের কর্মসংস্থানের ব্যাপকতা, স্বাস্থ্যসেবার উচ্চ ব্যয় এবং সীমিত সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা।

বাংলাদেশ, ব্রাজিল, ফ্রান্স, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইতালি, নাইজেরিয়া এবং দক্ষিণ আফ্রিকা—এই আটটি দেশে জলবায়ু-জনিত তাপদাহ কীভাবে একই সাথে পারিবারিক আয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয়কে প্রভাবিত করছে, তা নিয়ে এটিই প্রথম কোনো সমন্বিত গবেষণা।

Advertisement

কর্মঘণ্টা ও আয় হ্রাসের পূর্বাভাস

প্রতিবেদনের প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, চরম তাপদাহ ও গরমে অবসাদ বা ক্লান্তির (হিট স্ট্রেস) কারণে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের কৃষি ও নির্মাণ খাতের শ্রমিকরা বছরে গড়ে ২৩ দশমিক ৭৫ কর্মদিবসের সমপরিমাণ কাজের সময় হারাবেন। এমনকি কম কার্বন নিঃসরণের পরিবেশগত পরিস্থিতিতেও— এই দুই খাতে কর্মঘণ্টা হারানোর হার বর্তমানের ৬ দশমিক ২৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০৩০ সাল নাগাদ ৯ দশমিক ৫৮ শতাংশে পৌঁছাতে পারে।

সব খাত মিলিয়ে বার্ষিক কর্মঘণ্টা হারানোর এই হার বর্তমানের ৪ দশমিক ২৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৪ দশমিক ৮৪ শতাংশ হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এর ফলে কোটি কোটি শ্রমিকের আয় সরাসরি কমে যাবে। বিশেষত অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে নিয়োজিত দৈনিক মজুরিভিত্তিক শ্রমিকরা, যাদের কোনো বেতনসহ ছুটি, স্বাস্থ্যবিমা বা আয়ের নিরাপত্তা নেই— তারাই সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন।

প্রতিবেদনে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে সাধারণ মানুষের নিজস্ব ব্যয়ের (আউট অব পকেট স্পেন্ডিং) ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার বিষয়টি তুলে ধরাও হয়েছে। ২০২৩ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৭৯ দশমিক ৩ শতাংশই পরিবারগুলোকে সরাসরি নিজেদেরই মেটাতে হয়েছে, যা পর্যালোচিত দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম সর্বোচ্চ। ২০০০ সালের পর থেকে নিজ অর্থে মাথাপিছু চিকিৎসা ব্যয় ৮৩০ শতাংশেরও বেশি বেড়েছে, যা জলবায়ুজনিত কারণে আয় হারানো পরিবারগুলোর ওপর বিশাল আর্থিক চাপ সৃষ্টি করছে।

বছরে ১৮৩ থেকে ২৩৯ দিন তাপমাত্রা থাকবে ৩০ ডিগ্রির ওপরে

আগামী দশকগুলোতেও বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম তাপ-ঝুঁকিপূর্ণ দেশ হিসেবেই থাকবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। প্রক্ষেপণ অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০৩৯ সালের মধ্যে দেশের বেশিরভাগ অঞ্চল উচ্চ থেকে অত্যন্ত উচ্চমাত্রার আর্দ্রতা-ভিত্তিক তাপ-ঝুঁকির মুখোমুখি হবে। অনেক এলাকায় বছরের ১৮৩ থেকে ২৩৯ দিন তাপমাত্রা ৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করবে।

চরম তাপদাহের সময় কিছু কিছু খাতে উৎপাদনশীলতা ৫০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে, যা মানুষের জীবিকা এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য একটি ক্রমবর্ধমান হুমকি।

এই প্রভাবগুলো আরও মারাত্মক রূপ নেওয়ার কারণ হলো বাংলাদেশের শ্রমবাজারের অনানুষ্ঠানিক খাতের বাহুল্য। বিশেষত কৃষিকাজে নিয়োজিত প্রায় সব নারীই অনানুষ্ঠানিক উপায়ে কাজ করেন। নির্মাণশিল্পের মতো অন্যান্য তাপদাহ-ঝুঁকিপূর্ণ খাতের চিত্রও একই। এর কোনো সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা না থাকায়, প্রতিটি কর্মঘণ্টা হারানোর অর্থ হলো সরাসরি আয় হারানো।

সমন্বিত সংস্কারের আহ্বান

পারিবারিক ক্ষতির বাইরে, এই তীব্র তাপদাহ সামগ্রিক জাতীয় অর্থনীতিতেও বড় ধাক্কা দিচ্ছে। ২০২৪ সালে তাপদাহের কারণে বাংলাদেশ শ্রম আয় ও উৎপাদনশীলতায় আনুমানিক ২৪ বিলিয়ন ডলার হারিয়েছে। তাপদাহের সময় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তোলে। এতে শ্রমিক ও সাধারণ মানুষ ঘরের ভেতরেই প্রচণ্ড গরমের শিকার হন। এতে শরীর ঠাণ্ডা করার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়ে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ এখন আর জলবায়ু অভিযোজন (অ্যাডাপটেশন), জনস্বাস্থ্য এবং শ্রম সুরক্ষাকে আলাদা আলাদা নীতিগত বিষয় হিসেবে দেখার বিলাসিতা করতে পারে না। এর পরিবর্তে দেশের জলবায়ু অভিযোজন কৌশলের কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষকে রেখে একটি সমন্বিত দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

প্রতিবেদনের মূল সুপারিশগুলোর মধ্যে রয়েছে:

১. নিজস্ব চিকিৎসা খরচ কমাতে সরকারি স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা,
২. তীব্র তাপদাহের সম্মুখীন হওয়া শ্রমিকদের সামাজিক ও শ্রম সুরক্ষার পরিধি বাড়ানো,
৩. জাতীয় জলবায়ু অভিযোজন পরিকল্পনায় তাপদাহজনিত স্বাস্থ্য ঝুঁকিগুলোকে অন্তর্ভুক্ত করা, এবং
৪. জনস্বাস্থ্য ও শ্রমিকদের সুরক্ষার জন্য জলবায়ু অর্থায়ন (ক্লাইমেট ফাইন্যান্স) নিশ্চিত করা।

পরিবেশ ও উন্নয়ন নীতি বিশ্লেষণের একটি স্বাধীন থিংক ট্যাংক হিসেবে কাজ করা অ্যাডেলফি গ্লোবাল তাদের প্রতিবেদনে সতর্ক করেছে যে, তাপদাহের ফ্রিকোয়েন্সি বা পুনরাবৃত্তি ও স্থায়িত্ব যত বাড়বে, ততোই জনস্বাস্থ্য রক্ষা ও পারিবারিক আয় সুরক্ষিত করার বিষয়টিকে বাংলাদেশের জলবায়ু অভিযোজন ও উন্নয়ন এজেন্ডার মূল কেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে।

সূত্র: দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড