এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট জেলা প্রতিনিধি : দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন দীর্ঘদিন ধরেই জলবায়ু পরিবর্তন, লবণাক্ততা বৃদ্ধি ও আগামরা (টপ ডাইং) রোগের মতো নানা সংকটের সঙ্গে লড়ছে। এরই মধ্যে নতুন করে আরও একটি ভয়াবহ হুমকি দেখা দিয়েছে বনের প্রধান বৃক্ষ সুন্দরীর ওপর। সেই হুমকির নাম ‘পরগাছা’। আগে এই পরজীবী উদ্ভিদ শুধু গাছের শাখা-প্রশাখায় সীমাবদ্ধ থাকলেও এখন তা সুন্দরী গাছের মূল কাণ্ড পর্যন্ত বিস্তার লাভ করছে। ফলে ধীরে ধীরে দুর্বল হয়ে মারা যাচ্ছে গাছ।
বনবিভাগ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের মতে, গত কয়েক বছরে সুন্দরবনে পরগাছার উপদ্রব আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি, নদী-খাল ভরাট হয়ে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া এবং পরিবেশগত ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার কারণে এই সংকট আরও গভীর হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আগামী এক-দুই দশকের মধ্যে সুন্দরী গাছ বিলুপ্তপ্রায় উদ্ভিদের তালিকায় চলে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
সুন্দরীর নামেই সুন্দরবনের নাম
পৃথিবীর বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন শুধু বাংলাদেশের নয়, বিশ্বেরও এক অমূল্য প্রাকৃতিক সম্পদ। ইউনেস্কো ঘোষিত এই বিশ্ব ঐতিহ্যের নামকরণই হয়েছে প্রধান বৃক্ষ ‘সুন্দরী’-এর নামানুসারে। একসময় বনের বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে ছিল সুন্দরীগাছের আধিপত্য। অথচ আজ সেই গাছই অস্তিত্ব সংকটে।
সুন্দরী গাছ উপকূলীয় অঞ্চলকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রের উত্তাল ঢেউ থেকে রক্ষা করার পাশাপাশি মাটির ক্ষয়রোধ এবং মাছ, চিংড়ি ও নানা বন্যপ্রাণীর প্রজননের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করে।
মৃতপ্রায় ভোলা নদী বাড়াচ্ছে সংকট
অনুসন্ধানে জানা গেছে, পূর্ব সুন্দরবনের শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত এক সময়ের খরস্রোতা ভোলা নদীর প্রায় ১৬ কিলোমিটার অংশ ভরাট হয়ে গেছে। স্থানীয়ভাবে নদীটি এখন ‘মরা ভোলা’ নামে পরিচিত।
ভোলা নদীর নাব্যতা হারিয়ে যাওয়ায় বনের অভ্যন্তরের অসংখ্য খাল-খাড়িতে পানিপ্রবাহ কমে গেছে। ফলে মিষ্টি পানির প্রবেশ ব্যাহত হচ্ছে এবং বাড়ছে লবণাক্ততা। এতে সুন্দরীগাছের আগামরা রোগ ও পরগাছার আক্রমণ ভয়াবহ আকার ধারণ করছে।
বনবিভাগের হিসাব অনুযায়ী, বর্তমানে সুন্দরবনের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সুন্দরীগাছ পরগাছার আক্রমণের শিকার। এই পরজীবী উদ্ভিদ গাছের রস শোষণ করে বেঁচে থাকে। ফলে ধীরে ধীরে গাছের পাতা হলুদ হয়ে ঝরে পড়ে এবং একসময় পুরো গাছ শুকিয়ে মারা যায়।
হুমকিতে জীববৈচিত্র্য ও খাদ্যশৃঙ্খল
সুন্দরীগাছ কমে গেলে পুরো বাস্তুতন্ত্রের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। এই গাছের শিকড়ে আশ্রয় নেয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ ও চিংড়ি। শাখা-প্রশাখায় বাসা বাঁধে পাখি, আশ্রয় নেয় বানর, হরিণসহ অসংখ্য প্রাণী। আর হরিণসহ এসব প্রাণীই রয়েল বেঙ্গল টাইগারের প্রধান খাদ্য। ফলে সুন্দরীগাছের সংখ্যা কমতে থাকলে খাদ্যশৃঙ্খল ও বাস্তুসংস্থান ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ঝুঁকিতে ১০ লক্ষাধিক মানুষের জীবন-জীবিকা
বনবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনের ওপর সরাসরি নির্ভরশীল প্রায় ১০ লক্ষাধিক মানুষ। মাছ ধরা, কাঁকড়া আহরণ, মধু সংগ্রহ, গোলপাতা কাটা এবং পর্যটন ব্যবসাসহ নানা কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে তাদের জীবন-জীবিকা পরিচালিত হয়। সুন্দরীগাছের অস্তিত্ব সংকট গভীর হলে শুধু জীববৈচিত্র্য নয়, হুমকির মুখে পড়বে উপকূলীয় অর্থনীতি ও লাখো মানুষের জীবন।
মৌয়াল ও জেলেদের চোখে বদলে যাওয়া সুন্দরবন
খুড়িয়াখালী গ্রামের প্রবীণ মৌয়াল মো. শাহজাহান আকন ও মো. আউয়াল খাঁনের ভাষায়— “আগে যেসব জায়গায় ঘন জঙ্গল ছিল, এখন সেখানে ফাঁকা জায়গা। বহু সুন্দরীগাছ শুকিয়ে গেছে। মরা গাছে মৌমাছি চাক বাঁধে না। অনেক হাঁটার পরও এখন একটা মৌচাক পাওয়া যায় না।”
একই গ্রামের জেলে আশরাফ আলী ফরাজী ও রুস্তম গোলদার বলেন— “আগে চিত্রা, শিলন ট্যাংরা, ডগরি মাছ প্রচুর পাওয়া যেত। এখন এসব মাছ প্রায় দেখাই যায় না। ছোট খালগুলো ভরাট হয়ে গেছে, আগের পরিবেশ আর নেই।”
বিশেষজ্ঞদের সতর্কবার্তা
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, “লবণাক্ততা বৃদ্ধির কারণে সুন্দরীগাছের আগামরা রোগ ও পরগাছার আক্রমণ বাড়ছে। এতে বনের গঠন ও প্রজাতির বিন্যাস বদলে যাচ্ছে। সুন্দরী কমে গেলে পুরো ইকোসিস্টেম ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।”
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের লোনাপানি কেন্দ্রের মুখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. লতিফুল ইসলাম বলেন, “নদী-খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় মাছের বিচরণক্ষেত্র সংকুচিত হচ্ছে। অতিরিক্ত আহরণ ও বিষ দিয়ে মাছ ধরাও মাছের সংখ্যা কমার অন্যতম কারণ। এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে জেলে সম্প্রদায়ের ওপর।”
বনবিভাগের উদ্বেগ
সুন্দরবন পূর্ব বনবিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন,
“আগেই টপ ডাইং রোগ ছিল। এখন নতুন করে পরগাছার আক্রমণ বড় উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। শরণখোলা ও চাঁদপাই রেঞ্জে ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ সুন্দরীগাছ আক্রান্ত। এ বিষয়ে দ্রুত গবেষণার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
তিনি জানান, সুন্দরবন সুরক্ষা প্রকল্পের আওতায় ভরাট হয়ে যাওয়া ভোলা নদীর এক কিলোমিটার অংশ খনন করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকি অংশও খননের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে পানিপ্রবাহ বৃদ্ধি পেলে বনের বিশাল একটি অংশে আবার প্রাণ ফিরে আসবে বলে আশা বনবিভাগের।
সুন্দরী শুধু একটি বৃক্ষ নয়, এটি সুন্দরবনের প্রাণ, উপকূলের রক্ষাকবচ এবং লাখো মানুষের জীবন-জীবিকার ভিত্তি। তাই সুন্দরীর মৃত্যু মানে কেবল একটি গাছের মৃত্যু নয়; বরং একটি বাস্তুতন্ত্র, একটি ঐতিহ্য এবং উপকূলের ভবিষ্যতের জন্য বড় ধরনের অশনিসংকেত।